কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সূচনা হলো যেভাবে

কেমন করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সূচনা হলো? কে প্রথম ভাবলেন, যন্ত্রও হতে পারে বুদ্ধিমান; শিখতে পারে, সিদ্ধান্ত নিতে পারে প্রয়োজন অনুযায়ী? এই গল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মানুষের জীবন বাঁচানোর তাড়না। আছে প্রথাগত শিক্ষা ছাড়াই এক তরুণের গবেষণা প্রবন্ধ লিখে ফেলা। অ্যালান ট্যুরিংকে হয়তো আপনি চেনেন, কিন্তু ওয়াল্টার হ্যারি পিটসকে কি চেনেন? প্রযুক্তি জগত, আজকের কম্পিউটার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার শুরুর সেই রোমাঞ্চকর গল্প…

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তিপ্রতীকী ছবি/এক্স

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কল্যাণে আমাদের মোবাইল ও কম্পিউটারগুলো আগের চেয়ে আজ আরও অনেক স্মার্ট। মানুষের মস্তিষ্কের মতোই এখন এই যন্ত্রগুলো কাজ করে। যন্ত্রে কেন মস্তিষ্কের মতো কাজ করার পদ্ধতি গ্রহণ করা হলো? এই প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য আমাদের একটু পেছাতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শুরুর এই গল্পের নায়ক দুজন—ওয়াল্টার হ্যারি পিটস এবং অ্যালান ট্যুরিং। আজ তাঁদের গল্পই বলব।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল পুরস্কার পাওয়ার আগের বছর, অর্থাৎ ১৯১২ সালের ঘটনা। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সিভিল সার্ভিসের এক কর্মকর্তা জুলিয়াস ট্যুরিংয়ের পরিবার ছাড়া বিদেশে কাজ করতে ভালো লাগছিল না। কিছুদিন আগে ইংল্যান্ডে ফিরে গেছে তাঁর সন্তানসম্ভবা স্ত্রী ইথেল সারা ট্যুরিং এবং বড় ছেলে। তাদের জন্য প্রায়ই মন খারাপ হচ্ছে। মন ভালো করার জন্য ছুটিতে ইংল্যান্ড ফিরে গেলেন জুলিয়াস। এর কিছুদিন পর, ২৩ জুন ইংল্যান্ডে এক ঝড়বৃষ্টির রাতে লন্ডনের কাছাকাছি এক শহরে জন্ম নিল তাঁর দ্বিতীয় ছেলে—অ্যালান ম্যাথিসন ট্যুরিং।

আমাদের আজকের গল্পের প্রথম নায়ক এই শিশু সন্তান—অ্যালান ট্যুরিং। জন্মের পর তাঁর বাবা কাজে ফিরে যাওয়ার জন্য নিজ পরিবারকে ভারতে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বাধ সাধলেন মা। সেই সময়ের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সমাজের কুসংস্কারের ভয়ে তিনি যেতে চাননি। তাদের দ্বন্দ এমন অবস্থায় পৌঁছাল যে বাবা ফিরে যান কর্মক্ষেত্র ভারতে, আর মা ছোট্ট অ্যালানকে নিয়ে বসবাস করতে শুরু করেন ইংল্যান্ডেই। বাবা-মার এই বিচ্ছেদ অ্যালানের শৈশবকে একাকিত্বে ফেলে দেয়।

১৯২৩ সনে যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের ডেট্রয়েট শহরটি তখন লোহালক্কর আর ইঞ্জিনের শব্দের শহরে পরিণত হয়েছে। আর হবে নাই-বা কেন? যুক্তরাষ্ট্রের শিল্পবিপ্লবের মূল ভুমিকার প্রতিষ্ঠান—ফোর্ড মোটরের অসংখ্য কারখানা এই শহরে।

