আমাদের মহাবিশ্ব প্রসারমান। এই প্রসারণের হার ‘হাবল ধ্রুবক’ নামে পরিচিত। আজ থেকে প্রায় ১০০ বছর আগে প্রথম এই ধ্রুবকের মান নির্ধারণ করা হয়। তবে বেশ কয়েক বছর ধরে এ ধ্রুবকের মান নিয়ে বিতর্ক দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে আদি মহাবিশ্বের পটভূমি বিকিরণ থেকে হাবল ধ্রুবকের যে মান নির্ধারণ করা হয়েছে (৬৫ কিমি/সেকেন্ড/মেগাপারসেক), তার সঙ্গে বর্তমান মহাবিশ্বের হাবল ধ্রুবকের যে মান (৬৯ থেকে ৭৪ কিমি/সেকেন্ড/মেগাপারসেক)—এই দুটির মধ্যে বেশ পার্থক্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অথচ এই দুভাবে প্রাপ্ত হাবল ধ্রুবকের মান অভিন্ন হওয়ার কথা। কেননা মহাবিশ্ব একটাই। এ ছাড়া বিভিন্ন দূরত্ব পরিমাপক (পরে এ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে) থেকে প্রাপ্ত হাবল ধ্রুবকের মানের মধ্যেও দেখা যাচ্ছে পার্থক্য। এই পার্থক্য যদি আসলেই সত্য হয়, তাহলে মহাবিশ্বের যে মডেল আমরা এতদিন জেনে আসছি, তা পুনর্বিবেচনা করতে হবে। হাবল ধ্রুবকের মানের এই টানাপোড়েন বিশ্বতত্ত্ব গবেষণায় এক নতুন জটিলতা তৈরি করেছে, যার সমাধান এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
সমসাময়িক বিশ্বতত্ত্ব যে মডেলের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে, তা ল্যামডা-সিডিএম মডেল নামে পরিচিত। আমরা একে বিগ ব্যাং মডেল নামেও চিনি। এই মডেলের স্বার্থকতা তিনটি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। এক, মহাবিশ্বের প্রসারণ; দুই, মহাজাগতিক পটভূমি বিকিরণ এবং তিন, হালকা মৌলের প্রাচুর্যতা। এরপরেও বেশ কিছু বিষয় এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে। এর মধ্যে প্রধানতম হলো ডার্ক ম্যাটার এবং ডার্ক এনার্জি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হাবল ধ্রুবকের টানাপোড়েন।
প্রথমে আমরা হাবল ধ্রুবকের ইতিহাস নিয়ে আলাপ করি। আজ থেকে প্রায় ১০০ বছর আগে এডউইন হাবল দেখান, গ্যালাক্সিগুলো পরস্পরের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। তিনি আরও দেখান, যে গ্যালাক্সি যত দূরে, তার ছুটে চলার বেগ তত বেশি। দূরত্ব আর বেগের মধ্যে যে সম্পর্ক, তা এখন হাবল-লেমিত্রি নীতি নামে পরিচিত। আর এই সম্পর্কের যে সমানুপাতিক সূচক, তাকে বলা হয় হাবল ধ্রুবক।
এর আগে রুশ পদার্থবিদ আলেকজান্ডার ফ্রিডম্যান (১৯২২ সালে) এবং বেলজিয়ান পাদ্রী জর্জ লেমিত্রি (১৯২৭ সালে) আলাদা আলাদা ভাবে আইনস্টাইনের ক্ষেত্র সমীকরণ সমাধান করে দেখিয়েছিলেন, মহাবিশ্ব তথা স্থানকাল গতিশীল। জর্জ লেমিত্রি ১৯২৭ সালে হাবক ধ্রুবকের মান নির্ণয় করলেও এডউইন হাবলের ১৯২৯ সালে নির্ধারণ করা মান বেশি জনপ্রিয়তা পায়। হাবল যে মান নির্ধারণ করেছিলেন, তা ছিল ৫০০ কিমি/সেকেন্ড/মেগাপারসেক। এরপর আরও অনেকে হাবল ধ্রুবকের মান নির্ণয় করেন।
