ক্রিপ্টোকারেন্সি উত্থান, পতন ও পুনরুত্থান

দু-তিন বছর আগেও কেউ যদি জিজ্ঞেস করত, ক্রিপ্টোকারেন্সির নাম শুনেছেন? শতকরা ৭০ জনই হয়তো বলতেন, ‘না তো, সেটা কী?’ আর বাকি ৩০-এর মধ্যে ৯০ শতাংশ হয়তো বলতেন, ‘শুনেছি, তবে কী সেটা জানি না।’ বাদবাকি কেউ কেউ হয়তো জানতেন সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্রিপ্টোকারেন্সি বিটকয়েনের কথা। তাঁদের মধ্যে কেউ হয়তো বেশ কিছু বিটকয়েন কিনেও রেখেছেন। শেষোক্তরা বেশ জানেন প্রায় শূন্য মূল্যের বিটকয়েন এখন ট্রিলিয়ন ডলারের ব্যবসা। এখন পরিস্থিতি পাল্টেছে। ইউটিউবের বিটকয়েন আর ক্রিপ্টোকারেন্সির বাংলা চ্যানেল, ফেসবুকের পোস্ট, অন্যান্য ব্লগের আলোচনা এবং মাঝেমধ্যে ক্রিপ্টো নিয়ে সরকারি-বেসরকারি নানা কথাবার্তা দেখে বোঝা যায়, ক্রিপ্টো এখন আমাদের জীবনেও বাস্তব। কিন্তু ক্রিপ্টোকারেন্সি নিয়ে আমাদের চিন্তা কেমন যেন ‘ক্রিপটিক’ (রহস্যময় বা অস্পষ্ট)। এ লেখায় সে রহস্যের কোনো একটি কিনারা ধরে মোচড় দেওয়ার চেষ্টা করব ভাবছি। তাই শক্ত করে সিটবেল্ট বাঁধুন, জোরে শ্বাস নিয়ে ছাড়ুন, তারপর বসুন আরাম করে। এক বসায় পড়ে শেষ করে ফেলুন এ লেখা।

গল্পের শুরু ১৯৮৩ সালে। মার্কিন কম্পিউটারবিজ্ঞানী ও ক্রিপ্টোগ্রাফার ডেভিড চম একটি গবেষণা প্রবন্ধে (ব্লাইন্ড সিগনেচারস ফর আনট্রেসেবল মাইগ্র্যান্টস) দুটি বিষয় নিয়ে লিখলেন—ডিজিটাল ক্যাশ আর ব্লাইন্ড সিগনেচার। এর ফলে দুটো ব্যাপার ঘটল। এক. ব্যাংকের পক্ষে ‘ডিজিটাল অর্থ’ ছাড় করা সম্ভব হলো। দুই. মানুষের পক্ষে এই ডিজিটাল অর্থ ব্যাংক কিংবা অন্য কোনো ব্যক্তির নজরদারির বাইরে থেকে খরচ করা সম্ভব হলো। ধরে নেওয়া যায়, এই হলো বিশ্বের প্রথম ক্রিপ্টোকারেন্সির ধারণা। মোদ্দাকথা, কাগজের টাকার বিনিময়ে অথবা যেভাবে জিনিসপত্র কিনি, ঠিক সেটির অটোমেশন (কিংবা ডিজিটাল কৌশল উদ্ভাবন) করলেন তিনি। এ নতুন কারেন্সি কাগজের টাকার অনেক ঝামেলা সমাধান করেছে। যেমন সঠিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় প্রাইভেসি আর সিকিউরিটি ইত্যাদি। ১৯৮৯ সালে ডেভিড চম ধারণাটির রূপায়ণ করেন ডিজিক্যাশ নামের এক প্রতিষ্ঠানের নামে। তাঁর মুদ্রার নাম ছিল ই-ক্যাশ (eCash)। সফটওয়্যারের সাহায্যে ক্রিপ্টোগ্রাফিক ইলেকট্রনিক টাকা সঞ্চালনের ব্যবস্থা ছিল। কিছুদিন বেশ চলেছিল এ প্রতিষ্ঠান। সুইজারল্যান্ডের ক্রেডিট সুইস (Credit Swisse), জার্মানির ডয়চে ব্যাংক (Deutsete Bank), অস্ট্রিয়ার ব্যাংক অস্ট্রিয়া এর পৃষ্ঠপোষকতা করে। তবে ব্যবসা সফল হয়নি। কারণ, ১৯৯৮ সালে ডিজিক্যাশ দেউলিয়া হয় আর মৃত্যু ঘটে ই-ক্যাশের। সমসাময়িক কালে বিটগোল্ড নামের আরেকটি ডিজিটাল মুদ্রা বাজারে আসে। বিটগোল্ড ব্যবহার করতে হলে ব্যবহারকারীকে কম্পিউটারের সাহায্যে ক্রিপ্টোগ্রাফির বিশেষ সমস্যা সমাধান করতে হতো। তবে এ ডিজিটাল কারেন্সির বড় সমস্যা ছিল ‘দ্বৈত খরচ’ (Double Spending)। মানে যে কেউ অনায়াসে ডিজিটাল ডেটা কপি-পেস্ট করে অন্যের জিনিস নিজের করে ফেলতে পারত। এ সমস্যার সমাধান করার জন্য বিশ্বকে প্রায় এক দশক বসে থাকতে হয়েছিল।

ব্লকচেইনের সুবিধা হলো এতে রাখা ডেটার কোনো পরিবর্তন কেউ করলে সেটি একটি নতুন ডেটা হয়ে জমা হয়। তার মানে হলো মূল ডেটা অপরিবর্তিত হয়েও ডেটা সব রয়ে যায় ব্লকে ব্লকে। এ ব্লকগুলোর একটির মধ্যে অন্যটির সংযোগ ঠিকানা দেওয়া থাকে, যাতে শুরু হয় একটা চেইন—এটি ব্লকচেইন।

