দৈনন্দিন জীবনে আমরা প্রতিদিনই কম্পিউটার ব্যবহার করছি। অনলাইনে তথ্য খোঁজা, ছবি বা ভিডিও সম্পাদনা করা, কিংবা হতে পারে মাইক্রোসফট এক্সেলে কোনো গণনার কাজ বা ওয়ার্ডে কিছু লেখা—বিভিন্ন কাজেই কম্পিউটার ব্যবহৃত হচ্ছে। এ তো গেল কম্পিউটারের ব্যবহার, কিন্তু এর মধ্যে কম্পিউটারকে শেখানোর কথা আসছে কেন? আর কম্পিউটারকে শেখানোর প্রয়োজনই-বা কী? এটা যে নতুন কথা, তা আর বলতে। বিস্তারিত বলি।
কল্পনা করুন, আপনাকে একটা দায়িত্ব দেওয়া হলো—ঢাকার পাবলিক লাইব্রেরি কিংবা কোনো সুপারশপের প্রবেশপথে প্রতিদিন কত মানুষ আসা-যাওয়া করছে, তা গণনা করতে হবে। সনাতন পদ্ধতিতে আপনি সেই দরজার পাশে সারা দিন বসে বসে মানুষের সংখ্যা গুনতে পারেন। কত পরিশ্রম এবং সময়সাপেক্ষ হবে কাজটা, ভাবতে পরেন?
এখন ধরা যাক, কাজটি আপনি নিজে না করে বরং প্রযুক্তির সহায়তা নিতে চান। এই কাজ সম্পন্ন করতে প্রথমে কম্পিউটারকে শেখাতে হবে মানুষের চেহারা ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে। তাকে অনেক মানুষের ছবি দিয়ে শেখাতে হবে মানুষ দেখতে কেমন। পৃথিবীতে কত ধরনের মানুষ আছে? কেউ মোটা, কেউ বেঁটে, কেউ পাতলা, কেউ-বা অনেক লম্বা, আরও কত কী! তাই অনেক অনেক ছবি দিয়ে কম্পিউটারকে শেখাতে হয়। আরেকটি ঝামেলা হলো, মানুষের কাপড় পরার বৈচিত্র্যও অনেক রকমের।
কম্পিউটারকে শেখানোর এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় মেশিন লার্নিং। অর্থাৎ মেশিন বা যন্ত্রকে কিছু শেখানোর পদ্ধতি। এ পদ্ধতিতে কম্পিউটার ছবিগুলোকে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ফেলতে চায়, ওর ভেতর থেকে প্যাটার্ন বের করার চেষ্টা করে। এভাবে কম্পিউটার অন্যান্য আকার-আকৃতির বস্তু থেকে মানুষকে আলাদা করে শনাক্ত করতে পারে।
মানুষকে শনাক্ত করে শেখানোর পরে, সে অনুযায়ী কম্পিউটার একটা ছাঁচ তৈরি করে নেয়। কম্পিউটারবিজ্ঞানের ভাষায় এটাকে বলা হয় ‘মডেল’। এই মডেল কম্পিউটারের কাছে থাকে। এবার সেই মডেলটিকে কম্পিউটারের ভেতরে ঢুকিয়ে সেই লাইব্রেরি বা দোকানের দরজার সামনে রাখা সিসি ক্যামেরটির ভিডিওটি ইনপুট দিলেই হলো, সহজেই তখন তাকে এই গণনার কাজ করাতে পারবেন। ভিডিওটি থেকে ছবি তৈরি করে কম্পিউটার সেই মডেল ব্যবহার করে বুঝতে পারে, সেখানে মানুষ আছে কি নেই। প্রথম দিকে দেখা যাবে কম্পিউটার ঠিক মতো গণনা করতে পারছে না। কেননা আপনি যে সব ছবি দিয়ে তাকে শিখিয়েছিলেন, সেই ছবির সঙ্গে দেখা যাবে সত্যিকারের ভিডিও থেকে তৈরি ছবিতে কিছু পার্থক্য রয়েছে। এরপরে তাকে আপনি শুদ্ধ করে দিলেন। এই পুনঃপ্রশিক্ষণ বা শুদ্ধ করার প্রক্রিয়াকে বলে অপ্টিমাইজেশন।
বর্তমানে কম্পিউটার শুধু একটি যন্ত্র নয়, বরং একটি ছাত্রের মতো—যাকে আমরা প্রশিক্ষণ দিয়ে নির্দিষ্ট কাজ শিখিয়ে নিতে পারি। এই প্রশিক্ষণের প্রক্রিয়াটিকেই আমরা মেশিন লার্নিং বা যন্ত্রের শিক্ষণ বলি। মেশিন লার্নিংয়ের মাধ্যমে আমরা কম্পিউটারকে ডেটা বা তথ্য দিয়ে এমনভাবে প্রশিক্ষণ দিই, যেন এটি নিজেই তথ্য থেকে নতুন প্যাটার্ন বা কাঠামো আবিষ্কার করতে পারে। এই প্রক্রিয়ায় কম্পিউটার ক্রমাগত শিখতে থাকে। ধীরে ধীরে এটি আগের চেয়ে আরও নির্ভুল ও কার্যকরী হয়ে ওঠে।
