টেলিস্কোপের চোখে ধরা পড়ল বিরল ‘আইনস্টাইন রিং’

গ্যালাক্সি এনজিসি ৬৫০৫ কে ঘিরে নিখুঁত আইনস্টাইন রিংছবি: নাসা

জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা প্রতিনিয়ত মহাবিশ্বের অপার রহস্য উন্মোচনে কাজ করছেন। এরই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি তাঁরা মহাকাশে একটি অত্যন্ত বিরল ও সুন্দর দৃশ্যের দেখা পেয়েছেন। পৃথিবী থেকে ৫৯০ মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত একটি গ্যালাক্সির চারপাশে আলোর নিখুঁত বলয় বা রিংয়ের দেখা পেয়েছেন। জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভাষায় এই বিরল ঘটনার নাম ‘আইনস্টাইন রিং’। এই সম্পর্কিত গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক জার্নাল অ্যাস্ট্রোনমি ও অস্ট্রোফিজিক্স-এ।

কাছ থেকে আইনস্টাইন রিং
ছবি: নাসা

ইউরোপীয় স্পেস এজেন্সি বা ইএসএ-এর ‘ইউক্লিড স্পেস টেলিস্কোপের’ সংগৃহীত ডেটা থেকে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এই বিরল আইনস্টাইন বলয়ের দেখা পেয়েছেন। এনজিসি ৬৫০৫ (NGC 6505) নামে একটি গ্যালাক্সির চারপাশে আলোর এই নিখুঁত বলয় দেখা গেছে। এর আগেও এ ধরনের রিং দেখা গেলেও এত নিখুঁত আলোর বলয় কখনও দেখা যায়নি। উপরের ছবির সামনে গ্যালাক্সির চারপাশে যে বলয়টি দেখা যাচ্ছে, তা আসলে আরও দূরের উজ্জ্বল এক গ্যালাক্সির আলো থেকে তৈরি। অন্যদিকে এর পেছনের দ্বিতীয় গ্যালাক্সিটি ৪.৪২ বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। দ্বিতীয় গ্যালাক্সিটি আগে কখনও দেখা যায়নি। এজন্য গ্যালাক্সিটির এখনো কোনো নাম দেওয়া হয়নি।

আরও পড়ুন
২০২৩ সালে ইউক্লিড উৎক্ষেপণ করা হয়। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে এটি মহাকাশের ত্রিমাত্রিক মানচিত্র তৈরি জন্য কাজ শুরু করে। এছাড়াও ইউক্লিড মহাকর্ষীয় লেন্স খোঁজা এবং অদৃশ্য ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জি সম্পর্কে জানতে মহাকাশে পাঠানো হয়েছে।

প্রশ্ন আসতে পারে, আইনস্টাইন রিং বা বলয় কেন দেখা যায়?

সংক্ষেপে বলতে গেলে, দূরের কোনো গ্যালাক্সি বা নক্ষত্রের আলো পৃথিবীতে আসার পথে বিশাল কোনো মহাজাগতিক বস্তু সামনে পড়লে, আলোটা সোজা পথে না গিয়ে বস্তুটার পাশ দিয়ে বেঁকে যায়। কিন্তু আলোটা দেখে মনে হয় যেন সেটা ভিন্ন কোনো স্থান থেকে আসছে। এমনটি ঘটে স্থান-কালের বক্রতার কারণে। আলোর গতিপথ এভাবে বেঁকে যাওয়ার এ ঘটনাকে বলা হয় মহাকর্ষীয় লেন্সিং।  

যেমন কোনো উজ্জ্বল বস্তু ব্ল্যাকহোলের ঠিক পেছনে থাকলে, আলো এমনভাবে আমাদের চোখে পৌঁছায় যেন তা কোনো বিকৃত লেন্সের মধ্য দিয়ে আসছে। এই ঘটনাকেই মহাকর্ষীয় বা গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিং বলা হয়। এই বিরল দৃশ্যটির নামকরণ করা হয়েছে বিখ্যাত গণিতবিদ ও পদার্থবিদ আলবার্ট আইনস্টাইনের নামে। কারণ, মহাকর্ষীয় লেন্সিংয়ের ধারণাটি আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতার তত্ত্ব দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে।  