সাতোশি নাকামোতো

২০০৮ সালের ৩১ অক্টোবর ‘সাতোশি নাকামোতো’ ছদ্মনামধারী কোনো এক ব্যক্তি কিংবা কয়েকজনের দল ছাপালেন একটি শ্বেতপত্র (White Pages)—বিটকয়েন: আ পিয়ার-টু-পিয়ার ইলেকট্রনিক ক্যাশ সিস্টেম। তার কদিন পর ২ নভেম্বর সাতোশি ক্রিপ্টোগ্রাফির এক মেইলিং লিস্টে ছুড়লেন একটি বার্তা। যাতে এ সম্পর্কে মানুষকে জানানো হলো। কোডও উন্মুক্ত হলো। ডিজিটাল ক্যাশ-৪৯ সেখানে প্রস্তাবিত হলো নতুন করে। পূর্ববর্তী ডিজিটাল অর্থ থেকে এই বিটকয়েনের বড় পার্থক্য হলো প্রাইভেসি, সিকিউরিটি, সঠিক নিয়ন্ত্রণ তো বটেই, তদুপরি দ্বৈত খরচের সমস্যা আর রইল না। বিটকয়েন ব্যবহার করল ‘ব্লকচেইন’ নামের প্রযুক্তি। তারপর নিয়ে এল প্রুফ অব ওয়ার্কের (Proof of work) ধারণা। শুরু হলো আধুনিক ক্রিপ্টোকারেন্সির যাত্রা।

বিটকয়েনের বাকি ইতিহাস বলার আগে ব্লকচেইন নিয়ে দুটি কথা বলে নিই। ব্লকচেইন প্রযুক্তির উদ্ভব না হলে ক্রিপ্টোকারেন্সির এই যুগের শুরু হতো না। ব্লকচেইন কী? এককথায়, ব্লকচেইন হলো এমন এক ডেটা স্ট্রাকচার (ডেটা রাখার কম্পিউটিং প্রক্রিয়া), যাতে রাখা ডেটার আর কোনো পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। ব্যবসার মূল উপাদান তথ্য বা ডেটা। যত সঠিক এই তথ্য, ব্যবসার জন্য সোর্স তত ভালো। ব্লকচেইনের সুবিধা হলো এতে রাখা ডেটার কোনো পরিবর্তন কেউ করলে সেটি একটি নতুন ডেটা হয়ে জমা হয়। তার মানে হলো মূল ডেটা অপরিবর্তিত হয়েও ডেটা সব রয়ে যায় ব্লকে ব্লকে। এ ব্লকগুলোর একটির মধ্যে অন্যটির সংযোগ ঠিকানা দেওয়া থাকে, যাতে শুরু হয় একটা চেইন—এটি ব্লকচেইন। মোটকথা, এমন এক প্রযুক্তি থাকলে যেকোনো তথ্যের আদান-প্রদান স্বচ্ছ-সূক্ষ্মভাবে (Transparent) করা যায় এবং কোনো পরিবর্তনে সবার নজর (Tracking) রাখা সম্ভব হয়। টাকা যদি ডিজিটাল তথ্য হয়, তবে ব্লকচেইনে তাকে উঠিয়ে দিলে একটু আগে বলা দ্বৈত খরচের (Double Spending) সমস্যা আর রইল না। এখন থেকে যা কিছু পরিবর্তন-পরিবর্ধন-সংযোজন হবে, তার সবকিছু ব্লকচেইনে অপরিবর্তনীয় টালি খাতায় (Tally Ledger) থেকে যাবে। এর বাইরে ব্লকচেইনে আরও একটি সুবিধা হলো ডিস্ট্রিবিউটেড লেজার। মানে সবার জন্য খুলে রাখা একটি টালি খাতা, যাতে শত শত লোক যত তথ্য আদান–প্রদান করবে, তা সবার জানা থাকবে এবং কেউ কোনো ভুল করতে চাইলে বা করে ফেললে সবাই ধরে ফেলতে পারবে। ডিজিটাল কারেন্সির ব্যবহার নির্ভরযোগ্য করার জন্য এই তো মোক্ষম প্রযুক্তি।

২০০৯ সালের ৩ জানুয়ারি সাতোশি নাকামোতো তৈরি করলেন বিটকয়েনের প্রথম ব্লক। তৈরি হলো বিটকয়েন ব্লকচেইন। বিটকয়েন ব্লকচেইনের আগে এ প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে খুব একটা আলোচনার খবর বেরোয়নি। এই প্রথম ব্লকটি এখন ‘জেনেসিস ব্লক’ (সূচনা ব্লক) নামে পরিচিত। মোট পঞ্চাশটি বিটকয়েনের তথ্য নিয়ে এই ব্লক। প্রথম প্রকাশের সময় বিটকয়েনের কোনো মূল্যই ছিল না বলতে গেলে। সাতোশি নাকামোতো নিজেই (ধরে নিন তিনি একজন ব্যক্তি) এই কয়েনগুলো মাইন করেছিলেন। বিটকয়েন মাইনিংয়ের ব্যাপারটি একটু পরে বলছি, কিছুটা ইতিহাস হাতড়ে নিয়ে।

