মহাকর্ষের বেগ

মহাকর্ষের বেগ কত? আলোর বেগের সমান, নাকি কম বা বেশি? প্রশ্নটির জবাব খুঁজে বের করতে লেগে গেছে শতাব্দীরও বেশি। সংক্ষেপে রোমাঞ্চকর সেই গল্প...

প্রকৃতিতে চারটি মৌলিক বল আছে। এর মধ্যে আমরা সবচেয়ে পরিচিত মহাকর্ষের সঙ্গে। চলতে-ফিরতেও একে আমরা সবচেয়ে বেশি অনুভব করি। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে কিংবা হাতে ভারী ব্যাগ থাকলেই টের পাই মহাকর্ষের শক্তি। আবার সুন্দর ঝরনা বেয়ে পানি নেমে আসে এই মহাকর্ষেরই কল্যাণে। উদ্ভিদের বৃদ্ধি এবং আমাদের দেহের রক্ত সঞ্চালনেও আছে মহাকর্ষের ভূমিকা। গ্রহ, নক্ষত্র, ছায়াপথরা মহাশূন্যে ভেসে বেড়াচ্ছে মহাকর্ষের বদৌলতেই।

কিন্তু মহাকর্ষ কত বেগে চলে? এর কি চলতে আদৌ কোনো সময় লাগে? নক্ষত্রের মহাকর্ষীয় বন্ধনে আটকা পড়তে গ্রহদের কত সময় লাগে? নাকি ব্যাপারটা ঘটে যায় নিমেষেই, গ্রহ সে যত দূরেই থাক?

ধরুন, সূর্য হঠাৎ তার চলার পথ থেকে উধাও হয়ে গেল। শুধু অদৃশ্য নয়, একদম হাওয়া। এ ব্যাপারটা আমরা পৃথিবীতে বসে কখন অনুভব করব বা দেখব? আলো চোখে এসে পড়লে আমরা কোনো বস্তু দেখি। আর আলোর বেগ সেকেন্ডে ৩ লাখ কিলোমিটার। পৃথিবী তো প্রায় ১৫ কোটি কিলোমিটার দূর থেকে সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। আলো আসতে সময় লাগে গড়ে ৮ মিনিট ২০ সেকেন্ড। তার মানে, এ সময় পরে আমরা জেনে ফেলব সূর্যের হারিয়ে যাওয়ার কথা। অন্ধকার হয়ে যাবে পৃথিবীর আকাশ।

আরও পড়ুন
আলো আর মহাকর্ষ ভিন্ন বেগে চললে মজার বিষয় হবে। রৌদ্রস্নান করা মানুষ এক সময় দেখবেন আলো নেই। আর মানমন্দিরের জ্যোতির্বিদ অন্য সময় খেয়াল করবেন, পৃথিবীর কক্ষপথে গোলমাল বেধেছে।
আইজ্যাক নিউটন

কিন্তু সূর্যের অভাবে মহাকর্ষের কী হবে? সূর্য নেই মানে তো গ্রহদের কক্ষপথ টিকিয়ে রাখার জন্য নেই কোনো শক্তি। কক্ষপথে গোলমাল হবে। কিন্তু সেটি কখন হবে? আলোর মতোই ৮ মিনিট ২০ সেকেন্ড পর, নাকি আরও আগে বা পরে?

মহাকর্ষের বেগ অসীম হলে সূর্য হারিয়ে যাওয়ামাত্রই গ্রহদের ওপর মহাকর্ষের বল উধাও হয়ে যাবে। গ্রহরা সঙ্গে সঙ্গে স্বাধীন যাযাবরে পরিণত হবে। রওনা হয়ে যাবে গহিন মহাশূন্যের অজানা গন্তব্যের দিকে। আর মহাকর্ষের বেগ আলোর বেগের সমান হলে? পৃথিবী ৮ মিনিট ২০ সেকেন্ড পর্যন্ত সূর্যকে বরাবরের মতোই প্রদক্ষিণ করবে।

আলো আর মহাকর্ষ ভিন্ন বেগে চললে মজার বিষয় হবে। রৌদ্রস্নান করা মানুষ এক সময় দেখবেন আলো নেই। আর মানমন্দিরের জ্যোতির্বিদ অন্য সময় খেয়াল করবেন, পৃথিবীর কক্ষপথে গোলমাল বেধেছে। কিন্তু আসল ঘটনা কোনটা?

