এক অবিশ্বাস্য মুহূর্তের সাক্ষী হলো বিশ্ব! যুক্তরাষ্ট্রের বেসরকারি মহাকাশ সংস্থা ফায়ারফ্লাই অ্যারোস্পেসের ‘ব্লু ঘোস্ট মিশন ১’ সফলভাবে চাঁদের বুকে অবতরণ করেছে। ২ মার্চ, রোববার মার্কিন সময় ৩টা ৩৪ মিনিটে চন্দ্রপৃষ্ঠে সফলভাবে অবতরণ করে এটি। এই মিশন যৌথভাবে পরিচালনা করে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা এবং ইলন মাস্কের স্পেসএক্স।
দ্বিতীয় বেসরকারি মহাকাশযান হিসেবে এটি চাঁদে পৌঁছেছে। এর আগে, ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রথম বেসরকারি যান চাঁদে পৌঁছালেও সেটি উল্টে গিয়েছিল। ফলে এবারের সফল অবতরণ মহাকাশ গবেষণায় এক নতুন মাইলফলক হিসেবে ধরা হচ্ছে।
বিশ্বের প্রথম নভোযান হিসেবে এই ল্যান্ডার চাঁদের বুকে সোজাভাবে অবতরণ করেছে। অবতরণের পরেও এটি স্থির ছিল, মানে কোনো দিকে হেলে পড়েনি। ইতিহাসে আগে কখনো এমনটি করতে পারেনি মানুষ। সে জন্যই এই নভোযানের অবতরণের দৃশ্যটিকে ‘অবিশ্বাস্য’ ও ‘মাইল ফলক’ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এমনকি এ সাফল্য উদযাপন করেছেন অ্যাপোলো ১১ মিশনের চন্দ্রজয়ী বাজ অলড্রিনও।
ব্লু ঘোস্ট চাঁদের উত্তর–পূর্বের কাছাকাছি মেয়ার ক্রিসিয়াম এলাকার মনস ল্যাটরেইল নামের স্থানে নেমেছে। নির্দিষ্ট লক্ষ্যের মাত্র ১০০ মিটারের মধ্যে অবতরণ করে এ নভোযান। এই প্রকল্পের প্রোগ্রাম ম্যানেজার রে অ্যালেনসওয়ার্থ জানান, ‘অবতরণের সময় যানটি দুবার বিপদের মুখে পড়েছিল। আমরা সেগুলো সফলভাবে কাটিয়ে উঠতে পেরেছি। এটা এই নভোযানের সফটওয়্যারের কার্যকারিতার প্রমাণ।’
চাঁদে অবতরণের প্রথম ছবিটি এসেছে ব্লু ঘোস্টের ক্যামেরা থেকেই। সেখানে দেখা যাচ্ছে, বিশাল গর্ত আর পাথুরে ভূখণ্ড। এই পাথুরে পৃষ্ঠেই যানটিকে সাবধানে নামতে হয়েছে। ঘণ্টায় হাজার হাজার মাইল বেগে ছোটার পর, সেখান থেকে কমিয়ে অবতরণের সময় এর বেগ ছিল ঘণ্টায় মাত্র ২ মাইল (৩.২ কিলোমিটার প্রায়)।
ব্লু ঘোস্টের ডাকনাম ‘ঘোস্ট রাইডারস ইন দ্য স্কাই’। এটি নাসার একটি বড় প্রকল্পের অংশ, যেখানে চাঁদে আরও নভোযান পাঠিয়ে গবেষণা চালানো হবে। ভবিষ্যতে আর্টেমিস প্রোগ্রামের মাধ্যমে আবার মানুষকে চাঁদে পাঠানোর পরিকল্পনাও রয়েছে নাসার।
এর আগে, ১৬ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টারের লঞ্চ কমপ্লেক্স ৩৯এ থেকে উৎক্ষেপণ করা হয় এই নভোযান। প্রায় ২.৮ মিলিয়ন বা ২৮ লাখ মাইল পথ পেরিয়ে এটি চাঁদে পৌঁছে। এর সঙ্গে জাপানের আরেকটি ল্যান্ডার ছিল, সেটি চলতি বছর মে মাসে চাঁদে নামবে।
এই মিশনে নাসার নেতৃত্বাধীন ১০টি বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা ও পরীক্ষামূলক নতুন প্রযুক্তি চন্দ্রপৃষ্ঠে নিয়ে যাওয়া হয়। এগুলোর সাহায্যে চাঁদের মাটি বিশ্লেষণ, বিকিরণ-সহনশীল কম্পিউটারের কার্যকারিতা পরীক্ষা এবং চাঁদে স্যাটেলাইট নেভিগেশন প্রযুক্তির ব্যবহার পরীক্ষা করা হবে।
শুধু ব্লু ঘোস্টই নয়, ৬ মার্চ আরও একটি নভোযান চাঁদের পথে রওনা দেবে। টেক্সাসের আরেকটি সংস্থা, ইনটুইটিভ মেশিনস-এর ‘অ্যাথেনা’ ল্যান্ডার এবার চাঁদের আরও দক্ষিণে নামার পরিকল্পনা করছে। এর মধ্যে থাকবে তিনটি রোভার, বরফ খোঁজার জন্য একটি ড্রিল এবং ইতিহাসের প্রথম ‘হপিং ড্রোন’! হপিং ড্রোন ওড়ার পাশাপাশি মাটির ওপর লাফিয়ে চলতে পারে। সাধারণত যেখানে উড়তে সমস্যা হতে পারে, সেসব জায়গায় এই হোপিং ড্রোন ব্যবহার করা হয়।
চাঁদে অবতরণ করা মোটেই সহজ নয়। সেখানে বাতাস নেই, তাই প্যারাসুট ব্যবহার করা যায় না। শুধু ইঞ্জিনের সাহায্যে যানগুলোকে নিরাপদে অবতরণ করাতে হয়। ব্লু ঘোস্টের এই অবতরণ চাঁদ গবেষণার জন্য এক বিশাল সাফল্য। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতের মহাকাশ গবেষণার পথ আরও প্রশস্ত হলো!