মহাবিশ্বের গোপন রহস্য

অধরা ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জি বিজ্ঞানীদের জন্য আজও রহস্য। মহাবিশ্বের গোপন এই রহস্য সমাধানের লক্ষ্যে প্রায় এক শতাব্দী ধরেই ছুটছেন বিজ্ঞানীরা। কিন্তু সমাধান কি মিলল?

বিংশ শতাব্দীর শেষে অনেকেই ভেবেছিলেন, একবিংশ শতাব্দীতে এসে বিজ্ঞানীদের হাতে আবিষ্কারের জন্য সে রকম জটিল কোনো সমস্যা থাকবে না। এ রকম ধারণা ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষেও হয়েছিল অনেকের। কোয়ান্টাম মেকানিকসের স্থপতি পদার্থবিজ্ঞানী ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক যখন ছাত্রজীবনে পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করতে আগ্রহী হচ্ছিলেন, তখন মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ফিলিপ জোলি প্ল্যাঙ্ককে বলেছিলেন, ‘ফিজিকস পড়ে কী করবে? ফিজিকসের সবকিছুই তো আবিষ্কৃত হয়ে গেছে।’

অথচ আমরা দেখলাম, বিংশ শতাব্দীর পুরোটাই ছিল পদার্থবিজ্ঞানের নতুন নতুন দিক আবিষ্কারের শতক। বিংশ শতাব্দীতেই আবিষ্কৃত হয়েছে কোয়ান্টাম মেকানিকস; আইনস্টাইনের বিশেষ ও সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব বদলে দিয়েছে আমাদের মহাবিশ্বের সব হিসাব–নিকাশ। মানুষ যে শুধু আকাশভ্রমণ শুরু করেছে, তা নয়, মানুষের তৈরি স্যাটেলাইট পৌঁছে গেছে আমাদের দৃশ্যমান আকাশ ছাড়িয়ে আকাশান্তরে, চাঁদের বুকে হেঁটে এসেছে মানুষ। মহাকাশে ঘুরে ঘুরে অত্যাধুনিক দুরবিন খুঁজে নিয়ে এসেছে মহাবিশ্বের কোটি আলোকবর্ষ দূরের নক্ষত্রের আলো। আমরা জেনে গেছি, মহাবিশ্বের উৎপত্তির গোড়ার কথা। বিজ্ঞানীরা হিসাব করে বের করে ফেলেছেন মহাবিশ্বের বয়স প্রায় ১ হাজার ৩৮০ কোটি বছর। কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড শনাক্ত করার মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা পেয়ে গেছেন মহাজাগতিক প্রথম আলোর সন্ধান, যেখান থেকে শুরু হয়েছিল মহাবিশ্বের বেড়ে ওঠার পালা। বিংশ শতাব্দীর শেষে তাই অনেকেই ভেবেছিলেন, পদার্থবিজ্ঞানের কোনো সমস্যা অমীমাংসিত থাকবে না। একবিংশ শতাব্দী হবে মূলত জীববিজ্ঞানের শতাব্দী। যেখানে জানা যাবে, মহাবিশ্বে প্রাণের উদ্ভবের মূল কারণ এবং মানুষের জীববৈজ্ঞানিক ভবিষ্যৎ কী।

কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে এসে কম্পিউটার ও তথ্যপ্রযুক্তির আকাশচুম্বী সাফল্য ও বিস্তারের পরও বিজ্ঞানীদের হাতে এমন অনেক সমস্যা রয়ে গেছে, যেগুলো সমাধানের ব্যাপারে কোনো কূলকিনারা পাচ্ছেন না তাঁরা। বিজ্ঞানে এ রকম ব্যাপারগুলো অনেকটা রহস্যকাহিনির ঘটনার মতো। যখনই মনে হয় যে রহস্যের সমাধান হয়ে গেছে, তখনই দেখা যায় রহস্য নতুন দিকে মোড় নিচ্ছে। মহাবিশ্ব আমাদের এ রকমই রহস্যের আবরণে জড়িয়ে দিচ্ছে বারবার।

যে মহাবিশ্বে আমরা বাস করি, কী আশ্চর্য সুন্দর তার অবয়ব—যেটুকু আমরা দেখতে পাই। কিন্তু মহাবিশ্বের ঠিক কতটুকু আমরা দেখতে পাই? প্রাগৈতিহাসিক যুগে যখন চোখ ছাড়া অন্য কোনো ব্যবস্থা ছিল না মানুষের দেখার, সেই সময় খালি চোখে আকাশ দেখেই মানুষ ভেবে নিয়েছিল, আকাশই মহাবিশ্বের শেষ সীমানা। তখন মনে হতো, মহাবিশ্বের পুরোটাই আমরা দেখতে পাই আকাশের দিকে তাকিয়ে। যেন প্রকৃতি আকাশের বুকে সূর্য–তারাখচিত চাদরের মতো বিছিয়ে দিয়েছে পুরো মহাবিশ্বকে। তখন মনে হতো, আমরা মহাবিশ্বের পুরোটাই দেখতে পাই।