বিজ্ঞানের ইতিহাসে এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার নজির পাওয়া যায়। নিউটন মহাকর্ষের প্রথম আধুনিক ধারণা দেন। তিনি মনে করতেন, মহাকর্ষের বেগ অসীম। বিশ্বাস করতেন, সূর্য হারিয়ে গেলে সে দৃশ্য দেখার আগেই পৃথিবীর গতিপথ পাল্টে যাবে।

আরও পড়ুন
শব্দতরঙ্গের সঙ্গে তুলনাটা আরও ভালো হয়। শব্দ বাতাসের অণুকে সংকুচিত ও প্রসারিত করে। স্থানের এই বিকৃতিকে বলে মহাকর্ষ তরঙ্গ। এ তরঙ্গ চলে আলোর বেগে।
লাইগো: দানবাকৃতির এক ইন্টারফেরোমিটার

এখন পর্যন্ত মহাকর্ষের সবচেয়ে ভালো তত্ত্ব দেন আইনস্টাইন। আপেক্ষিকতার সার্বিক তত্ত্ব তার নাম। তিনি মনে করতেন, মহাকর্ষ চলে আলোর বেগে। আলোর চেয়ে বেশি বেগে যায় কার সাধ্য! ফলে তাঁর মতে, পৃথিবী অন্ধকার ও কক্ষপথ থেকে বিচ্যুত হবে একই সময়ে। এসব ধারণার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে তাঁর সাধারণ আপেক্ষিকতায়। এ তত্ত্ব সূর্যের চারপাশে গ্রহদের গতিপথ সুন্দরভাবে অনুমান ও ব্যাখ্যা করতে পারে। নিউটনের তত্ত্বের চেয়ে বেশি ও সূক্ষ্ম পূর্বাভাস দিতে পারে এটি।

তাহলে কার কথা ঠিক? জানতে হলে সরাসরি মাপতে হবে মহাকর্ষের বেগ। চাইলেই তো আর সূর্যকে হাওয়া করে দেওয়া যাবে না। তার মানে, অন্য পথে যেতে হবে।

আইনস্টাইনের মহাকর্ষের তত্ত্বে পরীক্ষাযোগ্য কিছু পূর্বাভাস আছে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি পূর্বাভাস হলো, মহাকর্ষকে স্থানের কাঠামোর বিকৃতি হিসেবে উপস্থাপন করা যায়। বিকৃতি যত বেশি, মহাকর্ষ তত বেশি। এই কথার আছে সুদূরপ্রসারী ফলাফল। স্থান হলো চাদরের মতো নমনীয়। টানিয়ে রাখা চাদরে কোনো বাচ্চা লাফালাফি করলে যেমন এতে টোল পড়ে, পাল্টে যায় পৃষ্ঠের আকৃতি, তেমনি মহাকর্ষ পাল্টে দেয় স্থানকে।

অতএব, স্থানও ওপর-নিচে দোল খাওয়ার মতো হয়। অবশ্য শব্দতরঙ্গের সঙ্গে তুলনাটা আরও ভালো হয়। শব্দ বাতাসের অণুকে সংকুচিত ও প্রসারিত করে। স্থানের এই বিকৃতিকে বলে মহাকর্ষ তরঙ্গ। এ তরঙ্গ চলে আলোর বেগে। অতএব, মহাকর্ষ তরঙ্গ শনাক্ত করা গেলেই পাওয়া যাবে মহাকর্ষের বেগ। তবে স্থানের পরিমাপযোগ্য বিকৃতি খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। অন্তত বর্তমান প্রযুক্তির সে সক্ষমতা নেই। তাহলে উপায়?