ছোটবেলা থেকেই ট্যুরিং ছিলেন একাকী, কিছুটা ‘অদ্ভুত’ প্রকৃতির। তাঁর কথাবার্তা, আচরণ—সবই ছিল অন্য রকম। একবার মা তাঁকে একটি কাঠের পাজল উপহার দেন। অ্যালান মাত্র ছয় বছর বয়সেই সেটি খুলে ফেলে এবং আবার জোড়া লাগাতে সক্ষম হয়। অন্যরা যখন খেলাধুলায় ব্যস্ত, ট্যুরিং তখন ডুবে থাকতেন গণিত আর বিজ্ঞান বইয়ে। ১৩ বছর বয়সে স্কুলে পড়তে গিয়েই তিনি আইনস্টাইনের ‘থিওরি অব রিলেটিভিটি’ বুঝে ফেলেন—শুধু পড়েই থামেননি, নিজের যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যাও করেন! অভিজাত ও শিক্ষিত পরিবারে জন্ম নেওয়া এই শিশু বড় হয়ে এমন এক প্রশ্ন করবে, যা গোটা মানবজাতির ভবিষ্যৎ বদলে দেবে: ক্যান মেশিনস থিংক? মেশিন কি চিন্তা করতে পারে?

ট্যুরিংয়ের গল্পে একটু পরে আবার ফিরব, যখন সে বড় হবে। এখন আপনাদের ইংল্যান্ড থেকে নিয়ে যাচ্ছি মার্কিন মুলুকে।

আরও পড়ুন

২.

১৯২৩ সনে যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের ডেট্রয়েট শহরটি তখন লোহালক্কর আর ইঞ্জিনের শব্দের শহরে পরিণত হয়েছে। আর হবে নাই-বা কেন? যুক্তরাষ্ট্রের শিল্পবিপ্লবের মূল ভুমিকার প্রতিষ্ঠান—ফোর্ড মোটরের অসংখ্য কারখানা এই শহরে। দিন-রাত কাজ হচ্ছে, তৈরি হচ্ছে অসংখ্য গাড়ি। এই শহরেরই এক সাধারণ শ্রমিক পরিবারের ঘরে জন্ম নিল একটি শিশু—ওয়াল্টার হ্যারি পিটস। জন্মের দিনটি ছিল শীতল ও কুয়াশাচ্ছন্ন, কিন্তু চারিদিকে ছিল কারখানার প্রচণ্ড শব্দ। সেই শব্দ শুনে ভয়ে কান্না করে ওঠে আমাদের গল্পের দ্বিতীয় নায়ক পিটস।

তার বাবা ছিলেন এক সাধারণ কারখানার শ্রমিক—কঠোর, কঠিন এবং আবেগহীন। নুন আনতে পান্তা ফুরোয় অবস্থা পরিবারের। কোনোভাবে মাসিক খরচের সমান অর্থ উপার্জন করে টেনেটুনে চলছে সংসার। মায়ের উপস্থিতি ছিল নিরব, ছায়ার মতো—যেন জীবনটা টেনে নিয়ে যাচ্ছেন কোনোরকমে।

এ সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের পরিস্থিতি ভালো ছিল না। একদিকে জ্যাজ যুগের স্বাধীনতার কথা বলা হচ্ছিল, অপরদিকে রক্ষণশীলেরা পুরাতন মূল্যবোধ আঁকড়ে ধরে রাখতে ছিল দৃঢ়প্রত্যয়ী। পথেঘাটে মিছিল বের হচ্ছিল—বিদেশি অভিবাসীদের বের করে দিতে হবে, কেননা তারা মার্কিনিদের চাকরি খেয়ে নিচ্ছে। তবে আমাদের গল্পের এই শিশু পিটস ছিল আলাদা। সে সমাজের এসব নিয়ম-কানুন মানত না, সবার থেকে দূরে দূরে থাকত।

শিকাগো শহরে পৌঁছে গণিত ও যুক্তিতর্কের ওপর জ্ঞান আহরণের নেশায় ঘুরে বেড়াতে লাগল ছেলেটি বিভিন্ন জায়গায়। ঘুরতে ঘুরতে মাঝে মধ্যেই সে ঢুকে পড়ত শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের ক্লাসগুলোতে। অদ্ভুত সব প্রশ্ন করত, যা পিএইচডি শিক্ষার্থীরাও করতে পারত না।