ইতিমধ্যে মহাবিশ্বের পটভূমি বিকিরণ বা কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশন (সিএমবি) শনাক্ত করা হয় যুক্তরাষ্ট্রের বেল গবেষণাগারের হর্ন এন্টেনা (আসলেই ওটা শিং আকারের ছিল) দিয়ে, ১৯৬৫ সালে, অনেকটা কাকতালীয়ভাবে। এ জন্য দুই মার্কিন পদার্থবিদ আর্নো পেনজিয়াস ও রবার্ট উইলসন নোবেল পুরস্কার পান। পরে পটভূমি বিকিরণের পুঙ্খানুপুঙ্খ মানচিত্র তৈরির জন্য মহাকাশে কয়েকটি স্যাটেলাইট পাঠানো হয়। এখানে বলা প্রয়োজন, পটভূমি বিকিরণ আমাদের মহাবিশ্বের একটি আদি নকশা। এর প্রতিচ্ছবি আমরা বর্তমান মহাবিশ্বের ব্যাপক কাঠামোর মধ্যে দেখতে পাই।
হাবল ধ্রুবক নির্ণয়ের জন্য দুটি তথ্য লাগে—দূরত্ব এবং বেগ। মহাবিশ্বে দূরত্ব মাপা হয় ধাপে ধাপে। একটা নির্দিষ্ট দূরত্ব পর্যন্ত একটা পদ্ধতি কাজ করে। এর পরে অন্য আরেকটা পদ্ধতি ব্যবহার করতে হয়। নতুন পদ্ধতিকে আগের পদ্ধতি দিয়ে ক্যালিব্রেট করে নিতে হয় এ জন্য। ক্যালিব্রেট করা মানে, দুটোর মধ্যে একধরনের সমন্বয় করে নেওয়া। এটাই দূরত্বের ধাপ। এই দূরত্ব মাপার মধ্য দিয়েই আমরা মহাবিশ্বের স্বরূপ জানতে পারি। যেকোনো গ্যালাক্সির দূরত্ব নির্ভর করে আমরা কোন মহাবিশ্বে আছি, তার গঠন কেমন—এসবের ওপর। যত দূর পর্যন্ত আমরা দূরত্ব মাপতে পারব, তত নিখুঁতভাবে মহাবিশ্বের স্বরূপ জানা যাবে। আরেকভাবে বললে, মহাবিশ্বের প্রসারণের ইতিহাস আমরা যত দূর পর্যন্ত জানতে পারব, তত সঠিকভাবে মহাবিশ্বের প্রকৃত কাঠামো জানা যাবে। দূরত্ব পরিমাপ একটু কষ্টসাধ্য হলেও গতিবেগ পরিমাপ করা যায় অনেকটা সহজেই, গ্যালাক্সিদের বর্ণালির লোহিত সরণ থেকে।
প্রথমদিকে হাবল ধ্রুবকের মান নির্ণয় করা হতো সেফিড ভেরিয়েবল তারা ব্যবহার করে। আব্দুল জব্বার তাঁর তারা পরিচিতি বইয়ে বাংলায় এর নাম দিয়েছেন ‘শেফালী বিষম’ তারা। এই তারাগুলোর আপাতঃ উজ্জ্বলতার পর্যায়ক্রমিক তারতম্যের সঙ্গে তাদের সর্বোচ্চ প্রকৃত উজ্জ্বলতার একটা সম্পর্ক আছে। এটা আবিষ্কার করেন হেনরিয়েটা লেভিট। দূরত্ব মাপার উপায় হিসেবে শেফালী বিষম তারা ব্যবহারের আগে প্যারালাক্স পদ্ধতিতে তাদের ক্যালিব্রেট করা হয়। শেফালী বিষম তারা দিয়ে নিকটবর্তী গ্যালাক্সিদের দূরত্ব সহজেই মাপা যায়। আরও একধরনের তারা আছে, যারা টিআরজিবি (টিপ অব দ্য রেড জায়ান্ট ব্রাঞ্চ) নামে পরিচিত। এরা মূলত একধরনের লোহিত দানব তারা, যাদের একটি নির্দিষ্ট প্রকৃত উজ্জ্বলতা আছে।
কিন্তু অনেক দূরের গ্যালাক্সিগুলোতে শেফালী বিষম তারা বা টিআরজিবি খুঁজে পাওয়া যায় না। সৌভাগ্যক্রমে প্রকৃতিতে আরেকটি উপায় আছে, যা দিয়ে বহু দূরের সেসব গ্যালাক্সির দূরত্ব নির্ধারণ করা যায়। ‘টাইপ ওয়ান-এ সুপারনোভা’ নামে একধরনের বিস্ফোরণ আছে, যেখানে একটি তারা ধ্বংস হওয়ার সময় প্রচুর উজ্জ্বলতা ছড়ায়। এদের উজ্জ্বলতা তাদের হোস্ট গ্যালাক্সির (অর্থাৎ তারা যে গ্যালাক্সিতে রয়েছে) চেয়ে হাজার গুণ বেশি হয়। ফলে মহাবিশ্বের অনেক দূর অঞ্চল থেকেও এদের শনাক্ত করা যায়। এই বিস্ফোরণের উজ্জ্বলতা সুষম, অর্থাৎ সব টাইপ ওয়ান-এ সুপারনোভা বিস্ফোরণের সময় একই উজ্জ্বলতা দেখায়। ফলে এগুলোকে স্ট্যান্ডার্ড ক্যান্ডেল বা আদর্শ বাতি হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
