সম্প্রতি মহাবিশ্বের অসাধারণ এক ছবি প্রকাশ করেছে ইউরোপীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসা। ছবিটি তোলা হয়েছে ইউক্লিড টেলিস্কোপের সাহায্যে। এ টেলিস্কোপ মহাকাশের বিশাল অংশ জুড়ে থাকা লাখ লাখ গ্যালাক্সির ছবি তুলেছে। সেই ছবিই আমাদের মহাবিশ্ব সম্পর্কে নতুন ধারণা দিচ্ছে। ইউক্লিড টেলিস্কোপের পাঠানো প্রথম ছবিগুলো তিনটি ডিপ ফিল্ড* বা গভীর মহাকাশের চিত্র প্রকাশ করেছে। সেখানে অনেক গ্যালাক্সি একসঙ্গে রয়েছে। এই ডিপ ফিল্ড তিনটি হলো ডিপ ফিল্ড সাউথ, ডিপ ফিল্ড ফোরনাক্স এবং ডিপ ফিল্ড নর্থ।
ইউক্লিড টেলিস্কোপ মাত্র একবার স্ক্যান করেই ২ কোটি ৬০ লাখ গ্যালাক্সি খুঁজে পেয়েছে! এর মধ্যে সবচেয়ে দূরের গ্যালাক্সিটি পৃথিবী থেকে ১,০৫০ কোটি আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। এত বিপুল পরিমাণ ডেটা বিশ্লেষণ করতে ইসা সাধারণ মানুষের সাহায্য নিয়েছে। সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অ্যালগরিদমও এই ডেটা বিশ্লেষণ করেছে। এখন পর্যন্ত ৩ লাখ ৮০ হাজারেরও বেশি গ্যালাক্সি শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। এই ডেটাকে ইউক্লিড টেলিস্কোপের পাঠানো বিশাল ডেটার সামান্য অংশই বলা যায়। আগামী কয়েক বছরে, ইউক্লিড টেলিস্কোপ ১৫০ কোটি গ্যালাক্সির ছবি পাঠাবে ইসার কাছে। সেগুলো দিয়ে তৈরি হবে মহাবিশ্বের নতুন মানচিত্র।
এক বর্গ ডিগ্রি হলো আকাশের একটি অংশের পরিমাপের একক। এটি কোনো বস্তুর দৈর্ঘ্য বা প্রস্থের মতো সাধারণ পরিমাপ নয়। আকাশের কোনো অংশের ক্ষেত্রফল পরিমাপ করতে বর্গ ডিগ্রি ব্যবহার করা হয়।
ইউক্লিড টেলিস্কোপ মহাকাশে পাঠানো হয়েছে ২০২৩ সালে। মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় ত্রিমাত্রিক মানচিত্র তৈরির জন্যই এই টেলিস্কোপ মহাকাশে পাঠানো হয়েছে। এটি দৃশ্যমান এবং নিয়ার-ইনফ্রারেড আলো পর্যবেক্ষণ করে মহাকাশ পর্যবেক্ষণ করে। ছয় বছর মেয়াদী এই মিশনে টেলিস্কোপটি দুভাবে আকাশ পর্যবেক্ষণ করবে। এক, বিস্তৃত জরিপ করবে, যেখানে আকাশের ১৪ হাজার বর্গ ডিগ্রি অঞ্চল জরিপ করা হবে। দুই, গভীর জরিপ করবে, যেখানে তিনটি ছোট অঞ্চলের মোট ৬৩ বর্গ ডিগ্রি আকাশ নিয়ে আরও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করবে।
এক বর্গ ডিগ্রি হলো আকাশের একটি অংশের পরিমাপের একক। এটি কোনো বস্তুর দৈর্ঘ্য বা প্রস্থের মতো সাধারণ পরিমাপ নয়। আকাশের কোনো অংশের ক্ষেত্রফল পরিমাপ করতে বর্গ ডিগ্রি ব্যবহার করা হয়। ধরুন, আপনি আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন। হাতের আঙ্গুলগুলো সামনের দিকে ধরলেন। কনিষ্ঠ আঙুলটা আকাশের যে অংশ ঢেকে রেখেছে, সেটুকুর আয়তন এক বর্গ ডিগ্রি। পূর্ণিমার চাঁদ আকাশের মাত্র ০.৫ বর্গ ডিগ্রি জায়গা দখল করে। অর্থাৎ, আকাশে ২টি পূর্ণিমার চাঁদ থাকলে মাত্র এক বর্গ ডিগ্রি পূর্ণ হতো।