এর কয়েক হাজার বছর পর মানুষ যখন মহাকাশ জয় করে ফেলল, গ্রহ-নক্ষত্র ছাড়িয়ে মানুষের তৈরি নভোযান পাড়ি দিল আমাদের সৌরজগৎ থেকে অন্য নক্ষত্রপুঞ্জে, এক গ্যালাক্সি থেকে অন্য গ্যালাক্সির দিকে; আমরা জানতে পারলাম, কী প্রচণ্ড গতিশীল আমাদের গ্রহ, নক্ষত্র, গ্যালাক্সিসহ পুরো মহাবিশ্ব। মহাবিশ্বের যত বেশি তথ্য–উপাত্ত বিজ্ঞানীদের হাতে আসতে শুরু করল, মহাবিশ্বের রহস্য তত বেশি উদ্‌ঘাটিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দেখা গেল, মহাবিশ্ব নতুন নতুন রহস্যের চাদরে নিজেকে ঢাকতে শুরু করেছে। এই একবিংশ শতাব্দীর সিকি ভাগ পার করার মুহূর্তে আমরা এই মহাবিশ্বের প্রায় ৯৫ ভাগ বস্তু ও শক্তি সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছুই জানি না।

বিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, এই মহাবিশ্বের প্রায় ৯৫ ভাগই অদৃশ্য। এত বড় মহাবিশ্বের দৃশ্যমান কোটি কোটি গ্রহ, নক্ষত্র, গ্যালাক্সি—সবকিছু একসঙ্গে যোগ করলে মহাবিশ্বের মাত্র ৫ ভাগের মতো (৪.৯ ভাগ) হয়, বাকি প্রায় ৯৫ ভাগ যে কীভাবে লুকিয়ে আছে, তা এক অধরা রহস্য। এই প্রায় ৯৫ ভাগকে দেখার কোনো উপায় নেই।

কোনো কিছু দেখতে হলে আলো কিংবা তড়িৎ–চুম্বক তরঙ্গের সঙ্গে সেই বস্তুর মিথস্ক্রিয়া ঘটতে হয়। মহাবিশ্বের ৯৫ ভাগ বস্তু ও শক্তির সঙ্গে আলো কিংবা তড়িৎ–চুম্বক তরঙ্গের কোনো মিথস্ক্রিয়া ঘটে না। ফলে তাদের দেখার কোনো উপায় বিজ্ঞানীরা এখনো বের করতে পারেননি। এই অদৃশ্য অংশের নাম ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জি। মহাবিশ্বের এই অদৃশ্য অংশের প্রায় ২৬ ভাগ ডার্ক ম্যাটার বা গুপ্ত বস্তু ও প্রায় ৬৯ ভাগ ডার্ক এনার্জি বা গুপ্ত শক্তি। ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জি—দুটি সম্পূর্ণ আলাদা জিনিস। এগুলোর কাজ আলাদা, ইতিহাস আলাদা। শুধু নামের মিল ছাড়া এদের মধ্যে আর কোনো পারস্পরিক সম্পর্ক নেই।

অবশ্য ডার্ক নামটি জুতসই হয়নি। আলোর সঙ্গে কোনো মিথস্ক্রিয়া করে না বলে এগুলোর নাম হওয়া উচিত ছিল ট্রান্সপারেন্ট বা স্বচ্ছ। অদৃশ্য বস্তু বোঝাতে ডার্ক ম্যাটার নামটি দিয়েছিলেন সুইডিশ জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফ্রিৎজ জুইকি, ১৯৩৩ সালে। তাঁর অনুকরণে অদৃশ্য শক্তি বোঝানোর জন্য ডার্ক এনার্জি নাম দিয়েছেন মার্কিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী মাইকেল টারনার, ১৯৯৮ সালে। এ হিসাবে ডার্ক এনার্জি তুলনামূলকভাবে খুবই সাম্প্রতিক বিষয়।

প্রথমে দেখা যাক, ডার্ক ম্যাটারের ব্যাপারস্যাপার কী।

বিজ্ঞানীরা মহাবিশ্বের আকার ও আকৃতি মাপার চেষ্টা করে যাচ্ছেন কয়েক শতাব্দী থেকে। সপ্তদশ শতকে আইজ্যাক নিউটনের মহাকর্ষ সূত্র আবিষ্কারের পর গ্রহ, উপগ্রহ, নক্ষত্রসহ মহাবিশ্বের সবকিছুর ভর ও গতিপ্রকৃতি নির্ণয়ের উপায় মানুষের হাতে চলে এল। মহাবিশ্বের সব বস্তু একে অপরের প্রতি আকৃষ্ট হয় মহাকর্ষ বলের কারণে। নিউটনের গতির সূত্র থেকে ত্বরণ ও বল জানা থাকলে আমরা বস্তুর ভর মাপতে পারি। মহাকর্ষ বলের টানে গ্রহ-নক্ষত্রগুলোর গতির পরিবর্তন হিসাব করে গ্রহ-নক্ষত্রের ভর হিসাব করতে সক্ষম হলেন বিজ্ঞানীরা। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে নিউটনের মহাকর্ষ সূত্রের হিসাবে বাগড়া দিতে আবিষ্কৃত হলো আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্ব। নিউটনের মহাকর্ষ সূত্র অনুসারে, মহাবিশ্বের বস্তুগুলো যদি পরস্পরের আকর্ষণে একে অপরকে কাছে টানতে থাকে, তাহলে মহাবিশ্ব ক্রমে সংকুচিত হয়ে যাওয়ার কথা, কিন্তু তা তো হচ্ছে না।

