মহাকাশ
রহস্যময় মহাকর্ষ বল
মহাকর্ষ আসলে কী? মহাবিশ্বের চারটি মৌলিক বলের একটি এটি। কিন্তু এর কাজকর্ম বড় অদ্ভুত। সব কটি বলের বাহককণা রয়েছে, কিন্তু এর কোনো কণা আজও পাওয়া যায়নি। আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা একে বেশ সফলভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে, তবু অব্যাখ্যায়িত রয়ে যায় দূরবর্তী তারাদের চলন। মনে হয়, লুকিয়ে আছে আরও অনেক অধরা ভর—ডার্ক ম্যাটার। এসব রহস্যের সমাধান কী?
প্রকৃতির সব প্রক্রিয়ার পেছনে চারটি মৌলিক বল কাজ করে—মাধ্যাকর্ষণ বা মহাকর্ষ, তড়িৎ-চুম্বকীয়, সবল ও দুর্বল মিথস্ক্রিয়া। দুটি প্রোটনকে খুব কাছাকাছি রাখলে, ১০-১৫ মিটার (এক ফেমটোমিটার) দূরত্বে তাদের মধ্যে তিনটি বল কাজ করবে—মাধ্যাকর্ষণ, তড়িৎ-চুম্বকীয় ও সবল বল। প্রোটনের ভর থাকার কারণে তাদের মধ্যে মাধ্যাকর্ষণ বল কাজ করবে, চার্জ বা আধান থাকার ফলে তড়িৎ-চুম্বকীয় বিকর্ষণ হবে তাদের মধ্যে এবং প্রোটনের মধ্যকার কোয়ার্কের ‘রং’ বা ‘বর্ণ’ আধানের জন্য তাদের মধ্যে নিউক্লীয় সবল আকর্ষণ থাকবে। নিউক্লীয় সবল মিথস্ক্রিয়া এই দূরত্বে তড়িৎ-চুম্বকীয় বল থেকে ১০০ গুণ বেশি শক্তিশালী। তাই দুটি প্রোটনকে এটি তড়িৎ-চুম্বকীয় বিকর্ষণ কাটিয়ে একসঙ্গে বেঁধে রাখতে পারে। অন্যদিকে তড়িৎ-চুম্বকীয় বল মাধ্যাকর্ষণ থেকে ১০৩৬ গুণ বেশি শক্তিশালী। কাজেই এই প্রক্রিয়ায় মাধ্যাকর্ষণের কোনো ভূমিকাই নেই বলতে হবে।
কিন্তু নিউক্লীয় সবল আকর্ষণ ২.৫ ফেমটোমিটার থেকে বেশি দূরে তেমন কাজ করে না। বিজ্ঞানীরা এখনো প্রোটনের সঠিক আকার বের করার জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। তাঁদের বর্তমান গবেষণা বলছে, প্রোটনের ব্যাস হলো ০.৮৭ ফেমটোমিটার। এই হিসাবে একটি হিলিয়াম নিউক্লিয়াসের ব্যাস হলো ১.৬৮ ফেমটোমিটার, ইউরেনিয়ামের ১১.৭ ফেমটোমিটার। বোঝাই যাচ্ছে, ইউরেনিয়াম নিউক্লিয়াসের বড় আকারজুড়ে সবল বল কাজ করতে পারে না। সেখানে তড়িৎ-চুম্বকীয় বিকর্ষণ কাজ করবে। ফলে ইউরেনিয়ামের নিউক্লিয়াস তেজস্ক্রিয় হবে এবং আলফা কণা বিকিরণের মাধ্যমে ছোট হতে থাকবে।