আরও পড়ুন

সূচনা–পরবর্তী প্রথম কয়েক মাসে বিটকয়েনের মূল্যের কোনো উন্নতি হয়নি। ছয় মাস পর এটি লেনদেনযোগ্য হয়। ২০১০ সালের এপ্রিল নাগাদ এক বিটকয়েনের দাম উঠল ১৪ মার্কিন সেন্টস। সে বছরের নভেম্বরে এই দাম বেড়ে উঠল ৩৬ সেন্টস। এর মধ্যে ঘটল আরেক ঘটনা। গ্যাভিন অ্যান্ডারসেন নামের এক সফটওয়্যার ডেভেলপার ২০১০ সালের জুনে বিটকয়েনে মজে তৈরি করলেন বিটকয়েন ফসেট (বিটকয়েন কল) নামের এক ওয়েবসাইট। যেটি প্রায় বিনা পয়সায় বিটকয়েন বিতরণ শুরু করল। শর্ত কেবল একটি, ক্যাপচার (Captcha) সমাধান করতে হবে (নানা ওয়েবসাইটে কিছু শব্দ বা ছবির সমস্যা দেওয়া থাকে, যাতে মানুষ কিংবা সফটওয়্যার—কে ওয়েবসাইট ব্যবহার করছে, তা ধারণা করা যায়)। এর কিছুদিনের মধ্যে গ্যাভিন প্রায় ১৯ হাজার ৭০০ বিটকয়েন এভাবে জনগণের মধ্যে বিতরণ করে দিলেন। গ্যাভিন বিটকয়েনের কাজে জড়িয়ে পড়লেন ওতপ্রোতভাবে। তাঁর মতো আরও অনেকে এগিয়ে এলেন। বিটকয়েনের মাধ্যমে বিশ্বের নতুন মুদ্রাপদ্ধতি চালু করার নেশায় মাতলেন সবাই। আর হু হু করে বাড়তে থাকল এর দাম। ২০১১ সালে দাম উঠল ৮ ডলার ৮৯ সেন্ট। ফোর্বস ম্যাগাজিন আর গকার (Gawker) অনলাইন পত্রিকায় নিউজ হলো। অনলাইনে ওষুধের অবৈধ কেনাবেচায় বিটকয়েনের বেশ চল শুরু হলো। সেই সঙ্গে আরও চড়ল দাম।

বিটকয়েনের লেনদেন আরও দ্রুত এবং নিরাপদ করার জন্য তৈরি হয় লাইটিং (Lighting) নেটওয়ার্ক। এ পরিবর্তনের এক সপ্তাহের মধ্যে বিটকয়েনের দাম ওঠে ২ হাজার ৭০০ ডলারে। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে বিটকয়েনের দাম চড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২০ হাজার ডলার।

২০১১ সালেই এল লাইটকয়েন (Litecoin)। ২০১৩ সালের মধ্যে চলে এল পিপিকয়েন (PPcoin), নেইমকয়েনসহ (Namecoin) আরও ১০টি বিক্সিকয়েন। তাদের ডাকা হলো অল্টকয়েন (Altcoin) নামে, বিটকয়েনের অলটারনেটিভ বা বিকল্প হিসেবে। এ কয়েনগুলোর বেশ কিছু বিটকয়েনের কোডের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা, আবার কিছু কিছুর কোড সম্পূর্ণ ভিন্ন। এ নতুন প্রতিদ্বন্দ্বীদের আগমন ক্রিপ্টোকারেন্সির বাজার বড় করে তুলল। ২০১২ সালে গ্যাভিন অ্যান্ডারসেন এবং অ্যানক তৈরি করলেন বিটকয়েনের ফাউন্ডেশন। এর লক্ষ্য বিটকয়েনের বিস্তার বাড়ানো। এমন সময় ওপেন কয়েন (পরবর্তীকালে রিপল) বলে আরেকটি ক্রিপ্টোকারেন্সি এল। ২০১৪ সালে নানান খাতে ঢুকল ভেঞ্চার ক্যাপিটালের অর্থ। ২০১৩ সালের নভেম্বরের ১৯ তারিখ বিটকয়েনের দাম উঠল ৭৫৫ ডলার। একই দিনে দাম পড়ে হলো ৩৭৮ ডলার। তারপর ৩০ নভেম্বর নাগাদ দাম উঠল ১ হাজার ১৬৩ ডলারে। এরপর আবার দাম পড়া শুরু। শেষমেশ ২০১৫ সালে এসে সেটি ঠেকল ১৫২ ডলারে। এর একটি কারণ ছিল জাপানের MT.Gex নামের তখনকার সবচাইতে বড় বিটকয়েন এক্সচেঞ্জ সম্ভবত অনেক দিনের হ্যাকিংয়ের ফলে ৮ লাখ ৫০ হাজার বিটকয়েন হারায় এবং দেউলিয়া হয়ে পড়ে। তবে এ ঘটনার পর এক্সচেঞ্জ সিকিউরিটির দিকে নজর পড়ে ক্রিপ্টোকারেন্সি কমিউনিটির। ব্যবহারকারীদের জন্যও তৈরি হয় হার্ডওয়্যার এবং সফটওয়্যার ওয়ালেট বা মানিব্যাগ।