১৯১৫ সালে আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার সার্বিক তত্ত্ব প্রকাশিত হলে এই সমস্যার একরকম সমাধান হয়ে যায়। আইনস্টাইনের জেনারেল থিওরি অব রিলেটিভিটি বা আপেক্ষিকতার সার্বিক তত্ত্ব মহাকর্ষ বলের সংজ্ঞাই বদলে দেয়। নিউটনের মহাকর্ষ বল শুধু বস্তুর গতির পরিবর্তন ঘটায়, কিন্তু আইনস্টাইনের মহাকর্ষ বল বস্তুর গতির সঙ্গে স্থান-কালও (স্পেস-টাইম) বদলে দেয়। আপেক্ষিকতার সার্বিক তত্ত্বের জটিল গাণিতিক সমীকরণ সমাধান করে দেখা গেল, মহাবিশ্ব ক্রমে প্রসারিত হচ্ছে। আইনস্টাইন ভাবলেন, এটা অস্বাভাবিক। তিনি মহাবিশ্বের আয়তন স্থির রাখার জন্য ১৯১৭ সালে তাঁর আপেক্ষিকতার সার্বিক তত্ত্বের সমীকরণে একটি ধ্রুবক (কসমোলজিক্যাল কনস্ট্যান্ট) বসিয়ে দিলেন। ফলে গাণিতিক হিসাবে মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ বন্ধ করা গেল।

দূরের গ্যালাক্সিগুলো অত্যন্ত দ্রুতগতিতে দূরে চলে যাচ্ছে। তার মানে, মহাবিশ্ব ক্রমে সম্প্রসারিত হচ্ছে। আইনস্টাইন এই ফলাফল দেখে বুঝতে পারলেন, তিনি শুরুতেই ঠিক ছিলেন।

বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। এক যুগ পরই দেখা গেল, আইনস্টাইনের প্রাথমিক হিসাবই ঠিক ছিল। ১৯২৯ সালে মার্কিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী এডুইন হাবল আবিষ্কার করলেন, মহাবিশ্ব ক্রমে সম্প্রসারিত হচ্ছে। হাবল মহাবিশ্বের গ্যালাক্সি পর্যবেক্ষণ করছিলেন। কোটি কোটি নক্ষত্রপুঞ্জের সমষ্টি একেকটি গ্যালাক্সি থেকে যখন আলো এসে পৌঁছায় টেলিস্কোপে, সেই আলোর বর্ণালি বিশ্লেষণ করে জানা যায়, গ্যালাক্সিটি পৃথিবী থেকে কত দূরে, কত বেগে ঘুরছে। আলো তড়িৎ–চুম্বক তরঙ্গ। দৃশ্যমান আলোর লাল বর্ণের তরঙ্গদৈর্ঘ্য সবচেয়ে বেশি, বেগুনি আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য সবচেয়ে কম। আলোর উৎস টেলিস্কোপ থেকে যত দূরে চলে যেতে থাকে, আলোর তরঙ্গ ততই সম্প্রসারিত হতে থাকে। ফলে তরঙ্গদৈর্ঘ্য বাড়তে থাকে। তরঙ্গদৈর্ঘ্য বাড়তে থাকা মানে তা ক্রমে লাল বর্ণের দিকে সরে যাওয়া। তাই পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় এটাকে বলে রেড শিফট বা লোহিত সরণ। আবার আলোর উৎস যদি কাছে আসতে থাকে, তাহলে আলোর তরঙ্গ সংকুচিত হয়ে তরঙ্গদৈর্ঘ্য কমে যায়; অর্থাৎ তখন আলো ক্রমে নীল কিংবা বেগুনির দিকে সরতে থাকে। তাকে বলা হয় ব্লু শিফট বা নীল সরণ। রেড শিফট দেখে বোঝা যায়, আলো দূরে চলে যাচ্ছে; ব্লু শিফট দেখে বোঝা যায়, আলো কাছে আসছে।

এডুইন হাবল দেখলেন, দূরের গ্যালাক্সিগুলো অত্যন্ত দ্রুতগতিতে দূরে চলে যাচ্ছে। তার মানে, মহাবিশ্ব ক্রমে সম্প্রসারিত হচ্ছে। আইনস্টাইন এই ফলাফল দেখে বুঝতে পারলেন, তিনি শুরুতেই ঠিক ছিলেন। তাঁর কসমোলজিক্যাল কনস্ট্যান্ট না বসালেই ঠিক ছিল।