ছোটবেলা থেকেই সে কথা কম বলে, কিন্তু বইয়ের পাতার ভেতরে হারিয়ে যায়, ডুবে থাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। অন্য ছেলেরা যখন খেলাধুলা বা কাজ করত, পিটস ঢুকে যেত লাইব্রেরিতে—বই পড়ত, যুক্তির খেলা খেলত নিজের সঙ্গে। মাত্র ১২ বছর বয়সে সে নিজে নিজেই লাতিন, গ্রিক ও গাণিতিক যুক্তি শিখে ফেলে। বাবা দেখলেন, তাঁর ছেলেটি আর দশটা সাধারণ ছেলে হিসাবে বড় হচ্ছে না। তাই ভীষণ রাগ করতেন তার ওপর।

অন্ধকার ঘরে বইয়ের নিচে মুখ গুঁজে বসে থাকত পিটস। বাইরের দুনিয়া জানত না, এই চুপচাপ ছেলেটি প্রিন্সিপিয়া ম্যাথমেটিকা পড়ছে—বার্ট্রান্ড রাসেল আর আলফ্রেড নর্থ হোয়াইটহেডের সেই বিখ্যাত কাজ, যা বুঝতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের বছর পেরিয়ে যায়। সেই পুঁচকে ছেলে পিটস ওই বইতে ভুল খুঁজে পেল—তাও মাত্র ১৫ বছর বয়সে! সে রাসেলকে চিঠি লিখে তার নিজের যুক্তিগুলো ব্যাখ্যা করল। মজার ব্যাপার হলো, রাসেল তার সেই চিঠির উত্তর দিয়েছিলেন, ধন্যবাদ জানিয়েছিলেন ভুলটি দেখিয়ে দেওয়ার জন্য। এই একটি ঘটনা পিটসের ভেতরে আত্মবিশ্বাস তৈরি করে দেয়।

এদিকে বাবা চেয়েছিলেন পিটস পড়াশোনা বাদ দিয়ে কারখানায় কাজ করুক, গাড়ির যন্ত্রাংশ তৈরি করে অর্থ উপার্জন করে সংসারটা সামলাক। বাবার এই আদেশ মানতে পারেনি পিটস। স্কুলের পড়াশুনা ইতি টেনে—রাতের অন্ধকারে বাসা ছেড়ে পালিয়ে গেল সে। গন্তব্য শিকাগো শহরের দিকে। তার বন্ধুরা বলেছিল, সেই শহরে ভালো বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে এবং সেখানে জ্ঞানচর্চা হয়। 

আরও পড়ুন

শিকাগো শহরে পৌঁছে গণিত ও যুক্তিতর্কের ওপর জ্ঞান আহরণের নেশায় ঘুরে বেড়াতে লাগল ছেলেটি বিভিন্ন জায়গায়। ঘুরতে ঘুরতে মাঝে মধ্যেই সে ঢুকে পড়ত শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের ক্লাসগুলোতে। অদ্ভুত সব প্রশ্ন করত, যা পিএইচডি শিক্ষার্থীরাও করতে পারত না। সেখানেই তার পরিচয় হয় রুডলফ কার্ন্যাপ নামে এক বিখ্যাত যুক্তিবিদ ও দার্শনিকের সঙ্গে। কার্ন্যাপ অবাক হয়ে গিয়েছিলেন—এক কিশোর, যার ঠিকমতো কোনো সার্টিফিকেট নেই; কিন্ত তার সঙ্গে মডার্ন লজিক, গণিত এবং দার্শনিক যুক্তি নিয়ে আলোচনা করছে সমানতালে। পিটস কার্ন্যাপের প্রিয় ছাত্রে পরিণত হলো ছেলেটি, যদিও  পিটস কখনোই আনুষ্ঠানিকভাবে ছাত্র ছিল না।