কম্পিউটারকে প্রশিক্ষণ দিই কেন? কম্পিউটার মূলত নিজে থেকে কিছু শেখে না। এটি কীভাবে কাজ করবে, তা নির্ভর করে একে দেওয়া নির্দেশ বা প্রশিক্ষণের ওপর। মানুষ যেভাবে অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেয়, একইভাবে আমরা কম্পিউটারকেও ডেটা বা তথ্যের অভিজ্ঞতা দিয়ে প্রশিক্ষণ দিই। যত বেশি তথ্য দেওয়া হবে, কম্পিউটার তত নির্ভুলভাবে কাজ করতে পারবে। এ কারণেই মেশিন লার্নিং গুরুত্বপূর্ণ—এর মাধ্যমে আমরা কম্পিউটারকে ভবিষ্যৎ সমস্যার সমাধান করতে শেখাতে পারি। মেশিন লার্নিংয়ের মাধ্যমে প্রশিক্ষিত কম্পিউটার নির্ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারে, যা মানুষের সময় ও শ্রম—দুটোই বাঁচাতে সাহায্য করে।
মেশিন লার্নিং কম্পিউটারকে মানবজাতির নির্ভরযোগ্য সহযোগীতে পরিণত করছে। এই প্রযুক্তি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা অর্জন এবং এটি কীভাবে কাজ করে, তা জানা আমাদের সবার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।
ওপরের উদাহরণের কথাই ভাবা যাক আবার। সেখানে আপনাকে শুধু একটি দোকানের মানুষ গণনার কাজ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এখন যদি বলা হয় আপনাকে ঢাকা শহরের দশটি লাইব্রেরিতে মানুষ গণনা করতে হবে, তা কিন্তু আপনার একার পক্ষে সম্ভব হবে না। আপনাকে তখন আরও দশজনকে নিয়োগ দিয়ে কাজটি করতে হবে। কিন্তু মেশিন লার্নিং ব্যবহারের মাধ্যমে আপনি খুব সহজেই এমন সিসি টিভি ও কম্পিউটার ব্যবহার করে কাজটি সাশ্রয়ীভাবে করে ফেলতে পারবেন। কম্পিউটার ব্যবহার করার এই একটি বড় সুবিধা।
তা ছাড়া কম্পিউটারকে মানুষের প্যাটার্ন শিখিয়ে যে মডেলটি তৈরি করেছিলেন, তা কষ্ট করে আপনার নিজের তৈরি না করলেও চলবে। বিজ্ঞানীরা আপনার এই কাজ সহজ করার জন্য অনেক মডেল তৈরি করেছেন। এমনই একটি মডেল হলো ইয়োলো (YOLO: You Only Look Once)। নামটি অদ্ভুত না? ২০১৬ সালে জোসেফ রেডমনের নেতৃত্বে একদল গবেষক এই মডেল তৈরি করেন, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল দ্রুততম সময়ে সঠিকভাবে বস্তুকে চিহ্নিত করা। গবেষণাটি প্রথমবারের মতো দেখিয়েছিল, একটি ছবিকে মাত্র একবার দেখেই কম্পিউটার নির্ভুলভাবে বহু বস্তু শনাক্ত করতে পারে। এই আবিষ্কার মেশিন লার্নিংয়ের জগতে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়। সুতরাং আপনাকে কষ্ট করে কম্পিউটারকে শেখানোর প্রয়োজন নেই। বিজ্ঞানীরা আমাদের এরকম অনেক কাজই সহজ করে দিয়েছেন।
একনজরে
ওপরে গল্পের মতো করে মেশিন লার্নিংয়ের যে কথাগুলো বললাম, চলুন, সেই ধাপগুলো আবার একনজরে দেখে নেওয়া যাক।