এডুইন হাবলের আবিষ্কারের পর আরও অনেক জ্যোতির্বিজ্ঞানী গ্যালাক্সির গতি পর্যবেক্ষণ শুরু করলেন। ১৯৩৩ সালে সুইজারল্যান্ডের জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফ্রিৎজ জুইকি ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির মানমন্দিরের টেলিস্কোপে পর্যবেক্ষণ করছিলেন ৩০ কোটি আলোকবর্ষ দূরের গ্যালাক্সিগুচ্ছ ‘কোমা ক্লাস্টার’-এর গতিপ্রকৃতি। এক হাজারের বেশি গ্যালাক্সির এই গুচ্ছের গ্যালাক্সিগুলো থেকে আসা আলোর বর্ণালি পর্যবেক্ষণ করে ফ্রিৎজ জুইকি অবাক হয়ে গেলেন। বর্ণালির লোহিত সরণ হিসাব করে দেখলেন, গ্যালাক্সিগুলো অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে ঘুরছে, কিন্তু গুচ্ছ থেকে ছিটকে বের হয়ে যাচ্ছে না। একটি নির্দিষ্ট মাত্রার গতির বেশি গতিতে ছুটলে বস্তু মাধ্যাকর্ষণ অতিক্রম করে বের হয়ে যায়—যাকে এসকেপ ভেলোসিটি বা মুক্তিবেগ বলে। যেমন পৃথিবী থেকে রকেট উৎক্ষেপণ করার সময় তা পৃথিবীর মুক্তিবেগের (সেকেন্ডে ১১ দশমিক ২ কিলোমিটার বা ঘণ্টায় ৪০ হাজার ৩২০ কিলোমিটার) বেশি বেগে উৎক্ষেপণ করতে হয়। (বর্তমানে অবশ্য তা করা হয় না। একেবারে পুরো বেগটা না দিয়ে রকেটের ইঞ্জিন বারেবারে এই বেগটা সরবরাহ করে।)

জুইকি গ্যালাক্সিগুলোর মোট ভর হিসাব করে দেখলেন, সেই ভরে গ্যালাক্সিগুলোর মুক্তিবেগ যত হওয়া দরকার, গ্যালাক্সিগুলো তার চেয়ে অনেক বেশি বেগে ঘুরছে। তবু ছিটকে বের হয়ে যাচ্ছে না গ্যালাক্সিগুচ্ছ থেকে। তার কারণ কী? বারবার হিসাব করেও হিসাবে কোনো ভুল পেলেন না। তাহলে নিশ্চয় সেখানকার মাধ্যাকর্ষণ শক্তি অনেক বেশি। মাধ্যাকর্ষণ শক্তি বেশি হওয়ার একটিই কারণ হতে পারে, সেটা হলো গ্যালাক্সিগুচ্ছের ভর অনেক বেশি। কিন্তু দৃশ্যমান পদার্থের ভর হিসাব করে যা পাওয়া গেল, তার চেয়ে ৪০ গুণ বেশি ভর হলে তবেই গ্যালাক্সিগুলো ওই বেগে ছুটতে পারে। এত বিশাল পরিমাণ বস্তু কোথায় গেল? জুইকি জার্মান ভাষায় এই অদৃশ্য বস্তুর নাম দিলেন ‘ডাঙ্কল ম্যাটেরি’, যা ইংরেজিতে হলো ‘ডার্ক ম্যাটার’।

প্রায় পাঁচ শতাধিক গ্যালাক্সির নক্ষত্র পর্যবেক্ষণ করে ভেরা রুবিন দেখিয়েছিলেন, গ্যালাক্সিগুলোতে অদৃশ্য বস্তু বা ডার্ক ম্যাটার ছড়িয়ে আছে

জুইকির এত বড় আবিষ্কারের দিকে খুব একটা মনোযোগ গেল না তেমন কারও। ইউরোপ-আমেরিকা তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দোরগোড়ায় উপস্থিত। নিউক্লিয়ার ফিজিকস নিয়ে মেতে উঠেছে প্রায় সবাই। জুইকির আবিষ্কারের বছরখানেক আগে নেদারল্যান্ডসের জ্যোতির্বিজ্ঞানী ইয়ান ওর্টও একই ধরনের ফলাফল পেয়েছিলেন আমাদের নিজেদের গ্যালাক্সি—মিল্কিওয়ে পর্যবেক্ষণ করার সময়। মিল্কিওয়ের অনেকগুলো লেজের দিকের অনেকগুলো নক্ষত্র এত বেগে ঘুরছে যে সেগুলোর ভর যা দেখা যাচ্ছে, তা–ই যদি হয়, তাহলে মিল্কিওয়ে থেকে ছিটকে বের হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু তা হচ্ছে না। অর্থাৎ সেখানেও যত বস্তু দেখা যাচ্ছে, তার চেয়ে অনেক বেশি বস্তু অদৃশ্য রয়ে গেছে। বছর চারেক পর ১৯৩৭ সালে মার্কিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী সিনক্লেয়ার স্মিথ পাঁচ কোটি আলোকবর্ষ দূরের ‘ভার্গো ক্লাস্টার’ গ্যালাক্সিগুচ্ছ পর্যবেক্ষণ করেও একই রকম ফল পেয়েছিলেন। কিন্তু সিনক্লেয়ার স্মিথ তাঁর গবেষণা আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার আগেই ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। এদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং তারপর স্নায়ুযুদ্ধের কারণে ডার্ক ম্যাটার নিয়ে আর কেউ তেমন মাথা ঘামাননি পরবর্তী ৩০ বছর।

১৯৭৫ সালে মার্কিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী ভেরা রুবিন অ্যান্ড্রোমিডা গ্যালাক্সির নক্ষত্রগুলোর ওপর তাঁর পর্যবেক্ষণের বিস্তারিত ফলাফল প্রকাশ করার পর জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে শুরু করলেন ডার্ক ম্যাটার সম্পর্কে।