ওয়াল্টার হ্যারি পিটস, ১৯৫৪
ছবি: উইকিপিডিয়া

১৯৪২ সালের কথা। পিটসের বয়স তখন মাত্র ১৯ বছর। একদিন তাঁর বন্ধু এক রেস্তোরাঁয় পিটসকে পরিচয় করে দেন  নিউরোফিজিওলজিস্ট ওয়ারেন ম্যাককালকের সঙ্গে। ম্যাককালক তখন মানব মস্তিষ্ক কীভাবে কাজ করে, তা জানার চেষ্টা করছিলেন। তিনি পিটসের গণিত, যুক্তিবিদ্যা, ল্যাতিন ও গ্রিক ভাষার দক্ষতা এবং প্রতিভায় অভিভূত হলেন। পিটস তাঁকে বুঝিয়ে বললেন, মস্তিষ্ক কীভাবে কাজ করে, তা গণিতের মডেল দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব।

ম্যাককালক আগ্রহী হলেন, পিটসকে শেখাতে শুরু করলেন নিউরোফিজিওলজি এবং মস্তিষ্কের ব্যাপারগুলো। অপরদিকে সেটিকে কীভাবে গাণিতিক মডেলে পরিণত করা যায়, তা নিয়ে কাজে ডুবে গেলেন পিটস। কিছুদিন পরপর তাঁদের আলোচনা চলতে লাগল, কখনো ল্যাবে, কখনো আবার ক্যাম্পাসের করিডোরগুলোতে।

একসময় তাঁরা বুঝতে পারলেন, চমৎকার একটি ধারণা মোটামুটি দাঁড় করিয়েছেন। দুজন দুই মেরুর হলেও গবেষণার ব্যাপারে তাঁরা ছিলেন পরস্পরের পরিপূরক। পরের বছর, ১৯৪৩ সনে তাঁরা লিখে ফেলেন একটি বিখ্যাত গবেষণাপত্র—আ লজিক্যাল ক্যালকুলাস অব দ্য আইডিয়াস ইমিনেন্ট ইন নার্ভাস অ্যাকটিভিটি (A Logical Calculus of the Ideas Immanent in Nervous Activity)।

পিটসের এ গবেষণা প্রবন্ধকে বলা হয় নিউরাল নেটওয়ার্ক বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্মসূত্র। কারণ, এই প্রথমবারের মতো বিজ্ঞানীরা দেখালেন, মানব মস্তিষ্কে থাকা নিউরনদের কাজকে আমরা গাণিতিকভাবে মডেল করতে পারি।

এখানে নিউরনের কথা খানিকটা জানতে হবে। নিউরন হলো মস্তিষ্কের ছোট ছোট কোষ—ক্ষুদ্র একক। এগুলো পরস্পরের সঙ্গে বিদ্যুৎ-সিগনালের মাধ্যমে যোগাযোগ করে এবং সিদ্ধান্ত নেয়। এই গবেষণায় তাঁরা দেখান, কীভাবে নিউরনের কার্যপ্রণালি বুলিয়ান লজিক দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় এবং কীভাবে নিউরনদের দিয়ে লজিক্যাল গেট তৈরি করা সম্ভব। এই লজিকের একদম মৌলিক রূপ বুলিয়ান লজিক (Boolean Logic)। এটি একধরনের গাণিতিক পদ্ধতি, যা যুক্তি (logic) এবং সত্য মান (true/false) নিয়ে কাজ করে। এটি কম্পিউটারবিজ্ঞান, ডিজিটাল ইলেকট্রনিকস এবং প্রোগ্রামিংয়ের ভিত্তি।

ব্রিটিশ গণিতবিদ জর্জ বুল ১৮ শতকে এটি উদ্ভাবন করেন। তাই তাঁর নামানুসারে এর নাম রাখা হয় ‘বুলিয়ান লজিক’। এই লজিক অনুসরণ করেই পিটস ও ম্যাককালক দাঁড় করালেন নিজেদের গবেষণা। তাঁদের এই গবেষণার মাধ্যমেই জন্ম নেয় ‘ম্যাককালক-পিটস নিউরন মডেল’—আজকের নিউরাল নেটওয়ার্ক বা এআইয়ের মূল ভিত্তি এটি। এটি ছিল নিউরাল নেটওয়ার্কের প্রথম মডেল। পরে এর ওপর ভিত্তি করেই ফ্রাঙ্ক রোজেনব্লাট তাঁর পারসেপট্রন (Perceptron) তৈরি করেন, যাকে ডিপ নিউরাল নেটওয়ার্কের সাধারণ মডেল বলা যায়।