দূরত্ব নির্ণয় তথা হাবল ধ্রুবকের মান নির্ণয়ের জন্য দূরবর্তী এসব সুপারনোভা ব্যবহারের শর্ত হলো, প্রথমে অপেক্ষাকৃত কাছের কিছু দূরত্ব পরিমাপক দিয়ে এদের দূরত্ব হিসাব করে নেওয়া লাগে। আর সে জন্য আছে শেফালী বিষম তারা এবং টিআরজিবি। সাধারণত এই দুই দূরত্ব পরিমাপক আলাদা আলাদাভাবে ব্যবহার করা হয় দূরবর্তী সুপারনোভার দূরত্ব নির্ধারণের জন্য।
দুটি প্রধান দল আছে। একটি আড্যাম রিসের তত্ত্বাবধানে, যারা শেফালী বিষম তারা ব্যবহার করে; আরেকটি দল রয়েছে ওয়েন্ডি ফ্রিডম্যানের তত্ত্বাবধানে, যারা টিআরজিবি তারা ব্যবহার করে। এই দুই দলের পক্ষ থেকে হাবল ধ্রুবকের সর্বশেষ যে মান নির্ণয় করা হয়, তা যথাক্রমে ৭৪ কিমি/সেকেন্ড/মেগাপারসেক এবং ৬৯ কিমি/সেকেন্ড/মেগাপারসেক, যা বেশ অসঙ্গতিপূর্ণ।
দৃশ্যমান আলোয় প্রাপ্ত হাবল ধ্রুবকের মান যদিও হাবল ধ্রুবকের টানাপোড়েন একটু কমিয়েছে, তবু পুরোপরি সমাধান মেলেনি।
আমরা সম্প্রতি এই দুই ভিন্ন ভিন্ন দূরত্ব পরিমাপক একসঙ্গে ব্যবহার করি, যা ইতিপূর্বে করা হয়নি। এর ফলে এই দুই ধরনের দূরত্ব পরিমাপকের মধ্যকার অন্তর্নিহিত পার্থক্য বা অসঙ্গতি খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। এ জন্য আমরা কার্নেগী সুপারনোভা প্রকল্প থেকে সংগৃহীত উপাত্ত ব্যবহার করি। দুই ধাপে, ২০০৪ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে এই প্রকল্প থেকে তিন শতাধিক টাইপ ওয়ান-এ সুপারনোভা পর্যবেক্ষণ করা হয় নয়টি ভিন্ন ভিন্ন ফিল্টারে। সুপারনোভাদের পর্যবেক্ষণ করা হয় দৃশ্যমান আর অবলোহিত আলোয়। এসব উপাত্ত বিশ্লেষণ করে আমরা হাবল ধ্রুবকের যে সামগ্রিক মান নির্ণয় করি, তা হলো ৭১.৭৬ কিমি/সেকেন্ড/মেগাপারসেক (দৃশ্যমান আলোয়) এবং ৭৩.২২ কিমি/সেকেন্ড/মেগাপারসেক (অবলোহিত আলোয়)। এই হিসেবগুলোতে হিসেবের অনিশ্চয়তা প্রায় ১ শতাংশ। দৃশ্যমান আলোয় প্রাপ্ত হাবল ধ্রুবকের মান যদিও হাবল ধ্রুবকের টানাপোড়েন একটু কমিয়েছে, তবু পুরোপরি সমাধান মেলেনি। এই টানাপোড়েনের কোনো সমাধান এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
হাবল ধ্রুবকের মান কেন ভিন্নতা দেখাচ্ছে, বিষয়টি বোধগম্য নয়। হতে পারে আমাদের গণনা পদ্ধতিতে অথবা উপাত্তে কোনো অজানা ভুল থাকতে পারে। আর যদি তা না হয়, তাহলে হয়তো আমরা মহাবিশ্বের নতুন কোনো বৈশিষ্ট্য উম্মোচন করতে যাচ্ছি। সে ক্ষেত্রে মহাবিশ্বের যে মডেল আমাদের কাছে আছে, তা পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন হতে পারে। অতি সম্প্রতি ডার্ক এনার্জি স্পেকট্রোস্কোপিক সার্ভে তাদের প্রাথমিক ফলাফল প্রকাশ করেছে।
আগামীতে রুবিন এবং ইউক্লিড মানমন্দির থেকে অনেক নতুন সুপারনোভা আবিষ্কৃত হবে। ফলে উপাত্তের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে টাইপ ওয়ান-এ সুপারনোভাদের বৈশিষ্ট্য আরও নিখুঁতভাবে জানা যাবে। গবেষণাপত্রটির লিংক এখানে দেওয়া হলো: https://iopscience.iop.org/article/10.3847/1538-4357/ad3e63।