মাইক্রোরোবটস: চিকিৎসায় দ্রুতগতির খুদে রোবট

চিকিৎসার জন্য রোগীর দেহ কাটাছেঁড়া করতে হয় অনেক ক্ষেত্রে। সে সমস্যা সমাধানে একদল প্রকৌশলী তৈরি করেছেন মাইক্রোরোবটস। খুদে এই রোবটরা তুলনায় চিতা বাঘের চেয়ে ক্ষিপ্র। মানবদেহের যেকোনো অঙ্গে পৌঁছে দিতে পারবে প্রয়োজনীয় ওষুধ। কীভাবে কাজ করে এসব রোবট?

মাথার ওপর দিয়ে শোঁ শোঁ করে উড়ে যাচ্ছে বিমান। এটি যে অনেক দ্রুতগতিতে ওড়ে, তা কারোই অজানা নয়। উদাহরণ হিসেবে কমার্শিয়াল বোয়িং ৭৪৭ বিমানের কথা বলা যায়। এর ক্রুজিং স্পিড বা ছোটার বেগ প্রতি ঘণ্টায় ৯১৭ কিলোমিটার। ৭৬ মিটার দীর্ঘ বিমানটি এ বেগে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ২৫৫ মিটার দূরত্ব অতিক্রম করে। দৈর্ঘ্যে এটি প্রায় ৩ দশমিক ৩৫টি বোয়িংয়ের সমান।

এমনিতে বিমানকে খুব দ্রুতগতির যান মনে হয়। তবে এটি সেকেন্ডে কেবল এর দৈর্ঘ্যের তিন গুণ দূরত্ব অতিক্রম করে। আপেক্ষিক তুলনায় প্রাণিজগতের অনেক প্রাণী এর চেয়ে দ্রুত চলতে পারে।

দ্রুতগতির প্রাণীর কথা উঠলে চিতা বাঘের কথা প্রথম মাথায় আসে। লেজসহ এক-দেড় মিটারের এই প্রাণী ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার বেগে দৌড়াতে পারে। সেকেন্ডে হিসাব করলে, ২৭ দশমিক ৭৮ মিটার/সেকেন্ড। অর্থাৎ চিতা বাঘ প্রতি সেকেন্ডে নিজ দেহের প্রায় ২৫ গুণ দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে।

তুলনা করলে বোঝা যায়, চিতা বাঘ বিমানের চেয়ে কয়েক গুণ দ্রুত ছোটে। তবে ইউনিভার্সিটি অব কলোরাডো বোল্ডারের একদল প্রকৌশলী একধরনের মেডিকেল রোবট তৈরি করেছেন, যা এই দ্রুতগতির চিতা বাঘকে হার মানায়।

মাইক্রোরোবটস (Microrobots) নামের এই ক্ষুদ্র রোবটের প্রস্থ প্রায় ২০ মাইক্রোমিটার। মানে, একটি চুলের চেয়ে সূক্ষ্ম। এত ছোট হলেও এ রোবট প্রতি সেকেন্ডে ৩ মিলিমিটার দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে। তিন মিলিমিটার শুনে মনে হয় অতিক্ষুদ্র দূরত্ব। তবে এ দূরত্ব রোবটটির দেহের প্রায় ৯ হাজার গুণ। অর্থাৎ প্রতি সেকেন্ডে রোবটটি তার দেহের ৯ হাজার গুণ দূরত্ব পাড়ি দিতে পারে। বিমান কিংবা দ্রুততম স্তন্যপায়ী চিতার চেয়ে তা কয়েক হাজার গুণ বেশি।

দ্রুতগতির পাশাপাশি এ রোবটগুলো স্বচালিত (Self-propelled)। অর্থাৎ নিজে নিজে চলতে পারে। তাই গবেষণা দলের প্রধান প্রকৌশলী জিন লির মতে, এ রোবটের ব্যবহার চিকিৎসা ক্ষেত্রে ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে, মূত্রাশয়ের চিকিৎসায়।

প্রাথমিক পরীক্ষায় জিন লি ও তাঁর গবেষণা দল একটি ইঁদুরের মূত্রাশয়ে ডেক্সামেথাসন নামের একটি স্টেরয়েড ওষুধ প্রবেশের চেষ্টা করে। সফলও হয়। এই পরীক্ষার জন্য মাইক্রোরোবটসকে এমনভাবে বানানো হয়েছিল, যেন রোবটগুলো ডেক্সামেথাসনের ভারী ডোজ নিয়ে ইঁদুরের দেহে চলাচল করতে পারে। প্রবেশের পরে ইঁদুরের দেহে রোবটগুলো দুই দিন পর্যন্ত ডেক্সামেথাসন ছাড়তে থাকে ধীরে ধীরে।

