ফিটনেস ট্র্যাকার বা স্মার্টওয়াচের মতো ডিভাইস এখন অনেক জনপ্রিয়। আপনি কতটা ভালো ঘুমিয়েছেন, কতটা কঠোর পরিশ্রম করেছেন বা দৈনন্দিন জীবনে কতটা চাপ অনুভব করছেন—সবকিছুই আপনার হৃদস্পন্দনের ওপর ভিত্তি করে জানাতে পারে এসব আধুনিক যন্ত্র। কিন্তু কীভাবে এই ডিভাইসগুলো আমাদের হৃদস্পন্দন মাপে? এসব তথ্য কতটা নির্ভরযোগ্য? চলুন জেনে নেওয়া যাক।
ফিটনেস ট্র্যাকার ও স্মার্ট রিংয়ের মতো ডিভাইসগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ফটোপ্লেথিসমোগ্রাফি (PPG) নামে একটি প্রযুক্তি ব্যবহার করে। শব্দটি কঠিন মনে হতে পারে, কিন্তু বেশ কাজের। শরীরের টিস্যু কীভাবে আলো শোষণ করে, তার ওপর ভিত্তি করে এই প্রযুক্তি কাজ করে।
এই প্রযুক্তি কতটা নির্ভুলভাবে হৃদস্পন্দন পরিমাপ করতে পারে? এটা কি বিশ্বাস করা যায়?
ডেনমার্কের আলবর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্ডিওলজি বিভাগের অধ্যাপক পিটার সোগার্ড জানান, ‘পিপিজি প্রযুক্তি শরীরের ক্ষুদ্র রক্তনালীতে রক্তপ্রবাহের পরিবর্তন পরিমাপ করে হৃদস্পন্দন নির্ণয় করে। যখন হৃদপিণ্ড সংকুচিত হয়, তখন রক্তচাপ বাড়ে এবং রক্তনালীতে রক্তপ্রবাহ বৃদ্ধি পায়। জীববিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে সিস্টোলিক। আবার হৃদপিণ্ড যখন শিথিল হয়, তখন রক্তপ্রবাহ কমে যায় এবং এই অবস্থাকে বলে ডায়াস্টোলিক। পিপিজি সেন্সর এই পরিবর্তনগুলো শনাক্ত করে এবং তা থেকে হৃদস্পন্দনের হার নির্ণয় করে।
এই সেন্সর মূলত ত্বকে নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো পাঠায় এবং তার প্রতিফলন পর্যবেক্ষণ করে। রক্তের প্রধান উপাদান হিমোগ্লোবিন এই আলো শোষণ করে। সেন্সর পরিমাপ করে কতটুকু আলো প্রতিফলিত হয়েছে এবং সেই তথ্য ব্যবহার করে হৃদস্পন্দনের হার নির্ধারণ করে। সাধারণত, ইনফ্রারেড ও সবুজ রঙের এলইডি আলো বেশি কার্যকরভাবে এই পরিমাপ করতে পারে। ২০২২ সালে ফ্রন্টিয়ার্স অব ফিজিওলজি জার্নালে এ বিষয়টি দেখিয়েছেন পিটার সোগার্ড। সবুজ আলো বেশি কার্যকর কারণ এটি হিমোগ্লোবিনের সাহায্যে ভালোভাবে শোষিত হয় এবং ত্বকের গভীরে প্রবেশ করতে পারে। এটি রক্তপ্রবাহের ছোট ছোট পরিবর্তনও শনাক্ত করতে সক্ষম। তবে কিছু উন্নত অপটিক্যাল সেন্সর নির্ভুলভাবে হৃদস্পন্দন নির্ণয় করতে একাধিক তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো ব্যবহার করে।
এখন প্রশ্ন হলো, এই প্রযুক্তি কতটা নির্ভুলভাবে হৃদস্পন্দন পরিমাপ করতে পারে? এটা কি বিশ্বাস করা যায়?