আরও পড়ুন

এরপর একটু ছোটখাটো চড়াই-উতরাই শেষে ২০১৬ সালের জুলাইয়ে বিটকয়েনের দাম ওঠে ৪৩৪ ডলার। আর জানুয়ারি ২০১৭-এ সেটি ওঠে ৯৯৮ ডলারে। বিটকয়েনের লেনদেন আরও দ্রুত এবং নিরাপদ করার জন্য তৈরি হয় লাইটিং (Lighting) নেটওয়ার্ক। এ পরিবর্তনের এক সপ্তাহের মধ্যে বিটকয়েনের দাম ওঠে ২ হাজার ৭০০ ডলারে। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে বিটকয়েনের দাম চড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২০ হাজার ডলার। এর মধ্যে ২০১৫ সালে চালু হওয়া ইথারিয়ামের ব্লকচেইনের ওপর দাঁড়ানো ইথার ক্রিপ্টোকারেন্সি একলাফে ২ নম্বর স্থানে চলে আসে। ইথারিয়ামের বিশেষত্ব, স্মার্ট কন্ট্রাক্টের ফলে লেনদেন হলো দ্রুত, আরও কার্যকর। তা ছাড়া ইথারিয়ামের ফলে ব্লকচেইনের বহুবিধ ব্যবহারের পথ খুলে গেল। এখন পর্যন্ত ইথারিয়াম ব্লকচেইন ব্যবহারকারী প্রজেক্টের সংখ্যা দুই লাখের বেশি। ইথারিয়াম ব্লকচেইনে নতুন নতুন প্ল্যাটফর্ম নতুন নতুন চেইন তৈরি করতে পারে। তাই ইথারিয়ামের এই মডেলের আদলে অনেক ব্লকচেইন, যেমন কারডানো (Cardano), তেজোস (Tezos), নিওসহ (Neo) আরও বেশ কিছু বাজারে ছড়িয়ে পড়ল।

বিটকয়েনের ওই চড়া দাম (প্রায় ২০ হাজার ডলার) ২০১৮ সালের শেষে নেমে আবার ৩ হাজার ৭০০ ডলারে স্থিত হয়। দ্বিতীয় স্থানে থাকা ইথার এমন চড়াই-উতরাই পেরিয়ে চলল। যদিও এ সময়ে এর দাম সর্বোচ্চ উঠেছিল ১ হাজার ৪০০ ডলার পর্যন্ত। নানা ধরনের এক্সচেঞ্জ (যেখানে ডলার বা অন্য অর্থের আগে ক্রিপ্টোকারেন্সির বিনিময় ঘটে) হ্যাকিং, নানা আর্থিক প্রতিষ্ঠানসংক্রান্ত নিয়মনীতি এ দরের উত্থান-পতনে বেশ হাওয়া দিয়েছে।

২০২০ সালে এর দাম আবার বাড়তে শুরু করল। মাইক্রোস্ট্র্যাটেজি নামে একটি ব্যবসা বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ২০২০–এর আগস্ট নাগাদ কিনে নিল প্রায় ২৫০ মিলিয়ন ডলার সমমূল্যের বিটকয়েন। এর কিছুদিন পর ২০২১ সালের শুরুতে ইলন মাস্কের টেসলা কিনল ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার মূল্যের বিটকয়েন। এত কিছুর ফলাফল? ২০২১ সালের নভেম্বরে বিটকয়েনের দাম উঠল ৬৯ হাজার ডলার।

২০১০ সালের মে মাসের ২২ তারিখ লাসলো হানিয়েজ নামের এক কম্পিউটার প্রোগ্রামার পাপাজোনস পিৎজার দোকানে দুটো ফ্যামিলি সাইজ পিৎজার অর্ডার দিলেন। লাসলো ছিলেন বিটকয়েন সফটওয়্যার তৈরির প্রথম দিককার কর্মী। বললেন, এ দুটি পিৎজার জন্য তিনি ১০ হাজার বিটকয়েন দেবেন। লাসলোর নিজের কেনা এই পিৎজাই বিশ্বে বিটকয়েন দিয়ে প্রথম কেনাকাটা। আর এ জন্য ২২ মে দিনটিকে বিটকয়েন কমিউনিটির লোকজন ‘বিটকয়েন পিৎজা ডে’ বলে প্রতিবছর পালন করেন। তবু অবাক লাগে ২০১০ সালে দুটো ফ্যামিলি সাইজ পিৎজার দাম মিটেছিল ১০ হাজার বিটকয়েনে। ২০২১ সালে তার দাম যখন ৬৯ হাজার ডলার, তখন হিসাব কষে ভয় লাগে লাসলো কত টাকা হারালেন। একেবারে প্রায় শূন্যমূল্যের বিটকয়েন মাত্র এক যুগ পরই যে অর্ধশত হাজার ডলারের মূল্য ছোঁবে, তা কি কেউ ভেবেছিল?

আরও পড়ুন
বিটকয়েনের প্রথম ব্যবহারকারীরা ছিলেন তরুণ যুবা, যাঁরা চাইছিলেন কেন্দ্রীয় শক্তি থেকে মুক্ত মুদ্রাব্যবস্থা। সবার মধ্যে ধারণা জন্মাল বিটকয়েনের ওপর যেহেতু কোনো সরকার বা ‘বিজনেসের’ হাত নেই, তাই এর সত্যিকার মালিক জনগণ।