ছোট দূরত্বে মাধ্যাকর্ষণ শক্তিশালী না হলে কী হবে, বড় দূরত্বের বেলায় মাধ্যাকর্ষণই রাজা। এর কারণ মূলত দুটি। মাধ্যাকর্ষণ বলের আকর্ষণ অসীম পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। কারণ, ঋণাত্মক বা নেগেটিভ ভর বলে কিছু নেই। অন্যদিকে ঋণাত্মক আধান বা চার্জ থাকার ফলে তড়িৎ-চুম্বকীয় বলের প্রভাব অসীম পর্যন্ত বিস্তৃত হলেও সেটির পজিটিভ ও নেগেটিভ চার্জ একে অপরের আধানকে শূন্য করে দেয়। ফলে তড়িৎ-চুম্বকীয় বল শক্তিশালী হলেও এর প্রভাব দূরত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খুব দ্রুতই কমে যায়। দুটি সমমানের তড়িৎ-আধান একে অপরের কাছাকাছি রাখলে আমরা তাকে তড়িৎ দ্বিমেরু বা ডাইপোল বলি। এ দুটি আধান একে অন্যের প্রভাব খর্ব করে এবং তাদের থেকে দূরে তড়িৎক্ষেত্র বিপরীত বর্গের (1/r2) চেয়ে আরও দ্রুত, বিপরীত তৃতীয় শক্তি (1/r3) হিসেবে কমতে থাকে। আবার দুটি ধনাত্মক ও দুটি ঋণাত্মক আধান মিলে তৈরি করে তড়িৎ চতুর্মেরু বা কোয়াড্রুপোল। সেটার ক্ষেত্র আরও তাড়াতাড়ি কমে যায়—বিপরীত চতুর্থ শক্তি হিসেবে (1/r4)। বোঝাই যাচ্ছে, আধানের সংখ্যা যত বাড়বে, তড়িৎক্ষেত্রও তত দ্রুত কমতে থাকবে। আমাদের শরীর বা যেকোনো বস্তু পরমাণু দিয়ে গঠিত, যাতে অনেক সমানসংখ্যক পজিটিভ ও নেগেটিভ চার্জ বিদ্যমান। তাই তাদের প্রভাবক্ষেত্র খুবই অল্প দূরত্বের—মাত্র ১০-৯ মিটার বা এক ন্যানোমিটার দূরত্ব পর্যন্ত। এ কারণে মাধ্যাকর্ষণ বল মৌলিক পর্যায়ে দুর্বল হলেও সামগ্রিকভাবে সবচেয়ে শক্তিশালী।
কিন্তু মাধ্যাকর্ষণ মিথস্ক্রিয়াকে বোঝা সহজ নয়। অন্য তিনটি বলকে কোয়ান্টাম তত্ত্বের প্রেক্ষাপটে ব্যাখ্যা করা গেলেও মহাকর্ষকে সেই আঙ্গিকে এখনো বিশ্লেষণ করা সম্ভব হয়নি। আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতাকে ব্যবহার করে অনেক সময় বলা হয় যে মাধ্যাকর্ষণ কোনো বল নয়, বরং স্থান-কালের (স্পেস-টাইম) বক্রতার জন্যই এর আবির্ভাব। সমনীতি (Principle of equivalence) বলে, জড় ভর ও মহাকর্ষীয় ভর সমান। একইভাবে বলা যায়, পৃথিবীর বুকে মাধ্যাকর্ষণ বলের জন্য আমরা যে আকর্ষণ অনুভব করি (যাকে ওজন বলা যায়), তা গ্রহ-নক্ষত্র থেকে বহুদূরে প্রতি বর্গসেকেন্ডে ৯.