ভেরা রুবিন খুবই বিস্তারিত গবেষণা করেছিলেন অ্যান্ড্রোমিডা গ্যালাক্সির নক্ষত্রগুলো নিয়ে। মিল্কিওয়ে, অ্যান্ড্রোমিডা—এ রকম চ্যাপটা সর্পিলাকার গ্যালাক্সিগুলোতে বেশির ভাগ নক্ষত্রই গ্যালাক্সির কেন্দ্রে অবস্থান করে। ফলে গ্যালাক্সির ভরের বেশির ভাগই এর কেন্দ্রের কাছাকাছি থাকে। গ্যালাক্সির কিনারায় ও লেজের দিকে যে নক্ষত্রগুলো থাকে, নিউটনের মাধ্যাকর্ষণ সূত্র অনুযায়ী তাদের উচিত কেন্দ্রের নক্ষত্রগুলোর তুলনায় অপেক্ষাকৃত কম গতিতে ঘোরা। যেমন আমাদের সূর্যকে কেন্দ্র করে যেসব গ্রহ ঘুরছে, সূর্য থেকে তাদের দূরত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘূর্ণনের গতি কমে যায়। যেমন বুধ যে গতিতে সূর্যের চারপাশে ঘোরে (সেকেন্ডে ৪৭ দশমিক ৯ কিলোমিটার), বৃহস্পতির গতি তার তুলনায় অনেক কম (সেকেন্ডে ১৩ দশমিক ১ কিলোমিটার)। কিন্তু ভেরা রুবিন হিসাব করে দেখলেন, গ্যালাক্সির কেন্দ্র থেকে দূরের নক্ষত্রগুলোর ঘূর্ণনের গতি কেন্দ্রের কাছের নক্ষত্রগুলোর গতির প্রায় সমান। তার মানে, নিশ্চয় গ্যালাক্সিতে এমন কোনো বস্তু আছে, যার প্রভাবে মাধ্যাকর্ষণ বল তৈরি হচ্ছে, কিন্তু বস্তুগুলো দেখা যাচ্ছে না কিছুতেই। পরবর্তী পাঁচ বছরে ভেরা রুবিন আরও শতাধিক গ্যালাক্সির নক্ষত্রগুলো পর্যবেক্ষণ করে একই ধরনের ফল পেলেন।

বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হলেন, গ্যালাক্সিগুলোতে এমন কিছু অদৃশ্য বস্তু বা ডার্ক ম্যাটার আছে, যেগুলো গ্যালাক্সির মাঝখানে কেন্দ্রীভূত থাকার বদলে পুরো গ্যালাক্সিতে ছড়িয়ে আছে; ফলে গ্যালাক্সির সব জায়গায় সমান মাধ্যাকর্ষণ তৈরি হচ্ছে। কিন্তু অদৃশ্য বস্তুগুলো কোনো ধরনের আলোর সঙ্গেই কোনো মিথস্ক্রিয়া করে না। সেই থেকে অবিরাম চেষ্টা করেও বিজ্ঞানীরা ডার্ক ম্যাটার শনাক্ত করতে পারেননি বা গবেষণাগারেও তৈরি করতে পারেননি। কিন্তু গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিং; অর্থাৎ মহাকর্ষ বলের প্রভাবে ডার্ক ম্যাটারের উপস্থিতির প্রমাণ পাচ্ছেন অহরহ।

ডার্ক ম্যাটারের আবিষ্কারক সুইস জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফ্রিৎজ জুইকি। প্রথম কোমা ক্লাস্টার পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে গুপ্তবস্তুর সন্ধান পান তিনি

গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিং বিষয়টা হলো, যখন অনেকগুলো গ্যালাক্সি একসঙ্গে থাকে, তখন সামনের গ্যালাক্সিগুলো থেকে আলো দেখা গেলেও পেছনের গ্যালাক্সিগুলোর আলো সামনের গ্যালাক্সিগুলোর কারণে দেখা যায় না। কিন্তু তাদের ভরের কারণে সৃষ্ট মাধ্যাকর্ষণের ফলে পেছনের গ্যালাক্সিগুলোর আলো বেঁকে গিয়ে সামনের গ্যালাক্সিগুলোর কিনারা দিয়ে বের হয়ে আসে। ভর যত বেশি হবে, মাধ্যাকর্ষণ তত বেশি হবে, আলোও তত বেশি বেঁকে যাবে। তাই আলো কতটুকু বেঁকে গেল, তা হিসাব করে কতটুকু বস্তু সেখানে আছে, তা হিসাব করা যায়। গ্যালাক্সিগুলোর দৃশ্যমান বস্তুর সব ভর একত্র করলেও আলোর যতটুকু বেঁকে যাওয়ার কথা, গ্যালাক্সিগুলোতে তার চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে বেঁকে যাচ্ছে আলো। তাতে এটাই প্রমাণিত হয় যে গ্যালাক্সিগুলোতে হিসাবের চেয়ে ছয় গুণ বেশি বস্তু আছে। এই বস্তুগুলো অদৃশ্য ডার্ক ম্যাটার।