ক্রিপ্টোর এই উত্থানের কী কারণ? এর একটি প্রযুক্তিগত দিক তো রয়েছে, আরেকটি হলো বাজার অর্থনৈতিক দিক। আগেই বলেছি বিটকয়েন তার পূর্ববর্তী ডিজিটাল মুদ্রা থেকে ভিন্ন, কারণ এটি ব্লকচেইন প্রযুক্তির ওপর দাঁড়িয়ে। ব্লকচেইন ব্যবহারের সবচেয়ে বড় উপকার হলো বিকেন্দ্রীকরণের সুবিধা। যেকোনো লেনদেনের মূল শর্ত ‘আস্থা’। আমরা ‘টাকা’ দিয়ে ‘খাবার’ কিনি। কারণ, আমাদের সরকারের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘টাকা’কে বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে অনুমোদন করেছে। ১০০ টাকার যে নোটটি আমরা ব্যবহার করছি, সেটিকে ১০০ টাকা বলছি। কারণ, বাংলাদেশ ব্যাংক একে ১০০ টাকা বলে। এই কেন্দ্রীয় অনুমোদনব্যবস্থা যুগ যুগ ধরে আমাদের অর্থনীতির রাশ ধরে রেখেছে। আমাদের চেনাজানা ব্যাংকিং ব্যবস্থা এমনই। আর এই কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা অনেকের মতে ক্ষমতাধারীদের আরও ক্ষমতাশালী করার হাতিয়ার। ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণক্ষমতা আমার হলে বাজারে টাকার পরিমাণও আমি নিয়ন্ত্রণ করব। আর এই শক্তিতে বলীয়ান হয়ে বাজারের যাবতীয় কার্যক্রমের নিয়ন্ত্রণ আমার হাতের মুঠোয় থাকবে। কিন্তু যদি এই ‘আস্থার’ বিষয়টিকে বিকেন্দ্রীকরণ সম্ভব হয়, তো? কোনো কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা সরকারের নিয়মনীতি আর মানতে হবে না। ব্লকচেইনের ফলে ‘আস্থার’ বিকেন্দ্রীকরণের যে সুবিধা মিলল, তাতে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের আর প্রয়োজন রইল না। বিটকয়েন ব্লকচেইনের যে নেটওয়ার্ক, তার সব শরিক একত্রে মিলে সব লেনদেন অনুমোদন দেওয়ার ব্যবস্থা তৈরি হওয়ার ফলে ভুল লেনদেনের সুযোগ থাকল না। তা ছাড়া ব্লকে ব্লকে সব তথ্য থেকে যাওয়ার ফলে যেকোনো লেনদেনের ঠিকুজি বের করা সম্ভব হলো।

আরও পড়ুন

বিটকয়েনের বিপুল উত্থানের পেছনে কেন্দ্রের হাত থেকে ক্ষমতা ছিনিয়ে আনার এক বিশাল আশ্বাস বড় হাতিয়ার ছিল। ২০০৮ সালের বৈশ্বিক মন্দার কালে বিটকয়েনের আগমন। ১৫৮ বছরের পুরোনো আমেরিকায় চতুর্থ লিমান ব্রাদারসের (Lehman Brothers) দেউলিয়াত্ব বিশ্বকে কাঁপায়। এই বিনিয়োগ ব্যাংক কোম্পানি রাস্তায় লুটিয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে পথে বসে যায় লাখ লাখ বিনিয়োগকারী। সরকার ‘বেইল আউট’ প্ল্যান করে বড় বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠান বাঁচানোর চেষ্টা করে। অন্যদিকে যাদের বিনিয়োগে এসব ব্যাংকের গড়ে ওঠা, সেসব পথে বসা সাধারণ নাগরিকের পাশে কেউ দাঁড়ায় না। এক রাতে তাদের সব সঞ্চয় হাওয়া। আর কেন্দ্রীয় শাসন তার কোনো প্রতিকার করতে তো পারেই না, বরং যারা এই দুরবস্থার জন্য দায়ী, তাদের ‘বেইল আউট’ করে বাঁচানোর চেষ্টায় তত্পর হয়। এই যখন বাস্তবতা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর আস্থা রাখা তখন কি আর সম্ভব? বিটকয়েন মুদ্রাব্যবস্থার যে বিকল্প আখ্যান উপস্থাপন করল, তার মূলে রইল—‘কেন্দ্রীয় নৈরাজ্য থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত, দেশের রাজনীতি বা অন্য সব নিয়মনীতি থেকে মুক্ত সম্পূর্ণ বিকেন্দ্রিক মুদ্রাব্যবস্থা, যা একটি ডিজিটাল ক্যাশ হাতে তুলে দেবে, যাতে কোনো উল্টাপাল্টা হলে সবাই জানতে পারবে এবং যে কেউ ইচ্ছা করলে মুদ্রার চালানে কমবেশি করতে পারবে না।’ এমন সম্পূর্ণ স্বাধীন সুরক্ষিত মুদ্রা কে না চাইবে?

বিটকয়েনের প্রথম ব্যবহারকারীরা ছিলেন তরুণ যুবা, যাঁরা চাইছিলেন কেন্দ্রীয় শক্তি থেকে মুক্ত মুদ্রাব্যবস্থা। সবার মধ্যে ধারণা জন্মাল বিটকয়েনের ওপর যেহেতু কোনো সরকার বা ‘বিজনেসের’ হাত নেই, তাই এর সত্যিকার মালিক জনগণ। এই বিটকয়েন দিয়ে আমরা যা কিনব, যা বেচব—তাতে কেউ কিছু বলতে পারবে না। কেউ এর নিয়ন্ত্রণ দখল করে এর ওপর ছড়ি ঘোরাতে পারবে না। হাজারো তরুণ তাঁদের কম্পিউটারে বিটকয়েনের সফটওয়্যার ইনস্টল করে লেগে গেলেন ‘মাইনিং’-এর কাজে।

