যদি বলি, বাইসাইকেলের উৎপত্তি এবং নেপোলিয়ন বোনাপোর্টের ওয়াটার লু যুদ্ধে পরাজয় আসলে এক সুতোয় গাঁথা, বিশ্বাস করবেন? কলেজের বাংলা প্রথম পত্রে হয়তো পড়েছেন বঙ্কিমচন্দ্রের কমলাকান্তের দপ্তর। সেই কমলাকান্তের মতো আমিও বিশেষ কিছুতে দম দিয়েছি ভাববেন না তো?
১৮১৫ সাল। ওয়াটার লু যুদ্ধে মুখোমুখি নেপোলিয়ন আর ওয়েলিংটনের বাহিনী। অথচ তাঁদের দুজনের কেউই জানেন না, যুদ্ধের নিয়তি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে যে কয়টি বিষয়, তার একটি মঞ্চস্থ হয়ে গেছে প্রায় দুই মাস আগে। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ৭ হাজার মাইল দূরে, বর্তমান ইন্দোনেশিয়ার সুমবাওয়া দ্বীপের তামবোরা পর্বতে অগ্নুৎপাত হয়েছে। এর ফলে মারা গেছে প্রায় ১ লাখ মানুষ।
অগ্ন্যুৎপাতের ফলে নির্গত ছাই প্রবল বেগে ছুটে যায় বায়ুমণ্ডলের দিকে। বায়ুমণ্ডলের আয়নোস্ফিয়ারকে বিদ্যুতায়িত করে ফেলে এসব ছাই। এ থেকে তৈরি হয় মেঘ। সেই মেঘ ঘটনা চক্রে, বাতাসের ভেলায় চড়ে হাজির হয় ওয়াটার লু যুদ্ধক্ষেত্রে। এবং ঝরে পড়ে বৃষ্টি হয়ে। সে রাতের প্রচণ্ড ঝড়ের তাণ্ডব, এবং পরদিন স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়া, কাদামাটি ইত্যাদি মিলে নেপোলিয়ন তাঁর বাহিনীকে এগিয়ে গিয়ে ওয়েলিংটন বাহিনীকে আক্রমণের নির্দেশ দেননি। এই ছোট্ট ভুলটির জন্য বড়সড় খেসারত দিতে হয়েছে তাঁকে। নেপোলিয়ন হেরে গিয়েছিলেন। শুধু যুদ্ধ না, সব কিছু।
ড্রেইস কিন্তু সেখানে থেমে যাননি। আরেক ধাপ এগিয়ে এক বছর পর তিনি উদ্ভাবন করেন ‘ভেলোসিপেড’। ইতিহাসের প্রথম সত্যিকারের দ্বিচক্রযান। ‘যান’, কারণ এতে স্টিয়ারিং আছে; মানুষ যেন পা দিয়ে চালাতে পারে, সে ব্যবস্থাও আছে।
নেপোলিয়নের গল্প আমাদের মূল আলোচনার বিষয় না। তাই, এ প্রসঙ্গ এখানেই শেষ করছি।
ঘটনা হলো, সেই অগ্নুৎপাতের জন্য ১৮১৬ সালকে বলা হয় ‘ইয়ার উইদাউট আ সামার’। অর্থাৎ, গ্রীষ্মহীন বছর। প্রচণ্ড খাদ্যাভাব দেখা দেয় তখন। ঠিক এ কারণেই উৎপত্তি হয় সাইকেলের!
একটু খুলে বলি। পুরো ইউরোপে তখন যাতায়াতের প্রধান ব্যবস্থা ঘোড়া। কিন্তু খাদ্যের অভাবে ঘোড়াকে বাঁচিয়ে রাখা, লালন-পালন ইত্যাদি বেশ কঠিন হয়ে যায়। বেগতিক অবস্থা যাকে বলে। মধ্যযুগের বাংলা কবিতার সেই লাইন, ‘ঘোড়ায় চড়িয়া মর্দ হাঁটিয়া চলিল’ সম্ভবত এ সময়ের জন্যই খেটে যায়!