মেশিন লার্নিংয়ের প্রথম ধাপেই আমাদের প্রয়োজন প্রচুর পরিমাণ তথ্য। ডেটার পরিমাণ ও মান নির্ভুল হলে প্রশিক্ষণ কার্যকর হয়। দ্বিতীয়ত, সেই তথ্য দিয়ে তৈরি করা হয় একটি মডেল, যা নির্দিষ্ট প্যাটার্ন চিনতে সক্ষম। মডেল আসলে কম্পিউটারের জন্য একধরনের গাণিতিক কাঠামো বা সূত্র, আমরা বলতে পারি ‘ছাঁচ’। যে তথ্য দেওয়া হয়েছে, তা থেকে শিক্ষা নিয়ে এই ছাঁচে ফেলেই কম্পিউটার নির্দিষ্ট কাজটি করতে পারে। আমরা প্রোগ্রামিংয়ের মাধ্যমে ডেটা ইনপুট দিয়ে বিভিন্ন অ্যালগরিদম ব্যবহার করে এই মডেল বা ছাঁচ তৈরি করি। তৃতীয় ধাপে মডেল পরীক্ষা করা হয় নতুন তথ্য দিয়ে, যাতে দেখা যায় এটি ঠিকভাবে শিখেছে কি না। যদি ভুল হয়, তাহলে কম্পিউটারকে আবার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় বা অপ্টিমাইজ করা হয়। এর পরে প্রশিক্ষিত মডেলটি বাস্তব তথ্যের ওপর প্রয়োগ করা হয় এবং নিয়মিত নতুন তথ্য দিয়ে এটিকে আরও উন্নত করা হয়।
বর্তমানে কম্পিউটার শুধু একটি যন্ত্র নয়, বরং একটি ছাত্রের মতো—যাকে আমরা প্রশিক্ষণ দিয়ে নির্দিষ্ট কাজ শিখিয়ে নিতে পারি। এই প্রশিক্ষণের প্রক্রিয়াটিকেই আমরা মেশিন লার্নিং বা যন্ত্রের শিক্ষণ বলি।
মেশিন লার্নিং কোথায় ব্যবহৃত হয়
বর্তমানে মেশিন লার্নিংয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োগগুলোর একটি হলো স্বাস্থ্যসেবা। রোগ নির্ণয় থেকে শুরু করে রোগের পূর্বাভাস পর্যন্ত নানা ক্ষেত্রে এর ভূমিকা অপরিসীম। উদাহরণস্বরূপ, কোনো রোগীর লক্ষণ, বয়স ও আগের চিকিৎসার তথ্য দিয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মডেলগুলো রোগ নির্ণয় করতে পারে। এটি রোগীর স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি আগেই শনাক্ত করতে পারে, ফলে দ্রুত চিকিৎসা ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়। এ ছাড়া মেডিক্যাল ইমেজিং, যেমন এক্সরে বা সিটি স্ক্যান বিশ্লেষণে মেশিন লার্নিং অত্যন্ত কার্যকর। মানবচোখের তুলনায় কম্পিউটার আরও দ্রুত ও নির্ভুলভাবে রোগ শনাক্ত করতে সক্ষম, যা চিকিৎসকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে ব্যাপক সহায়তা করে।
মেশিন লার্নিং প্রযুক্তির সাহায্যে আমরা নির্ভুল এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারি, যা শুধু স্বাস্থ্যসেবা নয়, অর্থনীতি, পরিবেশ, কৃষি, এমনকি সামাজিক সমস্যার সমাধানেও কার্যকর। পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, জীববিজ্ঞান বা জ্যোতির্বিজ্ঞান ও মহাকাশ পর্যবেক্ষণের প্রায় সব ধরনের গবেষণাতেই আজ মেশিন লার্নিং ব্যবহৃত হচ্ছে। তাই শিক্ষার্থী ও গবেষকদের জন্য এই বিষয়ে মৌলিক ধারণা রাখা অত্যন্ত জরুরি।
মেশিন লার্নিং কম্পিউটারকে মানবজাতির নির্ভরযোগ্য সহযোগীতে পরিণত করছে। এই প্রযুক্তি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা অর্জন এবং এটি কীভাবে কাজ করে, তা জানা আমাদের সবার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। কম্পিউটার প্রশিক্ষণ শুধু প্রযুক্তিগত দক্ষতার বাইরেও এক মৌলিক অধিকার হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, কারণ এর প্রভাব মানুষের জীবনে অত্যন্ত গভীর ও সুদূরপ্রসারী।