এভাবে পিটস ও ম্যাককালক দেখিয়ে দিলেন, নিউরন দিয়ে লজিক গেট বানানো যায়। আর লজিক গেট দিয়েই তো কম্পিউটার বানানো হয়! তার অর্থ দাঁড়ায়, যদি নিউরন = লজিক গেট হয়, তাহলে মানব মস্তিষ্ক ≈ একটি প্রাকৃতিক কম্পিউটার।

এটাই ছিল সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে একেবারে মৌলিক বা বিপ্লবী এক ভাবনা—মস্তিষ্ককে গাণিতিকভাবে বোঝা এবং পরে তার অনুকরণে চিন্তাশীল যন্ত্র তৈরি করা। পিটসের এ গবেষণা প্রবন্ধকে বলা হয় নিউরাল নেটওয়ার্ক বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্মসূত্র। কারণ, এই প্রথমবারের মতো বিজ্ঞানীরা দেখালেন, মানব মস্তিষ্কে থাকা নিউরনদের কাজকে আমরা গাণিতিকভাবে মডেল করতে পারি। যেহেতু নিউরন সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে আমরা কম্পিউটার বা যন্ত্রকেও সিদ্ধান্ত নিতে শেখাতে পারি। এই দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই পরে কম্পিউটারকে মানব মস্তিষ্কের মতো করে তৈরির চেষ্টা করেন বিজ্ঞানীরা।

আরও পড়ুন

৩.

এবার আপনাদের ফিরিয়ে নিয়ে যাই ইংল্যান্ডে, ট্যুরিংয়ের সেই গল্পে। ট্যুরিং বড় হয়ে ইংল্যান্ডের কেমব্রিজ এবং পরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করেন। গণিতের প্রতি তাঁর ছিল অসীম ভালোবাসা। সেখানে তিনি গণিতের জটিল সমস্যাগুলো সমাধানের মাধ্যমে নিজেকে প্রমাণ করেন। তবে তিনি শুধু সমাধান খুঁজতেন না—তিনি ভাবতেন, সমাধান কে করবে? মানুষ, না মেশিন? (পাঠকেরা নিশ্চয়ই এতক্ষণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে ট্যুরিংয়ের কাজের মিল পাচ্ছেন।)

১৯৩৬ সালে মাত্র ২৪ বছর বয়সে ট্যুরিং এক গবেষণা প্রবন্ধ লেখেন। সেখানে তিনি কল্পনা করেন একটি কল্পিত যন্ত্র—‘ট্যুরিং মেশিন’; সঠিক নির্দেশনা দেওয়া হলে যা যেকোনো গণনাযোগ্য সমস্যা সমাধান করতে পারবে। এটিই কম্পিউটেশন থিওরির ভিত্তি তৈরি গড়ে দেয়, যা আধুনিক কম্পিউটারের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি।

এনিগমা যন্ত্র
ছবি: উইকিপিডিয়া

৪.

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান সেনাবাহিনী একটি অত্যাধুনিক যন্ত্রের সাহায্যে তাদের গোপন বার্তা লিখত এবং পড়ত—এর নাম ছিল এনিগমা (Enigma)। এটি একধরনের রোটর মেশিন, অক্ষরগুলোকে জটিলভাবে বদলে দিত। এর মূল কার্যপ্রণালী ছিল: প্রথমে এনিগমায় ৩-৪টি ঘূর্ণমান রোটর থাকত, যা প্রতিটি অক্ষর টাইপ করার সঙ্গে সঙ্গে অবস্থান বদলে ফেলত। এরপরে প্লাগবোর্ডের ১০টি তার দিয়ে অক্ষরগুলোকে আরও একবার বদলে দেওয়া হতো। ফলে একটি সাধারণ বাক্য ‘HELLO’ এনিগমায় টাইপ করলে হয়ে যেত ‘KJXUZ’ জাতীয় অর্থহীন শব্দ। জার্মানরা মনে করত, এই কোড কখনোই ভাঙা সম্ভব নয়।