সে সময়, আসলে ১৮১৭ সালে ব্যারন কার্ল ভন ড্রেইস নামের এক জার্মান ভদ্রলোক ইতিহাসের প্রথম দুই চাকার সাইকেল উদ্ভাবন করেন। জার্মান ভাষায় এর নাম ছিল ‘লাউফমেশিন’। বাংলা করলে দাঁড়ায়, ‘ছুটন্ত যন্ত্র’। মিডিয়া অবশ্য এর নাম দেয় ড্রেইসিন (ড্রেইসের নামের সঙ্গে মিল রেখে)।
ড্রেইস কিন্তু সেখানে থেমে যাননি। আরেক ধাপ এগিয়ে এক বছর পর তিনি উদ্ভাবন করেন ‘ভেলোসিপেড’। ইতিহাসের প্রথম সত্যিকারের দ্বিচক্রযান। ‘যান’, কারণ এতে স্টিয়ারিং আছে; মানুষ যেন পা দিয়ে চালাতে পারে, সে ব্যবস্থাও আছে। ১৮১৮ সালে এই বেলোসিপেডের পেটেন্ট করে নেন ড্রেইস। আদর করে এই দ্বিচক্রযানকে ডাকা হতো ‘হবি-হর্স’, মানে শখের ঘোড়া।
ড্রেইসের জীবনীকার হ্যান্স আরহার্ড লেসিং লিখেছেন, ড্রেইসের দুই চাকার সাইকেল বানানোর মূল উদ্দেশ্য ছিল, ঘোড়ার বিকল্প উদ্ভাবন। খাওয়াতে হয় না, এরকম বিকল্প। খাদ্যাভাবের সময় এমন বিকল্প পেয়ে মানুষ যে প্রবল আগ্রহের সঙ্গে লুফে নিয়েছিল, তা বলা বাহুল্য।
২২ কেজি ওজনের কাঠের ফ্রেমের এই সাইকেলে চড়ে তিনি ১৮১৭ সালের ১২ জুন এক ঘণ্টারও কম সময়ে ১৩ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছিলেন। তবে ড্রেইসের এই সাইকেল বেশিদিন বাজারে টেকেনি। এর একটা বড় কারণ, প্রচুর অ্যাকসিডেন্ট। অনেক শহরের কর্তৃপক্ষ এত দুর্ঘটনা দেখে এ ধরনের বাহন নিষিদ্ধও করেছিল। কিন্তু ততদিনে আসল কাজ হয়ে গেছে। মানুষ জেনে গেছে, দুই চাকার যান বানানো সম্ভব।
হ্যাঁ, যে অগ্ন্যুৎপাতের জন্য নেপোলিয়ন ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে যুদ্ধে হেরে যান, সেই একই অগ্নুৎপাতের ফলে সৃষ্ট দুর্ভিক্ষের সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে পৃথিবীতে ‘দুই চাকার সাইকেল’ বিপ্লবের সূচনা করেন কার্ল ভন ড্রেইস।
ওদিকে, বেশ কজন ফ্রেঞ্চ উদ্ভাবক তখন দ্বিচক্রযানের ধারণা নিয়ে কাজ করছেন। আরও উন্নত করার চেষ্টায় খেটে চলেছেন তাঁরা। ১৮৬৩ সালে এমনই তিন উদ্ভাবক, পিয়েরে লালমেন্ট, পিয়েরে মিশোঁ এবং আর্নেস্ট মিশোঁ উদ্ভাবন করেন ‘বাইসাইকেল’ নামের দ্বিচক্রযান।
২.