৮ মিটার ত্বরাণ্বিত মহাকাশযানে বসে অনুভব করা সম্ভব। সেই ত্বরাণ্বিত মহাকাশযানের এক পাশ থেকে আলো বিকিরণ করলে তা অন্য পাশে যেতে যেতে মহাকাশযান বেশ কিছুটা সরে যাবে। মহাকাশচারীর মনে হবে, আলোর পথ বেঁকে গেছে। আইনস্টাইন তখন সমনীতি প্রয়োগ করে বললেন, ত্বরান্বিত মহাকাশযানের জন্য যা সত্য, মাধ্যাকর্ষণ ক্ষেত্রের জন্যও তা সত্য, পৃথিবীর বুকেও আলোর পথ বাঁকবে। এই আলো দেশ-কাল বা স্থান-কালের একটি ভূমিতিক বক্ররেখা (Geodesic) অনুসরণ করবে। আর এই বক্রতার জন্য দায়ী শুধু স্থানীয় ভরই নয়, বরং শক্তি-ভরবেগ টেনসর; অর্থাৎ ওই স্থানের ভর, ভরের গতিবেগ, আলোর পরিমাণ—এ রকম সব। আইনস্টাইনের এই তত্ত্বকে বিখ্যাত পদার্থবিদ আর্চিবাল্ড হুইলার এভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন, বস্তু স্থান-কালকে বলবে কীভাব বাঁকবে, আর স্থান-কাল বস্তুকে বলবে কীভাবে সে সরবে।
বস্তুর সরণকে যদি শুধু ভূমিতিক বক্ররেখা বা জিওডেসিক দিয়েই ব্যাখ্যা করা যায়, তবে মাধ্যাকর্ষণকে একটি ভিন্ন বল না–ও বলা যেতে পারে। এখানে সমস্যা হলো, আইনস্টানের শক্তি-ভরবেগ টেনসর ঠিক কী প্রক্রিয়ায় স্থান-কালের বক্রতাকে সৃষ্টি করে, তা আমরা জানি না। আইনস্টাইন নিজে তাঁর আপেক্ষিকতার সমীকরণকে ‘Phenomenological’ বা আপাতদৃষ্টে একটি ঘটনাকে ব্যাখ্যা করার উপায় বলে মনে করতেন। ১৯৩৬ সালে তিনি লিখেছিলেন, ‘সাধারণ আপেক্ষিকতা—যত দূর আমাদের মনে হয়—নভোমণ্ডলের বলবিদ্যার অভিজ্ঞতাকে প্রতিনিধিত্ব করার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু এটা একটা দালানের মতো, যার একটা অংশ শৌখিন মার্বেল দিয়ে গঠিত (সমীকরণের বাঁ দিক), কিন্তু অন্য অংশটি (সমীকরণের ডান দিক) নিম্নমানের কাঠ দিয়ে তৈরি। [এটি] বস্তুর দৃশ্যমান [চলনের] প্রতিনিধিত্বকারী, যে কিনা শুধু একটি বস্তুর সত্যিকারের বৈশিষ্ট্যের একটি অসম্পূর্ণ প্রকাশ।’ আইনস্টাইনের সমীকরণের বাঁ দিকটি হলো স্থান-কালের জ্যামিতিক বক্রতা আর ডান দিকটি হলো শক্তি-ভরবেগ টেনসর। এই টেনসর ঠিক কীভাবে স্থান-কালের সঙ্গে কার্যকারণ সূত্রে গ্রন্থিত, সেটা আইনস্টাইনকে ভাবিয়েছিল (সে জন্যই তিনি এটিকে নিম্নমানের কাঠ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন)।
কোয়ান্টাম মহাকর্ষ (Quantum Gravity) তত্ত্ব এই প্রপঞ্চ থেকে উদ্ধারের উপায় হতে পারে। সেখানে গ্র্যাভিটন নামে একটি ভরহীন ও আধানহীন কণার কথা ভাবা হচ্ছে, যা কিনা বস্তুগুলোর মধ্যে মহাকর্ষ বলের বাহক হতে পারে। এর কোয়ান্টাম স্পিন হবে ২। কারণ, আপেক্ষিকতার শক্তি-ভরবেগ টেনসরের অর্ডার হলো ২। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে তড়িৎ-চুম্বকীয় মিথস্ক্রিয়ার বাহক হলো ফোটন; আর ফোটনের স্পিন হলো ১। কারণ, আপেক্ষিকতা তত্ত্বে তড়িৎ-চুম্বকীয় ক্ষেত্রের উৎস হলো ‘চার-তড়িৎ’ নামের ১-অর্ডারের একটি টেনসর। দুঃখের বিষয়, বস্তুর মধ্যে গ্র্যাভিটন দিয়ে মিথস্ক্রিয়া ব্যাখ্যা করতে গেলে বিভিন্ন ফলাফল ‘অসীম’ হয়ে যায়, যা গ্রহণযোগ্য নয়। তাত্ত্বিকেরা এসব ক্ষেত্রে ফাইনম্যান ডায়াগ্রাম নামে একটি পদ্ধতি অনুসরণ করেন। ৭০ বছর আগে তড়িৎ-চুম্বকীয় ক্ষেত্রের জন্য তাঁরা একই বাধার সম্মুখীন হন, কিন্তু সেটিতে ‘Renormalization’ নামে একটি কৌশল ব্যবহার করে ‘অসীমের’ হাত থেকে মুক্ত হন।
কৃষ্ণগহ্বরগুলোর সংঘর্ষ থেকে মাধ্যাকর্ষণ তরঙ্গ আবিষ্কার করার পরও আমরা মাধ্যাকর্ষণ বলটিকে এখনো পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারিনি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তমোবস্তু (বা গুপ্তবস্তু) বা ডার্ক ম্যাটারের ধাঁধা। আমাদের গ্যালাক্সির কেন্দ্র থেকে দূরের তারাদের গতি যে নিউটনীয় বা আইনস্টাইনীয় মহাকর্ষ মানছে না, কিংবা বহুদূরের গ্যালাক্সির আলো বাঁকা পথে আমাদের কাছে পৌঁছাচ্ছে, সেই বক্রতাকে আমরা বর্তমান মহাকর্ষের জ্ঞান দিয়ে বুঝতে পারছি না। তাই আমরা ধরে নিয়েছি, অদৃশ্য ডার্ক ম্যাটার আছে, যারা কিনা এই ব্যতিক্রমগুলোর জন্য দায়ী। কিন্তু গুপ্তবস্তু যদি কণা হয়, আমাদের ৪০ বছরের পর্যবেক্ষণ তা ডিটেক্ট করতে ব্যর্থ হয়েছে। এমন কী হতে পারে যে তমোবস্তু বা ডার্ক ম্যাটার বলে আসলে কিছু নেই, বরং নিউটনীয় বা আইনস্টাইনীয় মহাকর্ষকে কিছুটা বদলাতে হতে পারে? কিন্তু সাধারণ আপেক্ষিকতা একটি খুবই সফল তত্ত্ব, তাকে মেনেই তমোবস্তুকে ব্যাখ্যা করতে হবে। কিছু তাত্ত্বিক এই ধারায় কাজ করছেন, তাঁরা এখনো পুরোপুরি সফল হতে পারেননি। হয়তো সময়ের সঙ্গে তমোবস্তুর চরিত্র পাল্টায়, এমনটাও তাঁরা ভাবছেন।
সাধারণ আপেক্ষিকতায় স্থান-কালের চাদরের সঙ্গে মাধ্যাকর্ষণ ক্ষেত্রের কোনো পার্থক্য নেই। সেই হিসাবে এটির অস্তিত্ব প্রাথমিক বলা চলে। কিন্তু মাধ্যাকর্ষণ বা মহাকর্ষ এখনো আমাদের কাছে ধাঁধা। এই বল সৃষ্টি করতে পারে কৃষ্ণগহ্বরের, যেখানে অন্য তিনটি বলের ভূমিকা নেই। কিন্তু সেই কৃষ্ণগহ্বরের ভেতরে কী হতে পারে, আমরা জানি না। আমাদের আশা, কোয়ান্টাম মহাকর্ষ তত্ত্ব বা সে রকম একটি মৌলিক তত্ত্ব কোনো দিন এই মিথস্ক্রিয়াকে বোধগম্য করবে।