১৯৩৯ সালে ব্রিটিশ সরকার ‘ব্লেচলি পার্ক’ নামে এক গোপন জায়গায় নিজেদের সেরা মেধাবীদের একত্রিত করে। সেখানে ট্যুরিং ছিলেন প্রধান। তাঁর দল এনিগমা কোড ভাঙার জন্য বিশেষ এক যন্ত্র তৈরি করে—এর নাম দেওয়া হয় ‘দ্য বম্ব’। এই নামকরণ করা হয় পোলিশ বিজ্ঞানীদের আগের প্রচেষ্টা ‘বম্বা’ থেকে। যন্ত্রটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে এনিগমা কোড ভাঙতে সক্ষম হয়।

১৬ বছর বয়সে অ্যালান ম্যাথিসন টুরিং
ছবি: উইকিপিডিয়া

ট্যুরিং বুঝলেন, এনিগমার কিছু দুর্বলতা আছে। যেমন কোনো অক্ষর কখনোই নিজেই নিজের কোডে পরিণত হতো না (অর্থাৎ ‘H’ কখনো ‘H’ হবে না)। বম্বে একসঙ্গে ৩৬টি এনিগমা-সিমুলেটেড রোটর ব্যবহার করে প্রতিদিনের কোডের সেটিংস (রোটরের অবস্থান, প্লাগবোর্ডের কানেকশন) বের করত। ট্যুরিং একটি বিশেষ পদ্ধতি তৈরি করেন, যাকে ‘বানবেরি’ বলা হতো। এতে একটি অনুমানকৃত বাক্যাংশ (যেমন ‘হিটলারের জয় হোক’) কোডে ঢুকিয়ে দেখা হতো যে কোন সেটিংসে সেটি মিলে যায়।

দ্য বম্বের সাহায্যে মিত্রশক্তি ১৯৪২ সাল থেকে জার্মান নৌবাহিনীর গোপন বার্তা পড়তে শুরু করে। এর ফলে আটলান্টিকের যুদ্ধে জার্মান সাবমেরিনগুলোকে পরাস্ত করা সম্ভব হয়। মিত্রশক্তির জন্য সহজ হয়ে ওঠে নর্ম্যান্ডি অভিযানও। কারণ মিত্রশক্তি জার্মানদের প্রতিক্রিয়া অনুমান করতে পারত। ইতিহাসবিদদের মতে, বম্বের অবদানে যুদ্ধ অন্তত ২ বছর আগে শেষ হয়েছিল এবং ১৪ মিলিয়ন বা ১ কোটি ৪০ লাখ মানুষের প্রাণ বাঁচে।

আরও পড়ুন
উত্তর আসে লেখার মাধ্যমে। বিচারক যদি পার্থক্য করতে না পারেন—মানে, বুঝতে না পারেন কে মানুষ আর কে মেশিন—তাহলে সেই এআই ট্যুরিং টেস্টে পাস করেছে। এই পরীক্ষা ছিল প্রথম মাপকাঠি, যা দেখাতে চেয়েছিল—একটি যন্ত্র কি মানুষের মতো আচরণ করতে পারে?

দ্য বম্বের সাফল্য সত্ত্বেও ট্যুরিংকে গোপনীয়তার শপথ নিতে হয়েছিল। যুদ্ধের পর তাঁর অবদান বছরের পর বছর গোপন ছিল। এ জন্য তিনি সে সময় কোনো স্বীকৃতি পাননি। আজ দ্য বম্বে এবং এনিগমার ইতিহাস ট্যুরিংয়ের প্রতিভার পরিচয় দেয়। তাঁর তৈরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ধারণা ‘ট্যুরিং টেস্ট’ আধুনিক এআইয়ের ভিত্তি।  কী এই ট্যুরিং টেস্ট?