‘বাইক’ বললে এখন আর আমাদের বাইসাইকেল, অর্থাৎ সাইকেলের কথা মনে হয় না। মোটরসাইকেলের ছবি ভেসে ওঠে চোখে। অথচ ‘বাইক’ কথাটা এসেছে মূলত ‘বাইসাইকেল’ থেকে। সহজ বাংলায় যার অর্থ দাঁড়ায়, দুই চাকার সাইকেল।
ড্রেইসের সাইকেল জনপ্রিয়তা হারিয়ে ফেলার প্রায় চল্লিশ বছর পরে ইতিহাসের প্রথম ‘বাইসাইকেল’ নামের বাহনের দেখা পাই আমরা। এর মাঝে দ্বিচক্রযান নিয়ে মেতে উঠেছে পুরো ইউরোপ। চলেছে বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা। তিন চাকার যান, এমনকি চার চাকার অদ্ভুতদর্শন যানও উদ্ভাবিত হয়েছে।
ওদিকে, বেশ কজন ফ্রেঞ্চ উদ্ভাবক তখন দ্বিচক্রযানের ধারণা নিয়ে কাজ করছেন। আরও উন্নত করার চেষ্টায় খেটে চলেছেন তাঁরা। ১৮৬৩ সালে এমনই তিন উদ্ভাবক, পিয়েরে লালমেন্ট, পিয়েরে মিশোঁ এবং আর্নেস্ট মিশোঁ উদ্ভাবন করেন ‘বাইসাইকেল’ নামের দ্বিচক্রযান। এতে ছিল ধাতব ফ্রেম, আর পেডাল লাগানো ছিল সামনের চাকার সঙ্গে। ধাতব ফ্রেম এবং চালাতে গিয়ে হাড়গোড় কেঁপে যাওয়ার মতো কষ্ট হওয়ায় ইউরোপে এর নাম পড়ে যায় ‘বোন-শেকার’।
তারপর পেনি ফার্দিং নামের অদ্ভুত দর্শন বাইসাইকেল এসেছে, হাই-হুইলার নামের এক সাইকেলে চড়ে টমাস স্টিভেন্স নামের এক ইংরেজ ভদ্রলোক বেরিয়ে পড়েছেন বিশ্বভ্রমণে। ইতিহাস ঘুরে অবশেষে আধুনিক বাইসাইকেল আসে ১৮৮৫ সালে। এটি উদ্ভাবন করেন জন কেম্প স্টার্লি।
আধুনিক কেন? কারণ, আগের কোনো সাইকেলে চেইন ড্রাইভ সিস্টেম ছিল না। অর্থাৎ, এখন যেরকম সাইকেলের পেছনের চাকাটির সঙ্গে পেডালটি চেইন সিস্টেমের মাধ্যমে যুক্ত থাকে, সেটা আগের কোনো সাইকেলে ছিল না। জন কেম্প স্টার্লি এটি প্রথম নিয়ে আসেন। তাঁর উদ্ভাবিত সাইকেলে চাকা দুটোও ছিল একসমান। সে জন্য এই সাইকেলের সিটও অযথা অনেক উঁচুতে ছিল না। অর্থাৎ, আধুনিক সাইকেলের মতোই প্রায় সব কিছু। বেশ নিরাপদ। যথেষ্ট দ্রুতগামী। এর নাম দেওয়া হয় ‘সেফটি বাইসাইকেল’।
এটিই পরে আধুনিক দ্বিচক্রযানের ছাঁচ হয়ে ওঠে। ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ থেকে নিয়ে পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে থাকে আধুনিক সাইকেল।
সেনাদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমান থেকে সাইকেল ড্রপ করা হতো, অর্থাৎ মাটিতে ফেলা হতো। এসব সাইকেলকে তাই ডাকা হতো ‘বোম্বার বাইক’ নামে।
শেষের আগে
এই গল্প শেষ করার আগে একটা মজার তথ্য দেওয়ার লোভ সামলাতে পারছি না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সৈন্যদের বাহন হিসেবে প্রচুর সাইকেল ব্যবহার করা হয়। এমনকি প্যারাট্রুপাররাও সাইকেল ব্যবহার করত। সেনাদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমান থেকে সাইকেল ড্রপ করা হতো, অর্থাৎ মাটিতে ফেলা হতো। এসব সাইকেলকে তাই ডাকা হতো ‘বোম্বার বাইক’ নামে। দ্বিতীয় সাইনো-জাপানিজ যুদ্ধে, চীনের বিরুদ্ধে ৫০ হাজার সাইকেল-যোদ্ধা নামিয়েছিল জাপান!
আজ অবশ্য সাইকেল যুদ্ধের বাহন নয়, বরং শান্তি বা পরিবেশ রক্ষার বাহন হিসেবে খ্যাত। পরিবেশ বিপর্যয়ের অন্যতম বড় কারণ গ্রিন হাউস গ্যাসের মতো জ্বালানি। কাজেই অনেক বিজ্ঞানী ও জলবায়ুকর্মী আজ মনে করেন, পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে দুই চাকার সাইকেল।