যাই হোক, ইউক্লিড টেলিস্কোপের এই গভীর ক্ষেত্রগুলো পর্যবেক্ষণ বিজ্ঞানীদের মহাবিশ্বের রহস্য উদঘাটনে সাহায্য করবে। বিশেষ করে, ডার্ক ম্যাটার এবং ডার্ক এনার্জি সম্পর্কে নতুন তথ্য পাওয়া যাবে। এতে হয়তো গ্যালাক্সিগুলোর গঠন ও বিবর্তন সম্পর্কে জানা যাবে আরও ভালোভাবে। ধারণা করা হয়, মহাবিশ্বের ৯৫ শতাংশই এই ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জি দিয়ে তৈরি।
ইউক্লিড টেলিস্কোপ মহাকাশে পাঠানো হয়েছে ২০২৩ সালে। মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় ত্রিমাত্রিক মানচিত্র তৈরির জন্যই এই টেলিস্কোপ মহাকাশে পাঠানো হয়েছে। এটি দৃশ্যমান এবং নিয়ার-ইনফ্রারেড আলো পর্যবেক্ষণ করে মহাকাশ পর্যবেক্ষণ করে।
ইউক্লিড টেলিস্কোপ শুধু গ্যালাক্সি পর্যবেক্ষণ করেই থেমে নেই। ডার্ক ম্যাটারের প্রভাব বোঝাও এর অন্যতম লক্ষ্য। এটি গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিং পর্যবেক্ষণ করতে পারে। যখন সাধারণ পদার্থ এবং ডার্ক ম্যাটার গ্যালাক্সির চারপাশের স্থানকাল বাঁকিয়ে দেয়, তখন আলোর চলা পথও বেঁকে যায়। এই প্রভাব পরিমাপ করে বিজ্ঞানীরা ডার্ক ম্যাটারের অদৃশ্য প্রভাব সম্পর্কে ধারণা পেতে পারেন।
ইউক্লিড টেলিস্কোপের পাঠানো ডেটা বিশ্লেষণ করে এখন পর্যন্ত ৫০০টি গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সের সম্ভাব্য উদাহরণ পাওয়া গেছে। মিশন শেষে ১ লাখেরও বেশি গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সের ঘটনা শনাক্ত করবে এটি। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে, ইউক্লিড টেলিস্কোপ একটি ‘আইনস্টাইন রিং’ খুঁজে পেয়েছিল, যা গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিংয়ের কারণে ঘটে। পৃথিবী থেকে প্রায় ৫৯০ মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে NGC 6505 গ্যালাক্সির চারপাশে এমনই একটি উজ্জ্বল রিং শনাক্ত করেছিল ইউক্লিড। বিস্তারিত জানতে পড়ুন: টেলিস্কোপের চোখে ধরা পড়ল বিরল ‘আইনস্টাইন রিং’
ইউক্লিড টেলিস্কোপের মিশন চলবে ২০৩০ সাল পর্যন্ত। তবে এটি ইতিমধ্যেই মহাকাশের বিশালতা সম্পর্কে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে। মহাকাশের তিনটি গভীর অঞ্চলের মানচিত্র তৈরির মাধ্যমে ডার্ক ম্যাটার এবং ডার্ক এনার্জির রহস্যের জট উন্মোচন করতে পারে ইউক্লিড টেলিস্কোপ!