বিটকয়েন
ছবি: রয়টার্স

বিটকয়েন মাইনিং কী? আজকের মুদ্রা তো প্রিন্টিং প্রেসে তৈরি হয়, কিন্তু শত বছর আগে যখন সোনা-রুপা মুদ্রা হিসেবে ব্যবহৃত হতো, তখন খনিতে সোনা-রুপার উত্তোলন বা মাইনিংয়ের পর তাতে সরকারি সিল বসিয়ে টাঁকশাল থেকে মুদ্রা বাজারে ছাড়া হতো। বিটকয়েনও কোনো না কোনোভাবে তৈরি করতে হবে এবং সেটি হতে হবে বিকেন্দ্রীকৃত প্রক্রিয়াতে। এর তৈরির কাজটির একটা ধাপ হলো মাইনিং। তবে এ ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয় লাখ লাখ কম্পিউটারে রাখা মাইনিং সফটওয়্যার। বিশেষত এই কম্পিউটারগুলো রাত–দিন বসে বিশেষ গাণিতিক সমস্যার সমাধান করে এই মাইনিংয়ের কাজ করে। বিটকয়েনের প্রতিটি লেনদেন সঠিকভাবে হচ্ছে কি না, সেটি নিশ্চিত করেই তার পর ব্লকে তার তথ্যটি ব্লকচেইনের লেজারে (টালি খাতা) লেখা হয়। হাজারো ব্যবহারকারীর কম্পিউটারে চলা বিটকয়েন কোড কাজটি করে। আর এই যাচাইয়ের কাজটি করা হয় বিশেষ গাণিতিক সমস্যা সমাধান করে, যার জন্য দরকার অসুরীয় কম্পিউটিং ক্ষমতা। সমস্যা সমাধানের জন্য লাখ লাখ কম্পিউটার প্রতি সেকেন্ডে প্রতিযোগিতা করছে। তবে যে কম্পিউটার সেটি সবার আগে করবে, সে-ই পাবে একটি বিটকয়েন। এ হলো মাইনিং। কাজ যেভাবে বললাম তেমন সহজ নয়—এটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যে যত দিন যাবে ততই মাইনিং কঠিন হয়ে পড়বে। যে কেউ যেমন খুশি, যত খুশি বিটকয়েন যাতে তৈরি করতে না পারে, তাই এ ব্যবস্থা। অন্যান্য ক্রিপ্টোকারেন্সি এই একই পন্থা অবলম্বন করে।

প্রথম দিকে ক্রিপ্টোকারেন্সির বিক্রিবাট্টা অন্ধকার অন্তর্জালে (Darkweb) সীমাবদ্ধ ছিল। নিষিদ্ধ বস্তু কেনাকাটায় বিটকয়েন হলো সহযোগী। কারণ, কোনো সরকারের পক্ষে এই লেনদেন ট্র্যাক করা প্রায় অসম্ভব। নিষিদ্ধ ড্রাগ ও এরকম নানা পণ্য ছাপিয়ে ধীরে ধীরে প্রতিদিনের ব্যবহার্য পণ্য কেনাকাটায় ব্যবহৃত হতে লাগল বিটকয়েনসহ অন্যান্য ক্রিপ্টোকারেন্সি। বড় বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠান তাদের দ্বার খুলল। ২০১৪ সালে ওভারস্টক (Overstock) নামে অনলাইনভিত্তিক কেনাবেচার কোম্পানি প্রথম বিটকয়েনের মাধ্যমে লেনদেন চালু করে। আর ২০২১ সাল নাগাদ এসে প্রায় সব বড় কোম্পানি—অ্যামাজন বা মাইক্রোসফট সবাই ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে লেনদেন চালু করে। মাস্টারকার্ডও চালু করে ক্রিপ্টোকারেন্সি-নির্ভর ডেবিট কার্ড। পেপ্যাল জানায়, তারাও ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করে কেনাকাটা করার ব্যবস্থা করে দেবে। খোদ আমেরিকায় এখন অনেক গাড়ির ডিলার বিটকয়েনের বিনিময়ে গাড়ি বিক্রি করছেন। গাড়ি থেকে গয়না, পথ্য থেকে তথ্য—প্রায় সবকিছু এখন বিটকয়েন কিংবা অন্য ক্রিপ্টোমুদ্রা দিয়ে কেনা সম্ভব। ধীরে ধীরে বিভিন্ন দেশের সরকারও বিটকয়েন কিংবা অন্যান্য ক্রিপ্টোকারেন্সিতে নজর দিতে শুরু করল।

আরও পড়ুন
কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তার কথা জনমনে বেশ জমে উঠল। অনেক উদ্যোক্তা এগিয়ে এলেন নতুন বুদ্ধি নিয়ে। কোভিড-১৯ অতিমারিকালে ঘরে বসা অন্তর্জালে মানুষের নানা কেনাকাটা, বৈধ-অবৈধ ব্যবহার যত বাড়ল, ততই জমে উঠল ক্রিপ্টোকারেন্সির ওপর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ থাকার আলোচনা।

প্রথম দিকে নানা দেশ ক্রিপ্টোকারেন্সির প্রতি বাঁকা দৃষ্টি রাখলেও ধীরে ধীরে অনেকে হয় ক্রিপ্টো-মাইনিং নতুবা পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ে ক্রিপ্টো ব্যবহারের অনুমতি দিতে শুরু করেছে। ক্রিপ্টো মাইনিংয়ে যেহেতু বিপুল কম্পিউটিং ক্ষমতা লাগে, তাই যে দেশগুলোতে বিদ্যুতের দাম তুলনামূলক কম, সেখানে ক্রিপ্টোমাইনিং বেশ লাভজনক ব্যবসা। যুক্তরাষ্ট্র এই মাইনিং কাজে বিশ্বে প্রথম। এরপর রয়েছে কাজাখস্তান, রাশিয়া, কানাডা, আয়ারল্যান্ড, মালয়েশিয়া, জার্মানি ও ইরান। এ দেশগুলোর মধ্যে ইরান কিছুদিন আগে তার ওপর দেওয়া ডলার ব্যবহার ও বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা পাশ কাটাতে ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে আন্তর্দেশীয় বাণিজ্য করার কথা বলেছে।