১৯৫০ সালে ট্যুরিং তাঁর ঐতিহাসিক প্রবন্ধে একটি পরীক্ষা প্রস্তাব করেন, যেটা পরবর্তীতে ‘ট্যুরিং টেস্ট’ নামে পরিচিত হয়। এই পরীক্ষার মূল ধারণা খুব সহজ: একজন মানুষ যদি বুঝতে না পারেন যে তিনি একটি যন্ত্রের সঙ্গে কথা বলছেন, তাহলে সেই যন্ত্রকে ‘চিন্তাশীল’ ধরা হবে।

দ্য বম্ব যন্ত্রের একটি নমুনা
ছবি: উইকিপিডিয়া

কীভাবে কাজ করে এই ট্যুরিং টেস্ট? এটা বুঝতে চলুন একটি কল্পনা করি: একটি ঘরের ভেতরে একজন বিচারক বসে আছেন। তিনি তাঁর সামনে একটি কম্পিউটার টার্মিনালে দুজনের সঙ্গে আলাপ করছেন—একজন মানুষ, অন্যজন একটি এআই প্রোগ্রাম। তবে বিচারক জানেন না কে মানুষ, কে মেশিন। বিচারক তাঁদের দুজনকে বিভিন্ন প্রশ্ন করেন। যেমন—

‘তুমি কেমন আছো?’

‘তোমার প্রিয় বই কোনটি?’

‘বৃষ্টি হলে তুমি কী করো?’

উত্তর আসে লেখার মাধ্যমে। বিচারক যদি পার্থক্য করতে না পারেন—মানে, বুঝতে না পারেন কে মানুষ আর কে মেশিন—তাহলে সেই এআই ট্যুরিং টেস্টে পাস করেছে। এই পরীক্ষা ছিল প্রথম মাপকাঠি, যা দেখাতে চেয়েছিল—একটি যন্ত্র কি মানুষের মতো আচরণ করতে পারে? শুধু গাণিতিক গণনা নয়, বরং ভাষা, অনুভব, চিন্তা—এসব বোঝার ক্ষমতা কি মেশিন অর্জন করতে পারে? ট্যুরিং বলেছিলেন, ‘মেশিন চিন্তা করতে পারে কি না—তা নিয়ে তর্ক করার চেয়ে ভালো হবে একটি পরীক্ষা নেওয়া।’ এটাই বিজ্ঞানীসুলভ বাস্তবতা—যুক্তির মাধ্যমে পরীক্ষা।

ব্লেচলি পার্কে এখন ট্যুরিংয়ের স্মৃতিসৌধ রয়েছে, যেখানে লেখা আছে: ‘তিনি যন্ত্রকে বুদ্ধিমান করেছিলেন, কিন্তু মানুষ তাঁকে বোঝেনি।’ অ্যালান ট্যুরিংয়ের অবদান নিউরাল নেটওয়ার্ক ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য ছিল প্রাথমিক ধারণার তাত্ত্বিক কাঠামো। ‘মেশিন কি চিন্তা করতে পারে’—এই প্রশ্ন করে তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দর্শন ও লক্ষ্য নির্ধারণ করেন। তাঁর প্রস্তাবিত ট্যুরিং টেস্ট আজও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মানবসদৃশ আচরণ যাচাই করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি। তিনি অনুমান করেছিলেন, মানব মস্তিষ্কের কাজ ও চিন্তা প্রক্রিয়া গাণিতিকভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব, যা পরবর্তীতে নিউরাল নেটওয়ার্ক গবেষণায় অনুপ্রেরণা জোগায়। সোজা কথায়, ট্যুরিং এমন এক চিন্তাধারার জন্ম দেন, যেখানে মেশিনও শেখে, বোঝে এবং চিন্তা করে—আর সেটাই নিউরাল নেটওয়ার্ক ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মূল ভিত্তি।

এভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মূল ভিত্তি গড়ে ওঠে ওয়াল্টার হ্যারি পিটস এবং অ্যালান ট্যুরিংয়ের হাতে।

লেখক: ইঞ্জিনিয়ারিং ম্যানেজার, ওমরণ হেলথকেয়ার, সিঙ্গাপুর (স্বাস্থ্যসেবায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ নিয়ে কাজ করেন)

সূত্র:

১. Embodiments of Mind by Warren S. McCulloch

২. Neural Networks: A Comprehensive Foundation, Simon S. Haykin provides

৩. The Deep Learning Revolution, Terrence J. Sejnowski

আরও পড়ুন