নিউক্লিয়ার উৎপাদনে প্রায় কোনো রকম গ্রিনহাউজ গ্যাস তৈরি হয় না। তৈরি হয় ভয়ানক তেজস্ক্রিয় বর্জ্য। সম্প্রতি নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, এ ধরনের বর্জ্য ব্যবহার করে ছোট ছোট ইলেকট্রনিকস ডিভাইসের মাধ্যমে চার্জ করা সম্ভব। গবেষণাটি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের একদল বিজ্ঞানী। চলতি বছর অপটিক্যাল ম্যাটেরিয়াল এক্স জার্নালের ফেব্রুয়ারি সংস্করণে এ সংক্রান্ত গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে।
নতুন গবেষণায় বিজ্ঞানীরা নিউক্লিয়ার বর্জ্যের গামা বিকিরণ ব্যবহার করে মাইক্রোচিপ চালানোর জন্য পর্যাপ্ত শক্তি উৎপন্ন করেছেন। বর্তমানে এ শক্তি খুব ছোট আকারের সেন্সরে ব্যবহৃত হলেও গবেষকেরা মনে করছেন, এর পরিমাণ বাড়ানো সম্ভব।
গবেষণাপত্রের সহলেখক ও ওহাইয়ো স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক রেমন্ড ক্যাও। তিনি এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘বর্জ্য হিসেবে পরিচিত এমন একটা জিনিস আমরা সংগ্রহ করছি। চেষ্টা করছি বর্জ্য সম্পদে পরিণত করতে।’
বর্তমানে পৃথিবীর চাহিদার প্রায় ১০ শতাংশ শক্তির যোগান আসছে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্টগুলো থেকে। এতে জীবাশ্ম জ্বালানির প্রতি আমাদের নির্ভরশীলতা অনেকটাই কমেছে। বিজ্ঞানীরা যদি নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্টের বর্জ্য থেকে উপকারী শক্তি বের করে আনতে পারেন, তাহলে জ্বালানির শিল্পে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।
নিউক্লিয়ার ব্যাটারি নিয়ে বিজ্ঞানীরা কাজ করছেন অনেকদিন ধরে। এ ব্যাটারিগুলো মূলত তেজস্ক্রিয় ক্ষয়কে বিদ্যুৎ শক্তিতে রূপান্তর করে। অবশ্য বাণিজ্যিকভাবে নিউক্লিয়ার ব্যাটারি বাজারে আসতে আরও অনেকটা দেরি।
তবে, নতুন এ ব্যাটারিতে শক্তি উৎপন্ন করা হয় দুই ধাপে। প্রথমে স্কিনটিলেটর ক্রিস্টাল ব্যবহার করে তেজস্ক্রিয় গামা বিকিরণকে আলোক রশ্মিতে রূপান্তর করা হয়। তারপর বাকি কাজ করে সৌরপ্যানেল। অর্থাৎ আলো থেকে বিদ্যুৎ তৈরি হয়। প্রোটোটাইপ ব্যাটারির মাত্র ৪ ঘন সেন্টিমিটার জায়গার মধ্যেই এসব কাজ হয়েছে।
ব্যাটারিতে শক্তির উৎস হিসেবে সিজিয়াম-১৩৭ ও কোবাল্ট-৬০ নিয়ে বর্তমান গবেষণাটি করা হয়েছে। এ দুটি ধাতুই তেজস্ক্রিয় বর্জ্য হিসেবে পাওয়া যায় নিউক্লিয়ার ফিশন বিক্রিয়া থেকে। এতে যথাক্রমে ২৮৮ ন্যানোওয়াট ও ১.৫ মাইক্রোওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া গেছে।
এমনিতে ব্যাটারির বাইরের আবরণ ক্ষতিগ্রস্ত না হলে খালি হাতে এই ব্যাটারি ধরলে ক্ষতির আশঙ্কা নেই
গবেষকদলটির প্রধান ও যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইয়ো স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যারোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ইব্রাহিম ওকসুজ বলেন, ‘পাওয়ার আউটপুটের বিবেচনায় এই ফলাফলগুলো যুগান্তকারী। আমাদের দুই ধাপের পদ্ধতিটি এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। কিন্তু পরে বেশি শক্তির জন্য এটাকে আরও বড় পরিসরে করা যেতে পারে।’
অনেকে মনে করেন, ব্যাটারিগুলো মূলত পারমাণবিক বর্জ্যের কাছাকাছি এলাকায় ব্যবহারের উপযোগী হতে পারে। সবাই হয়তো আগ্রহী হবেন না। কারণ তেজস্ক্রিয়তার ভয়। এ ব্যাপারে আশ্বস্ত করেছে বিজ্ঞানীরা। তারা বলছেন, সেন্সরের সাহায্য ব্যাটারিগুলোর নানা বৈশিষ্ট্য পরিমাপ করা যাবে খুব অল্প খরচে।
এমনিতে ব্যাটারির বাইরের আবরণ ক্ষতিগ্রস্ত না হলে খালি হাতে এই ব্যাটারি ধরলে ক্ষতির আশঙ্কা নেই। চারপাশ দূষণও করবে না এটি। তবে ব্যাটারিটি তৈরি করার পর তা কত সময় পর্যন্ত বিদ্যুতের জোগান দিতে পারবে, সে প্রশ্নের উত্তর এখনও মেলেনি এখনো।
গবেষকদের দলটি বলছেন, ‘স্কিনটিলেটর ও সৌরকোষ কতটা বিকিরণ সহ্য করতে পারে, সেটা জানা গুরুত্বপূর্ণ। অন্যান্য গবেষকদেরও এ নিয়ে গবেষণা করা উচিত।’
এই প্রযুক্তি সফল হলে এটি শুধু পৃথিবীতেই নয়, মহাকাশ অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এমনকি মহাকাশের গামা বিকিরণ কাজে লাগিয়ে সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদন করাও সম্ভব হতে পারে।
এজন্য অবশ্য বর্তমান প্রোটোটাইপটিও আরও কার্যকর করে তুলতে হবে। যদি এই প্রযুক্তিকে আরও উন্নত করা যায়, তাহলে ভবিষ্যতে জ্বালানি সমস্যার বড় সমাধান হতে পারে বলে মনে করেন গবেষকরা। গবেষণা চলাকালীন সময়ে, দলটি কী ধরনের সৌরকোষ ও স্কিনটিলেটর ক্রিস্টাল কতটুকু করে তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গকে রূপান্তরিত করতে পারে, তা বের করে সবার জন্য উন্মুক্ত রেখেছে। সেসব তথ্য চাইলে যে কেউ নিয়ে গবেষণার কাজে লাগাতে পারবে।
নিজেদের আবিষ্কার সম্পর্কে অধ্যাপক অকসুজ বলেন, ‘নিউক্লিয়ার ব্যাটারির ধারণাটি খুবই সম্ভাবনাময়। এটাকে যথেষ্ট উন্নত করতে পারলে শক্তি উৎপাদন শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।