ইউক্লিড টেলিস্কোপের মহাকাশ পর্যবেক্ষণ
ছবি: নাসা

এরকম ক্ষেত্রে আলোর উৎস, লেন্স ও পর্যবেক্ষক যদি নিখুঁতভাবে একই সরলরেখায় থাকে, তাহলে আলো একটি বলয় বা রিংয়ের মতো দেখায়। গ্যালাক্সির এই বাঁকানো আলো একটি পূর্ণ বৃত্তের আকার নিলে তাকে আইনস্টাইন রিং বা বলয় বলে। এককথায়, বহুদূরের গ্যালাক্সি থেকে আসা আলো মহাকর্ষীয় লেন্সিংয়ের কারণে বেঁকে যায় এবং সামনে থাকা অন্য বস্তুর চারপাশে উজ্জ্বল বলয় তৈরি করলে, তাকে আইনস্টাইন রিং বলে। আর মহাকর্ষীয় লেন্সিং হলো ভারী বস্তুর প্রভাবে বেঁকে যাওয়া স্থান-কালের ভেতর দিয়ে আলো যাওয়ার পথে বেঁকে যাওয়ার ঘটনা।

আরও পড়ুন
অন্যদিকে এর পেছনের দ্বিতীয় গ্যালাক্সিটি ৪.৪২ বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। দ্বিতীয় গ্যালাক্সিটি আগে কখনও দেখা যায়নি। এজন্য গ্যালাক্সিটির এখনো কোনো নাম দেওয়া হয়নি।

ইএসএ-এর গবেষকরা আইনস্টাইন রিংয়ের বিস্তারিত বিবরণসহ ইউক্লিডের নতুন তোলা ছবিগুলো বিশ্লেষণ করেছেন। এই বিরল ঘটনা সম্পর্কে আরও জানতে ও বুঝতে তাঁরা গ্যালাক্সিটি পর্যবেক্ষণও করছেন।

২০২৩ সালে ইউক্লিড উৎক্ষেপণ করা হয়। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে এটি মহাকাশের ত্রিমাত্রিক মানচিত্র তৈরি জন্য কাজ শুরু করে। এছাড়াও ইউক্লিড মহাকর্ষীয় লেন্স খোঁজা এবং অদৃশ্য ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জি সম্পর্কে জানতে মহাকাশে পাঠানো হয়েছে। আইনস্টাইনের রিংটিকে ইউক্লিড মিশনের প্রথম সাফল্য বলা যায়।

ইউরোপীয় স্পেস এজেন্সির টেলিস্কোপ ইউক্লিড
ছবি: উইকিমিডিয়া

গবেষকরা প্রস্তাব করেছেন, এই রিংটির নাম দেওয়া হোক ‘আলটিয়েরির লেন্স’। ইউরোপীয় স্পেস এজেন্সির জ্যোতির্বিজ্ঞানী ব্রুনো আলটিয়েরির নামে এমন নামকরণ। কারণ, ব্রুনো আলটিয়েরি ২০২৩ সালে ইউক্লিড টেলিস্কোপের ডেটা পরীক্ষার সময় এ বস্তুটি আবিষ্কার করেন।  

রিং সম্পর্কে ব্রুনো আলটিয়েরি বলেছেন, ‘প্রথম পর্যবেক্ষণেই আমি এটি দেখতে পাচ্ছিলাম, কিন্তু ইউক্লিড যখন আরও পর্যবেক্ষণ করল তখন আমরা একটি নিখুঁত আইনস্টাইন রিং দেখতে পাই। ব্যাপারটা সত্যিই অসাধারণ।’

লেখক: শিক্ষার্থী, ঢাকা কলেজ

সূত্র: সায়েন্স অ্যালার্ট, সিএনএন, দ্য গার্ডিয়ান, উইকিপিডিয়া ও বিজ্ঞানচিন্তা

আরও পড়ুন