ডার্ক ম্যাটারের অস্তিত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু ডার্ক ম্যাটার আসলে কী? এই প্রশ্নের উত্তর বিজ্ঞানীরা এখনো নিশ্চিতভাবে বের করতে পারেননি। তবে ডার্ক ম্যাটার সম্পর্কে বেশ কয়েক ধরনের ধারণা দিয়েছেন অনেকে।

একদল বিজ্ঞানীর ধারণা ছিল, ডার্ক ম্যাটার সম্ভবত লুকানো ব্ল্যাকহোল; কিন্তু এই ধারণা সহজেই বাতিল হয়ে গেছে। কারণ, অবস্থান জানলে ব্ল্যাকহোল খুঁজে পেতে সমস্যা হয় না।

আরেক দল বিজ্ঞানী বললেন, ডার্ক ম্যাটার হতে পারে মহাবিশ্বের গ্রহ, কিংবা নিউট্রন স্টার, ঠান্ডা হয়ে যাওয়া শ্বেতবামন কিংবা এ রকম বস্তু, যেগুলোর নিজস্ব কোনো আলো নেই। এই বস্তুগুলোর একটি গালভরা নামও দেওয়া হলো, ‘ম্যাসিভ অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল কম্প্যাক্ট হ্যালো অবজেক্টস’ বা ‘মাচো (MACHO)’। কিন্তু এই বস্তুগুলো তো আধুনিক টেলিস্কোপে ধরা পড়ার কথা। নিজস্ব আলো না থাকলেও এদের গায়ে অন্য নক্ষত্রের আলো প্রতিফলিত হয়। তা ছাড়া এ রকম কতগুলো বস্তু মহাবিশ্বে থাকতে পারে, তাদের সম্ভাব্য সব কটির ভর একসঙ্গে যোগ করেও অদৃশ্য ডার্ক ম্যাটারের ভরের কাছাকাছিও পৌঁছানো যাচ্ছে না। ফলে এই সম্ভাবনাও বাতিল হয়ে যায়।

‘মাচো’ পদার্থের সম্ভাবনা বাতিল হয়ে যাওয়ার পর আরেকটি সম্ভাবনা বিজ্ঞানীরা খতিয়ে দেখতে শুরু করেছেন। সেটা হলো, নতুন ধরনের কোনো কণা কিংবা কণার সমষ্টি দিয়ে গঠিত হতে পারে ডার্ক ম্যাটার। এই কণাগুলো কণাপদার্থবিজ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত কণাগুলোর বাইরে নতুন কোনো কণা। যেগুলোর ভর আছে, কিন্তু অন্য কোনো কণার সঙ্গে খুব সামান্যই মিথস্ক্রিয়া করে। এদের নাম দেওয়া হয়েছে উইকলি ইন্টার-অ্যাকটিং ম্যাসিভ পার্টিক্যালস বা উইম্প (WIMP)। ধারণা করা হচ্ছে, এই কণাগুলো শুধু মহাকর্ষ বল এবং দুর্বল নিউক্লিয়ার বলের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে—অনেকটা নিউট্রিনোর মতো—যাদের শনাক্ত করা দুঃসাধ্য। ১৯৯৮ সালে জাপানি বিজ্ঞানীরা যখন নিউট্রিনোর ভর নির্ণয় করতে সক্ষম হলেন, তখন সবাই আশা করেছিলেন, মহাবিশ্বে সম্ভাব্য সব নিউট্রিনোর ভর হিসাব করলে অদৃশ্য ডার্ক ম্যাটারের ভরের সমান হবে; কিন্তু সে রকম কিছু হলো না। সব নিউট্রিনোর ভর যোগ করলেও অদৃশ্য ডার্ক ম্যাটারের এক শতাংশ ভরের সমানও হয় না। বিজ্ঞানীরা আশা করে আছেন, কোনো একদিন হয়তো নিউট্রিনোর মতো কোনো নতুন কণার সন্ধান পাওয়া যাবে।

আবার একদল বিজ্ঞানী মনে করেন, ডার্ক ম্যাটার বলে হয়তো কোনো পদার্থ নেই, হয়তো আইনস্টাইনের হিসাবে কোনো গন্ডগোল আছে, কিংবা গ্যালাক্সির ক্ষেত্রে আইনস্টাইনের মহাকর্ষ তত্ত্ব সমীকরণে পরিবর্তন আনার দরকার আছে ডার্ক ম্যাটার সমস্যা সমাধানের জন্য। আরেক দল বিজ্ঞানী মনে করেন, নিউটনের মহাকর্ষের সূত্র হয়তো মহাবিশ্বের সব জায়গায় সমানভাবে কাজ করে না। গ্রহ-উপগ্রহের ক্ষেত্রে যা কাজ করে, তা হয়তো বৃহত্তর গ্যালাক্সির ক্ষেত্রে কাজ করে না। তাঁরা এ ধারণার নাম দিলেন, মডিফায়েড নিউটনিয়ান ডায়নামিকস বা মন্ড (MOND)।

নানা বিজ্ঞানীর নানা মত থেকে মহাবিশ্বের মোট বস্তুর প্রায় ২৬ ভাগ অদৃশ্য বস্তু বা ডার্ক ম্যাটার সম্পর্কে এখনো সুনির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি। এটা এখনো মহাবিশ্বের অন্যতম প্রধান অমীমাংসিত রহস্য।