আরও পড়ুন
আইনস্টাইন ১৯১৬ সালেই মহাকর্ষ তরঙ্গের ভবিষ্যদ্বাণী করেন। তবে একে শনাক্ত করার প্রযুক্তি বানাতে লেগে যায় প্রায় এক শতাব্দী। স্থানের এ আন্দোলন শনাক্ত করতে বিজ্ঞানীরা দুটি নল ব্যবহার করেন।
সূর্য গ্রহগুলোকে কক্ষপথে ঘুরতে বাধ্য করছে মহাকর্ষ বল প্রয়োগ করে

গ্রহরা নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করে। অনেক সময় আবার নক্ষত্ররাই পরস্পরকে কেন্দ্র করে ঘোরে। এদের নাম বাইনারি স্টার বা জোড়া তারা। এমন কিছু নক্ষত্রের জীবন শুরু হয়েছিল ভারী নক্ষত্র হিসেবে। সূর্যের চেয়ে অনেক ভারী এসব নক্ষত্র সূর্যের মতো আলো বিলিয়ে জ্বালানি নিঃশেষ করে মৃত্যুবরণ করেছে। পরিণত হয়েছে ব্ল্যাকহোলে। যে মৃত নক্ষত্র থেকে আলোও আর বের হতে পারে না। এমনও জোড়া তারা আছে, যাদের দুটিই ব্ল্যাকহোলে পরিণত হয়েছে। ঘুরছে একে অপরকে কেন্দ্র করে।

কক্ষপথে চলার সময় এরা সামান্য পরিমাণ মহাকর্ষ তরঙ্গ নির্গত করে। বর্তমান প্রযুক্তি দিয়ে যা ধরা সম্ভব নয়। তরঙ্গ নির্গত করতে করতে এরা শক্তি হারায়। ফলে কক্ষপথ ছোট হয়। একে অপরের কাছে আসে। একসময় মিশে যায় একে অপরের সঙ্গে। এ মিলন বা সংঘর্ষের সময় নির্গত হয় বিপুল আকারের মহাকর্ষ তরঙ্গ। মিলনের ক্ষুদ্র মুহূর্তটিতে নির্গত মহাকর্ষ তরঙ্গের শক্তি ওই সময়ের পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্বের সব নক্ষত্রের নির্গত আলোর শক্তির চেয়েও বেশি।

আইনস্টাইন ১৯১৬ সালেই মহাকর্ষ তরঙ্গের ভবিষ্যদ্বাণী করেন। তবে একে শনাক্ত করার প্রযুক্তি বানাতে লেগে যায় প্রায় এক শতাব্দী। স্থানের এ আন্দোলন শনাক্ত করতে বিজ্ঞানীরা দুটি নল ব্যবহার করেন। লাইগো নামে এ যন্ত্রের প্রতি নলের দৈর্ঘ্য আড়াই মাইল বা চার কিলোমিটার। নল দুটিকে ইংরেজি এল অক্ষরের মতো ৯০ ডিগ্রি কোণে বসানো হয়। এদের মধ্যে ব্যবহার করা হয় বিভিন্ন কম্বিনেশনের দর্পণ ও লেজার, যা দিয়ে মাপা হয় নলের দৈর্ঘ্য। মহাকর্ষ তরঙ্গ দুই নলের দৈর্ঘ্যকে বদলে দেবে। একেকটার একেকভাবে। দৈর্ঘ্যের পরিবর্তনের পার্থক্য দেখে বোঝা যাবে তরঙ্গের অস্তিত্ব।

আরও পড়ুন
দুই নিউট্রন নক্ষত্রের সংঘর্ষে মহাকর্ষ তরঙ্গ পাওয়া গেল। প্রায় দুই সেকেন্ড পর শনাক্ত হলো গামা বিকিরণ। গামা বিকিরণ আলোরই শক্তিশালী একটি রূপ। খালি চোখে আমরা দেখি না।
ব্ল্যাকহোলে
ছবি: সংগৃহীত