দিগ্‌বিজয়ী ক্রিপ্টোকারেন্সির অগ্রযাত্রা তারপর ২০২২ সালে এসে যেন ভীষণভাবে থমকে দাঁড়াল। বিকেন্দ্রীকরণকৃত মুদ্রাব্যবস্থায় যে স্বাধীনতা আর সামাজিক ও ব্যক্তিগত অর্থনীতির যে উন্নতির সম্ভাবনা নিয়ে বিটকয়েন ও অন্যান্য ক্রিপ্টোকারেন্সি যাত্রা শুরু করেছিল, মানুষ যেন তার মধ্যে এখন নানা বিভ্রম খুঁজে পাচ্ছে। মিসরেও নাকি একটি অন্তর্জালকেন্দ্রিক কেনাবেচার প্ল্যাটফর্ম ছিল, যেখানে ক্রিপ্টোকারেন্সি দিয়ে অবৈধ বা নিষিদ্ধ বা প্রেসক্রিপশন লাগবে এমন ওষুধ থেকে শুরু করে নানা পণ্য কেনাবেচা চলত। অনেকে বলত, এটি পশ্চিমা বিশ্বের বিমাহীন রোগীদের জন্য স্বর্গের উপহার। আবার অনেকে বলত, সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থেকে এসব কাজ অনৈতিক ও অবৈধ। শেষোক্ত ব্যক্তিরা চাইছিল ক্রিপ্টোকারেন্সির এই বৈধতাহীন ব্যবহার বন্ধ হোক। এসব চিন্তা থেকে নানা নিয়মে ক্রিপ্টোকারেন্সি তাড়ানোর চিন্তায় ধীরে ধীরে জেঁকে বসল কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার ভূত।

কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তার কথা জনমনে বেশ জমে উঠল। অনেক উদ্যোক্তা এগিয়ে এলেন নতুন বুদ্ধি নিয়ে। কোভিড-১৯ অতিমারিকালে ঘরে বসা অন্তর্জালে মানুষের নানা কেনাকাটা, বৈধ-অবৈধ ব্যবহার যত বাড়ল, ততই জমে উঠল ক্রিপ্টোকারেন্সির ওপর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ থাকার আলোচনা। মূলকথা বিকেন্দ্রীকৃত মুদ্রাব্যবস্থা প্রযুক্তিগতভাবে সম্ভব হলেও মানুষ যে এর বহুবিধ বৈধ-অবৈধ ব্যবহার করছে, তার একটি নিয়ন্ত্রণ থাকা দরকার। কিছু স্টার্টআপ বের হলো, যারা নতুন ক্রিপ্টোকারেন্সি বের না করে বরং ক্রিপ্টোকারেন্সিতে বিনিয়োগের নতুন প্রথা নিয়ে এল। যা তৈরি করল, সেগুলোকে বলা যায় ‘ক্রিপ্টোব্যাংক’।

ক্রিপ্টোকারেন্সির বাইরেও নানা ক্ষেত্রে ব্যবহার শুরু হয়েছে ব্লকচেইনের
ছবি: রয়টার্স

ক্রিপ্টোব্যাংক শুনে হয়তো ঘাবড়ে যাবেন অনেকে। যে ব্যাংকব্যবস্থার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে বিটকয়েন ও অন্যান্য ক্রিপ্টোকারেন্সির আগমন, সেই ব্যাংকের ধারণায় ফিরল এই মুদ্রাব্যবস্থা? বিকেন্দ্রীকরণের কথা বলে শেষে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণে ফেরা? সত্যি বলতে কি, এই স্টার্টআপগুলো নিজেদের ব্যাংক বলে পরিচিত করত না। কারণ, তাতে আবার সাধারণ ব্যাংকব্যবস্থা সরকারি নিয়ন্ত্রণে গড়তে হবে। কিন্তু এসব স্টার্টআপে ব্যবহারকারী বিটকয়েন জমা রাখতে পারেন—যত দিন খুশি, আর তার থেকে সুদও মিলবে, এসব জমানো বিটকয়েন স্টার্টআপগুলো অন্য কোথাও বিনিয়োগ করবে। পাঠক নিজেই ভেবে নিন তাদেরকে ব্যাংক বলে ডাকবেন কি না।

এমন এক স্টার্টআপ কোম্পানি সেলসিয়াস গত বছর ক্রিপ্টোদুনিয়ায় প্রায় আলোড়ন তুলে ফেলেছিল। সুদের নেশায় বুঁদ হয়ে অনেকে বিটকয়েন রেখেছে এ প্রতিষ্ঠানে। পশ্চিমা বিশ্বে সাধারণ ব্যাংকব্যবস্থায় যেখানে জমার অর্থে ১ থেকে ২ শতাংশ সুদ, সেখানে বহুগুণ বেশি সুদ মেলার প্রত্যাশা দিল সেলসিয়াস। কোভিড অতিমারিতে জর্জরিত অর্থনীতিতে সাধারণ ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর ভক্তি উঠে গিয়েছিল অনেকের। বেশি লাভের আশা—তাই যা কিছু সঞ্চয়, সব ঢেলে দিলেন তাঁরা। সেলসিয়াসের হর্তাকর্তারা বলত, ব্যবহারকারীর মূল অর্থ তো নিরাপদ থাকবেই, তদুপরি পাবেন বহুগুণ বেশি। অনেক অর্থনীতিবিদ, বিনিয়োগবিশারদ নানাভাবে মানুষকে সতর্ক করেছেন এমনভাবে এতে ঝাঁপিয়ে না পড়তে। কিন্তু মানুষ কি আর শোনে? বিনিয়োগ যত বাড়তে লাগল, সেলসিয়াসের উত্তাপ ততই বাড়ন্ত হলো। আর ধেই ধেই করে বাড়ল বিটকয়েনসহ অন্য আরও শখানেক ক্রিপ্টোকারেন্সির দর।