ডার্ক ম্যাটার রহস্যের মধ্যেই নতুন রহস্য হাজির হয়েছে মহাবিশ্বে। সেটা ঘটেছে বিংশ শতাব্দীর একেবারে শেষের দিকে এসে, ১৯৯৮ সালে। আর সেই নতুন রহস্যের নাম ডার্ক এনার্জি। এটা ভাবার কোনো কারণ নেই যে ডার্ক ম্যাটার থেকেই ডার্ক এনার্জির উৎপত্তি।

ডার্ক এনার্জি–রহস্যের শুরু হয়েছে মহাবিশ্বের প্রসারণের গতি নির্ণয় করতে গিয়ে। আমরা ইতিমধ্যেই আলোচনা করেছি যে ১৯২৯ সালে এডুইন হাবল আবিষ্কার করেছিলেন, গ্যালাক্সিগুলো ক্রমে দূরে সরে যাচ্ছে। কী গতিতে গ্যালাক্সিগুলো ছুটে চলেছে, তার একটি সূত্র তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন। যাকে আমরা হাবলের সূত্র বলে জানি। এই সূত্র অনুযায়ী, কোনো একটি গ্যালাক্সির গতি পৃথিবী থেকে গ্যালাক্সির দূরত্বের সমানুপাতিক। আর এই সমীকরণের সমানুপাতিক ধ্রুবকের নাম হাবল কনস্ট্যান্ট বা হাবল ধ্রুবক। ১৯৯০ সালে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা হাবল স্পেস টেলিস্কোপ মহাকাশে পাঠায়। এর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল হাবল ধ্রুবকের মান প্রতিষ্ঠা করা এবং সেখান থেকে মহাবিশ্বের বয়স নির্ণয় করা। পৃথিবী থেকে গ্যালাক্সির দূরত্ব নির্ণয়ের জন্য হাবল ব্যবহার করেছিলেন সেফিড বা শেফালি বিষম তারার উজ্জ্বলতা। এই নক্ষত্রগুলোর উজ্জ্বলতা একটি নির্দিষ্ট সময় পরপর বাড়ে এবং কমে। এই উজ্জ্বলতার পরিমাণ হিসাব করে পৃথিবী থেকে তাদের দূরত্ব বের করা যায়। দূরত্ব যত বেশি হয়, উজ্জ্বলতা তত কমতে থাকে। সেফিড নক্ষত্রগুলো আন্তনাক্ষত্রিক দূরত্ব নির্ণয়ের ক্ষেত্রে ‘আদর্শ বাতি’র কাজ করে। [সেফিড নক্ষত্র সম্পর্কে আরও বিস্তারিত দেওয়া আছে আবুল বাসারের মহাজাগতিক প্রথম আলো বইতে।] এই শেফালি বিষম তারার আলো ব্যবহার করেই হাবল টেলিস্কোপ মহাবিশ্বের বয়স নির্ণয় করেছে ১ হাজার ৩৮০ কোটি বছর।

শ্বেতবামনের ভর বাড়তে বাড়তে যদি আমাদের সূর্যের চেয়ে ১ দশমিক ৪ গুণের বেশি হয়ে যায়, তখন সুপারনোভা বিস্ফোরণ ঘটে।

অনেক দূরের গ্যালাক্সির দূরত্ব নির্ণয়ের ক্ষেত্রে সেফিড খুব বেশি কার্যকর নয়। কারণ, অত দূর থেকে আসতে আসতে আলো অনেক ম্লান হয়ে যায়। বিজ্ঞানীরা তাই সেফিডের চেয়ে উজ্জ্বল কোনো কিছুর খোঁজ করছিলেন, যাকে আদর্শ বাতি হিসেবে ব্যবহার করা যায়। ১৯৯০–এর দশকে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের দুটি দল আলাদা আলাদাভাবে গ্যালাক্সি পর্যবেক্ষণ শুরু করলেন সুপারনোভা-টাইপ-1aকে আদর্শ বাতি ধরে। টাইপ-1a সুপারনোভায় একটি শ্বেতবামন অন্য একটি নক্ষত্রের সঙ্গে যূথবদ্ধভাবে একে অপরের চারপাশে ঘুরতে থাকে। শ্বেতবামন হলো মৃত নক্ষত্র, যার সব হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম শেষ হয়ে গেছে, শুধু কার্বন আর অক্সিজেন অবশিষ্ট আছে। এই শ্বেতবামনের ঘনত্ব অন্য নক্ষত্রের চেয়ে বেশি। এর মাধ্যাকর্ষণও বেশি। ফলে ঘুরতে ঘুরতে অন্য নক্ষত্রের জ্বালানি ও গ্যাসীয় পদার্থ শ্বেতবামনের দিকে চলে আসতে থাকে। তাই বাড়তে থাকে শ্বেতবামনের ভর। সুব্রহ্মণ্যন চন্দ্রশেখরের ‘চন্দ্রশেখর সীমা’ নীতি অনুযায়ী, শ্বেতবামনের ভর বাড়তে বাড়তে যদি আমাদের সূর্যের চেয়ে ১ দশমিক ৪ গুণের বেশি হয়ে যায়, তখন সুপারনোভা বিস্ফোরণ ঘটে। কোনো গ্যালাক্সির সব নক্ষত্রের উজ্জ্বলতা একসঙ্গে যোগ করলে যে পরিমাণ উজ্জ্বলতা পাওয়া যায়, একটি সুপারনোভা বিস্ফোরণে সেই পরিমাণ উজ্জ্বলতা তৈরি হয়। এই উজ্জ্বলতা কয়েক শ কোটি আলোকবর্ষ পার হয়ে এলেও পৃথিবীর টেলিস্কোপে ধরা পড়ে।