২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে প্রথম মহাকর্ষ তরঙ্গ পাওয়া যায়। পৃথিবী থেকে ১০০ কোটি আলোকবর্ষ দূরের দুই ব্ল্যাকহোলের সংঘর্ষের ফলে তৈরি হয় এ তরঙ্গ। এ পর্যবেক্ষণ ছিল জ্যোতির্বিদ্যার বড় এক সাফল্য। আইনস্টাইনের সার্বিক আপেক্ষিকতার আরেক জোরালো প্রমাণ। তবে এ থেকেও মহাকর্ষের বেগ জানা যায়নি। সে জন্য প্রয়োজন হয়েছিল আরেকটি পর্যবেক্ষণ।

দুই ব্ল্যাকহোলের মিলন বা সংঘর্ষ ছাড়াও মহাকর্ষ তরঙ্গ তৈরি হতে পারে। দুই নিউট্রন নক্ষত্রের সংঘর্ষেও তা হতে পারে। যদিও নিউট্রন নক্ষত্র সাধারণ ব্ল্যাকহোলের চেয়ে হালকা। তবে নিউট্রন নক্ষত্রের সুবিধা হলো, এদের মিলন শুধু মহাকর্ষ তরঙ্গই তৈরি করে না, নির্গত করে আলোর ঝলক, যা পুরো মহাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। মহাকর্ষের বেগ বের করতে নিউট্রন নক্ষত্রের সংঘর্ষ দেখা গেলে তাই সুবিধা হয়।

২০১৭ সালে এল এ সুযোগ। দুই নিউট্রন নক্ষত্রের সংঘর্ষে মহাকর্ষ তরঙ্গ পাওয়া গেল। প্রায় দুই সেকেন্ড পর শনাক্ত হলো গামা বিকিরণ। গামা বিকিরণ আলোরই শক্তিশালী একটি রূপ। খালি চোখে আমরা দেখি না। দেখার কাজটি করল পৃথিবীর কক্ষপথে থাকা পর্যবেক্ষণকেন্দ্র। এ গামা আলোর উৎস ১৩ কোটি আলোকবর্ষ দূরের এক ছায়াপথ এনজিসি ৪৯৯৩। শেষ পর্যন্ত মহাকর্ষের বেগ মাপার উপাদান হাতে এল বিজ্ঞানীদের।

দুই নিউট্রন তারার সংঘর্ষে একই সঙ্গে মহাকর্ষ তরঙ্গ ও আলো তৈরি হয়। ফলে পৃথিবীতে তাদের একই সঙ্গে পর্যবেক্ষণে ধরা পড়া উচিত। দেখা গেল, ১৩ কোটি আলোকবর্ষের দুই তরঙ্গ দুই সেকেন্ডের ব্যবধানে পৃথিবীতে এসে পৌঁছেছে।

এ থেকেই আমরা উত্তর পেয়ে গেলাম। মহাকর্ষ আর আলো চলে একই বেগে। আবারও আইনস্টাইন সঠিক প্রমাণিত হলেন। এ তথ্যের মাধ্যমে মিলে গেল আপাতদৃষ্টে দুই আলাদা জিনিসের বৈশিষ্ট্য। মহাকর্ষ ও আলোর বেগ। বিজ্ঞানীদের আশা, ভবিষ্যতে হয়তো জানা যাবে, কোথায় এ দুইয়ের সংযোগ।

লেখক: প্রভাষক, পরিসংখ্যান বিভাগ, সিলেট ক্যাডেট কলেজ

সূত্র: বিগথিঙ্ক ডটকম

*লেখাটি ২০২৩ সালে বিজ্ঞানচিন্তার জুন সংখ্যায় প্রকাশিত

আরও পড়ুন