এই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন ব্যাপটিস্ট হেলথ মিয়ামি কার্ডিয়াক অ্যান্ড ভাসকুলার ইনস্টিটিউটের কার্ডিওথোরাসিক সার্জন মাসাকি নাকামুরা। তিনি জানান, ‘পিপিজি প্রযুক্তির নির্ভুলতা বিভিন্ন কারণে পরিবর্তিত হতে পারে। ফিটনেস ট্র্যাকার কোথায় পরা হয়েছে, শরীরের তাপমাত্রা, ত্বকের পুরুত্ব, চলাফেরার ধরণ এবং কার্ডিওভাসকুলার সমস্যার মতো বিভিন্ন বিষয়ের ওপর এই সেন্সরের কার্যকারিতা নির্ভর করে।’
একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্রাম বা ঘুমের সময় পিপিজি প্রযুক্তি তুলনামূলকভাবে বেশি নির্ভুলভাবে কাজ করে। কিন্তু অধিক ব্যায়াম করার সময় এটি কম নির্ভরযোগ্য হতে পারে। বিশেষত ওজন তোলা, সাইক্লিং বা অন্যান্য উচ্চমাত্রার ব্যায়ামের সময় সেন্সরের কার্যকারিতা কমে যেতে পারে। যদিও নতুন ট্র্যাকারগুলোতে অ্যাক্সিলোমিটার-ভিত্তিক অ্যালগরিদম ব্যবহার করা হয়, তারপরও চলাফেরার কারণে তথ্যের ভুল হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। এই অ্যালগরিদম অ্যাক্সিলোমিটার ও জাইরোস্কোপ সেন্সরের মাধ্যমে চলাচলের সময় তৈরি হওয়া নয়েস শনাক্ত করে এবং সঠিক হৃদস্পন্দনের হার নির্ধারণে সহায়তা করে। ফলে ব্যায়ামের সময়ও তুলনামূলক নির্ভুল ডেটা পাওয়া যায়।
ত্বকের সংস্পর্শও গুরুত্বপূর্ণ। ডিভাইসটি যদি খুব ঢিলা বা খুব টাইট হয়, তাহলে সেন্সর সঠিকভাবে কাজ নাও করতে পারে। আবার শরীরের তাপমাত্রা কম থাকলে রক্তনালী সংকুচিত হয়ে যায়, ফলে পরিমাপে ত্রুটি দেখা দিতে পারে।
এছাড়াও, ত্বকে উল্কি থাকলে সেন্সর কম আলো প্রতিফলিত করতে পারে, যা তথ্যের নির্ভুলতাকে প্রভাবিত করে। অতিরিক্ত ওজন থাকলেও ত্বকের পুরুত্বের কারণে পরিমাপের সঠিকতা কমতে পারে। তবে বিজ্ঞানীরা এ সমস্যাগুলোর সমাধান বের করতে নতুন প্রযুক্তি উন্নয়নের চেষ্টা করছেন।
যদিও পিপিজি প্রযুক্তির কিছু সীমাবদ্ধতা আছে, তবে হৃদস্পন্দন পর্যবেক্ষণের জন্য এটি এখনো কার্যকর পদ্ধতি। বিশেষ করে কার্ডিয়াক রোগীদের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, কারণ এটি ধারাবাহিকভাবে হৃদস্পন্দন ও রক্তচাপ পর্যবেক্ষণ করতে পারে। তবে চিকিৎসকরা বলেন, পিপিজি প্রযুক্তির তথ্যকে কখনোই হাসপাতালের ইলেক্ট্রোকার্ডিওগ্রাম (ECG) বা রক্তচাপ মাপার যন্ত্রের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়। কারণ ইসিজি সরাসরি হৃদযন্ত্রের বৈদ্যুতিক সংকেত পর্যবেক্ষণ করে যা পিপিজি প্রযুক্তির তুলনায় বেশি নির্ভুল। গবেষকরা মনে করেন, ভবিষ্যতে আরও উন্নত পিপজি সেন্সর তৈরি হলে এটি আরও নির্ভুল এবং নির্ভরযোগ্য হয়ে উঠবে।
শেষ কথা হলো, ফিটনেস ট্র্যাকার ও স্মার্টওয়াচের মাধ্যমে হৃদস্পন্দন মাপার প্রযুক্তি উন্নত হচ্ছে। যদিও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তবে এটি এখনো আমাদের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। ভবিষ্যতে নতুন প্রযুক্তির সংযোজনের মাধ্যমে এটি আরও কার্যকর হয়ে উঠতে পারে।