ক্যালিফোর্নিয়াকেন্দ্রিক ‘সুপারনোভা কসমোলজি প্রজেক্ট’ এবং আন্তর্জাতিক ‘হাই-জেড সুপারনোভা সার্চ টিম’—দুটি দলই কাজ শুরু করার কয়েক বছরের মধ্যে ফলাফল পেতে শুরু করল। ৫০০ থেকে ৭০০ কোটি আলোকবর্ষ দূরের ৪২টি সুপারনোভা এবং অপেক্ষাকৃত কম দূরত্বের আরও ১৮টি সুপারনোভার আলোর বর্ণালির রেড শিফট বা লোহিত সরণ হিসাব করে বিজ্ঞানীরা খুবই আশ্চর্যজনক ফলাফল পেলেন। বিগ ব্যাংয়ের পর মহাবিশ্বের দ্রুত প্রসারণ ঘটতে থাকে। কিন্তু মহাকর্ষ বল তৈরি হওয়ার পরে একটা সময় পর থেকে মহাবিশ্বের প্রসারণের গতি কমে আসার কথা। বিজ্ঞানীরা দেখতে পেলেন, উল্টো ঘটনা ঘটছে আমাদের মহাবিশ্বে। মহাবিশ্বের বয়স ৫০০ কোটি বছর পার হওয়ার পরের ২০০ কোটি বছর ধরে প্রসারণের গতি কিছুটা কমতে শুরু করেছিল। কিন্তু বয়স ৭০০ কোটি বছর পার হওয়ার পর থেকে মহাবিশ্বের প্রসারণের গতি ক্রমে বাড়তে শুরু করেছে। মহাকর্ষ বল বস্তুকে নিজের দিকে টানার বদলে কেন বাইরের দিকে ঠেলতে শুরু করেছে, তার কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ খুঁজে পাচ্ছেন না বিজ্ঞানীরা। ১৯৯৮ সালে গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার পর বিজ্ঞানীরা মহাবিশ্বের এই নতুন রহস্যে হতবাক হয়ে গেলেন। মার্কিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী মাইকেল টার্নার এর জন্য দায়ী করলেন অদৃশ্য শক্তি—ডার্ক এনার্জিকে। ডার্ক এনার্জি, যার সম্পর্কে কোনো সুনির্দিষ্ট ধারণাই নেই কোনো বিজ্ঞানীর। তবু এই নতুন আবিষ্কারের জন্য সুপারনোভা প্রকল্পের দুটি গ্রুপের প্রধান বিজ্ঞানীদের তিনজন—সল পারমুটার, ব্রায়ান শ্মিট ও অ্যাডাম রিস পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন ২০১১ সালে।

২০১৩ সালে ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সির প্ল্যাঙ্ক স্যাটেলাইট থেকে প্রাপ্ত কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশন বা সিএমবি পরিমাপ করে বিজ্ঞানীরা একমত হয়েছেন, মহাবিশ্বের মোট ভর ও শক্তির ৬৮ দশমিক ৩ শতাংশ ডার্ক এনার্জি, ২৬ দশমিক ৮ শতাংশ ডার্ক ম্যাটার এবং মাত্র ৪ দশমিক ৯ শতাংশ আমাদের দৃশ্যমান বস্তু। অর্থাৎ এই মহাবিশ্বের প্রায় ৯৫ ভাগ সম্পর্কে আমরা এখনো নির্দিষ্টভাবে কিছুই জানি না, কেবল জানি যে তারা আছে।

লেখক: শিক্ষক ও গবেষক, আরএমআইটি, মেলবোর্ন, অস্ট্রেলিয়া

সূত্র: ১. লেফটেরিস পাপানটোনোপোলোস, দ্য ইনভিজিবল ইউনিভার্স: ডার্ক ম্যাটার অ্যান্ড ডার্ক এনার্জি, স্প্রিঙ্গার, বার্লিন ২০০৭

২. আবুল বাসার, মহাজাগতিক প্রথম আলো, প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা, ২০২২

৩. জন ম্যাডক্স, হোয়াট রিমেইনস টু বি ডিসকভারড, দ্য ফ্রি প্রেস, নিউইয়র্ক, ১৯৯৮

৪. পল স্টেইনহার্ডট ও নিল টুরক, এন্ডলেস ইউনিভার্স, ব্রডওয়ে বুকস, নিউইয়র্ক, ২০০৭

৫. গাইলস স্পারো, ফিফটি আইডিয়াস ইউ রিয়েলি নিড টু নো অ্যাস্ট্রোনমি, কোয়েরকাস, লন্ডন, ২০১৬।