এভাবে মানবদেহেও কোনো কাটাছেঁড়া ছাড়া ডেক্সামেথাসনের মতো ওষুধ পৌঁছানো সম্ভব হবে এ রোবটের সাহায্যে। উদাহরণ হিসেবে ইন্টারস্টিশিয়াল সিস্টাইটিস (Interstitial Cystitis) বা মূত্রাশয়ের ব্যথার কথা বলা যেতে পারে। এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি শ্রোণিতে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করেন। এ থেকে বাঁচতে সপ্তাহে কয়েকবার রোগীকে ক্যাথেটারের মাধ্যমে মূত্রাশয়ে ডেক্সামেথাসন নিতে হয়। ক্যাথেটারের মাধ্যমে মানবদেহে এ ওষুধ পৌঁছানো খুব কষ্টদায়ক প্রক্রিয়া।

মাইক্রোরোবটস

এ ক্ষেত্রে মাইক্রোরোবটস ব্যবহার করা গেলে সেগুলো ক্যাপসুল বা সলিউশন হিসেবে রোগীকে খাওয়ানো যাবে। ভেতরে প্রবেশের পর সেই রোবটের ঝাঁক মূত্রাশয়ের দেয়ালের সঙ্গে লেগে যাবে, যেন প্রস্রাবের সঙ্গে বের হয়ে না যায়।

ভেতরে থাকা অবস্থায় ধীরে ধীরে এই মাইক্রোরোবটস ওষুধ নিঃসরণ করতে থাকবে, যেন রোগী অনেক সময় ধরে চিকিৎসার ফল লাভ করতে পারেন। শুধু মূত্রাশয়ে নয়, সঠিকভাবে ব্যবহার করা গেলে রোগীর রক্তপ্রবাহের মাধ্যমে কোনো ধরনের কাটাছেঁড়া ছাড়া দেহের বিভিন্ন অঙ্গে পৌঁছানো যাবে ওষুধ।

শুধু ওষুধ নয়, গবেষণাটির সহলেখক ও গবেষক ওয়ায়েট শিল্ডস বিশ্বাস করেন, এ রোবটগুলোকে মানবদেহে বিভিন্ন কাজের জন্য ব্যবহার করা যাবে। কারণ, এগুলো খুব সহজে কাস্টমাইজ করে বানানো যায়।

জিন লি ও শিল্ডসের গবেষণা দল থ্রিডি প্রিন্টিংয়ের মতো এক প্রক্রিয়ায় বায়োকম্প্যাটেবল পলিমার দিয়ে এ রোবটগুলো তৈরি করেন। দেখতে অনেকটা রকেট কিংবা বড় জাহাজের প্রপেলারের মতো দেখতে। প্রপেলারের মতো তিনটি পাখা আছে। এগুলো রোবটগুলোকে চলতে বা ভেসে যেতে সাহায্য করে।

রকেটের মতো দেখতে মাঝখানের অংশ কিছুটা ফাঁপা থাকে। সেখানে ওষুধের পাশাপাশি বাতাসের বুদ্‌বুদ রাখা হয় চলাফেরার জন্য। এই বুদ্‌বুদ অনেকটা পানির বোতলের বুদ্‌বুদের মতো। একটা পানি বা কোল্ড ড্রিংকসের বোতল কিনে খুব দ্রুত উল্টো করে ফেললে বোতলের ওপরের খালি অংশের বাতাস যেভাবে বুদ্‌বুদ হয়ে নিচের অংশে চলে আসে, অনেকটা সে রকম।

মাইক্রোরোবটসের কাছে যখন কোনো অ্যাকুস্টিক ফিল্ড (আলট্রাসাউন্ড পরীক্ষায় যেভাবে শব্দ ব্যবহৃত হয়) আনা হয়, তখন এর ভেতরে থাকা বাতাসের বুদ্‌বুদ খুব দ্রুত কাঁপতে থাকে। এই কম্পনই রোবটগুলোকে রক্তপ্রবাহের মধ্য দিয়ে দ্রুতগতিতে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।

মানবদেহে সরাসরি ব্যবহারের জন্য আরও কিছুটা পথ এগিয়ে যেতে হবে ছোট্ট এই রোবটগুলোকে। মাইক্রোরোবটসের পেছনের প্রকৌশলী দল ইতিমধ্যে এই রোবটগুলোকে বায়োডিগ্রেডেবল পদার্থ দিয়ে বানানোর চেষ্টা করছে, যেন কাজ শেষে মানবদেহে তা নিঃশেষ হয়ে যেতে পারে।

এটা সম্ভব হলে ইনজেকশন বা ক্যাথেটার ছাড়া মানবদেহের বিভিন্ন জটিল অঙ্গে পৌঁছে দেওয়া যাবে ওষুধ। শুধু ওষুধ পৌঁছানো নয়, আরও যেসব চিকিৎসার কাজে রোগীর দেহ কাটাছেঁড়ার প্রয়োজন হয়, সেসব ক্ষেত্রে কাজে আসবে এই মাইক্রোরোবটস।

লেখক: ব্যবস্থাপক, ডেফ্টাইল্ড

সূত্র: স্মল জার্নাল, সায়েন্স ডেইলি ও শিল্ডস ল্যাব