আরও পড়ুন

এ বছরের শুরুতে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণ, কোভিড–পরবর্তী মন্দা, বিশ্বব্যাপী পণ্য সরবরাহব্যবস্থার দুরাবস্থা, সেই চাপে পড়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশে সুদের হার বাড়ানো ইত্যাদি আঘাত হানল স্টক মার্কেটে। আর তার পরের বলি হলো ক্রিপ্টো। হঠাৎ করে মানুষ যেন এসব ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগে অনুত্সাহী হয়ে পড়ল। যখন বৃহত্তর অর্থনৈতিক পরিমণ্ডলে উথাল-পাতাল চলে, মানুষ তখন স্বভাবত হাত গুটিয়ে বসে। বিটকয়েনের দাম নেমে গেল অর্ধেকে, ইথারিয়ামের ইথারের মূল্যও নেমে গেল তরতর করে। অন্যান্য ক্রিপ্টোকারেন্সির দরপতন শুরু হলো। যেন একের পর এক তাস খসে পড়তে লাগল ক্রিপ্টোকারেন্সির বিনিয়োগের বাজারে। সেলসিয়াসের বিনিয়োগকারীরা তাদের অর্থ ফেরত চাইতে শুরু করল। এই তাড়না এমনই বাড়ন্ত হলো যে সেলসিয়াস একপর্যায়ে গত জুন মাসে তার ১৭ লাখ গ্রাহককে জানাল, তাঁরা তাঁদের অর্থ এখন উত্তোলন করতে পারবেন না। প্রশ্ন উঠল সেলসিয়াসের স্বচ্ছতার, সবাই শঙ্কিত হলো, তাঁদের অর্থ ফেরত আসবে কি আদৌ? কিছুদিনের মধ্যে মিলল ভালো উত্তর, সেলসিয়াস দেউলিয়াত্বের ঘোষণা দিল। সাধারণ ব্যাংক যদি দেউলিয়া হয় তো বিচারব্যবস্থার বরাতে গ্রাহক কিছু হলেও তার টাকা ফেরত পায়। কিন্তু ক্রিপ্টোকারেন্সির এই তথাকথিত ব্যাংক তো সাধারণ ব্যাংকের রেগুলেশন মেনে চলে না। তাহলে কি গ্রাহকদের সব অর্থই হাওয়া হয়ে গেল? উত্তর ‘না’ হওয়ার সম্ভাবনা অতি ক্ষীণ।

ক্রিপ্টোকারেন্সি

সাধারণ ব্যাংকব্যবস্থার দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে যে ক্রিপ্টোকারেন্সির আগমন, সেই একই দুর্নীতির খপ্পরে যেন পড়ল ক্রিপ্টোকারেন্সির গ্রাহকেরা। ক্রিপ্টোকারেন্সির ওপর থেকে মানুষের আস্থা কি তাহলে চলে গেল? আমরা আগেও বলেছি, ক্রিপ্টোর দর এর আগেও পড়েছে, আবার উঠেছে। কিন্তু তখন কারণ ছিল ভিন্ন, প্রযুক্তিগত কিছু পরিবর্তনে, সিকিউরিটির উন্নয়নে আবার ক্রিপ্টোর দর বেড়েছে, মানুষের আস্থা বেড়েছে। কিন্তু এবারের পতনে যেন লোভের থাবা একটু বেশি জোরে পড়ল। তাতে প্রযুক্তির দায় কম। তবে সব ক্রিপ্টোকারেন্সির কিন্তু একই হাল নয়। আর নতুন বিনিয়োগ শুরু হয়েছে কিছু। দাম কমেছে ঠিকই, তবে জনসচেতনতা বেড়েছে। যাদের ক্ষতি হওয়ার তাদের তো হলোই, তবে ক্রিপ্টোকারেন্সি নিয়ে সাধারণ মানুষও জানাশোনা আর ভাবনার অবকাশ এখন পাচ্ছে। ইথারিয়াম তার সফটওয়্যারের আসন্ন পরিবর্তনের কথা জানাচ্ছে। গত ১৫ সেপ্টেম্বরে বাজারে আসা ‘মার্জ’ তাদের প্রায় আট বছরের গবেষণার ফল। এর ফলে বিদ্যুতের বিপুল সাশ্রয়ের কথা বলছে এই প্রতিষ্ঠান। এর সঙ্গে লেনদেনের খরচ কমার কথা বলছে। মোদ্দাকথা, বাজারে দরপতন হলেও ক্রিপ্টোকারেন্সির সঙ্গে যুক্ত সবাই ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যাশা করছে। প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, মূলধারার মুদ্রাব্যবস্থার সঙ্গে তাল মিলিয়ে ক্রিপ্টোকারেন্সি কি এগোতে থাকবে? বাজারব্যবস্থার দুর্নীতি রুখতে ব্লকচেইনকেন্দ্রিক ব্যবস্থাপনা কি মোক্ষম হাতিয়ার? আর সব কথার শেষ কথা, লোভের নেশায় বুঁদ হওয়া মানুষ কি কোনো প্রযুক্তি টেনে তুলতে পারে? ক্রিপ্টোকারেন্সির আন্দোলনে বিশ্বাসীরা চেষ্টা চালাচ্ছে, চালাবে বলেই মনে হয়। বাকিটা ভবিষ্যতের খাতায় লেখার জন্য পড়ে রইল।

লেখক: অধ্যাপক, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

*লেখাটি ২০২৩ সালে বিজ্ঞানচিন্তার মার্চ সংখ্যায় প্রকাশিত

আরও পড়ুন