মহাকাশে থাকলে নভোচারীদের শরীরে কী কী প্রভাব পড়ে

মহাকাশ ভ্রমণ! পৃথিবীকে দূর থেকে দেখা এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। অনেকেই এই স্বপ্ন দেখেন। তাঁর মধ্যে গুটিকয়েক মানুষের স্বপ্ন পূরণ হয়। কিন্তু সমস্যা একটাই—আমাদের দেহ পৃথিবীর মহাকর্ষের (গ্র্যাভিটি) জন্য মানানসই। কিন্তু মহাকাশে গিয়ে নভোচারীরা ওজনহীন অনুভব করেন।

অনেকের ধারণা, এর কারণ মহাকাশে কোনো মহাকর্ষ নেই। তাই এরকম ওজনহীন হয়ে শূন্যে ভাসেন নভোচারীরা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, মহাকাশে মহাকর্ষ থাকে ঠিকই, কিন্তু তার পরিমাণ পৃথিবীর প্রায় ৯০ শতাংশ। একে বলা হয় মাইক্রোগ্র্যাভিটি। আসলে নভোচারীদের শূন্য ভাসার কারণ নভোযানসহ নভোচারীরা পৃথিবীর দিকে মুক্তভাবে অবিরাম পড়ে যাচ্ছেন। সেইসঙ্গে উচ্চ বেগে একদিকেও সরে যাচ্ছেন।

আরও পড়ুন

যাই হোক, মহাকাশের এরকম ওজনহীন পরিবেশে (মাইক্রোগ্র্যাভিটি) দীর্ঘ সময় কাটালে শরীরে নানা পরিবর্তন আসে। সেগুলো কাটিয়ে স্বাভাবিক হয়ে উঠতে অনেক বছর লেগে যেতে পারে।

সম্প্রতি দুই মার্কিন নভোচারী সুনিতা উইলিয়ামস এবং ব্যারি উইলমোর ৯ মাস মহাকাশে কাটিয়ে পৃথিবীতে ফিরে এসেছেন। যদিও তাঁরা মাত্র ৮ দিনের জন্য গিয়েছিলেন মহাকাশে। কিন্তু আকস্মিকভাবে সেটি নয় মাসের দীর্ঘ যাত্রায় পরিণত হয়! এখন তাঁদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।

পৃথিবীতে আমাদের শরীর প্রতিনিয়ত মধ্যাকর্ষণের বিরুদ্ধে লড়াই করে। দাঁড়িয়ে থাকতেও পেশির ব্যবহার হয়। কিন্তু মহাকাশে তা প্রয়োজন নেই—সবকিছু প্রায় ওজনহীন! ফলে শরীর ধীরে ধীরে পেশির শক্তি হারাতে থাকে।

মহাকাশে দীর্ঘদিন কাটালে দেহের কিছু স্বাভাবিক পরিবর্তন হয়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, মানুষের দেহ পৃথিবীর মতো পরিবেশে বেঁচে থাকার জন্য তৈরি, কিন্তু মহাকাশ সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জায়গা। যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ওয়ালেসের অধ্যাপক ড্যামিয়েন বেইলি বলেন, ‘মহাকাশ হলো মানবজাতির জন্য সবচেয়ে চরম পরিবেশ। আমরা এর সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্য বিবর্তিত হইনি।’

তবে মহাকাশে প্রথম দিকে এই পরিবর্তনগুলো বেশ আনন্দদায়ক মনে হতে পারে। ব্রিটিশ নভোচারী টিম পিক ২০১৫ সালে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে ছিলেন। তিনি বলেন, ‘প্রথমদিকে মনে হয় যেন ছুটি কাটাচ্ছি। হৃদপিণ্ড কম পরিশ্রম করছে, পেশি ও হাড়ের ওপর চাপ নেই, আর পুরো শরীর একদম হালকা হয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে!’

কল্পনা করুন, আপনি দিনের পর দিন বিছানায় শুয়ে আছেন, কিন্তু কখনো উঠতে হচ্ছে না। মহাকাশের ওজনহীন পরিবেশ অনেকটা তেমনই। তবে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব মোটেও সুখকর নয়।

আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন

পৃথিবীতে আমাদের শরীর প্রতিনিয়ত মধ্যাকর্ষণের বিরুদ্ধে লড়াই করে। দাঁড়িয়ে থাকতেও পেশির ব্যবহার হয়। কিন্তু মহাকাশে তা প্রয়োজন নেই—সবকিছু প্রায় ওজনহীন! ফলে শরীর ধীরে ধীরে পেশির শক্তি হারাতে থাকে। ব্যবহার না করলে যে কোনো জিনিস নষ্ট হয়ে যায়, পেশির জন্য এ কথাটা একদম সত্যি। মহাকাশে থাকার সময় নভোচারীরা প্রতিদিন দুই ঘণ্টা ব্যায়াম করেন, যাতে তাঁদের শরীর স্বাভাবিক থাকে। ব্যায়ামের মধ্যে থাকে ট্রেডমিল, সাইকেলিং এবং ওজন তোলার মতো কার্যক্রম। তবু পৃথিবীতে ফিরে আসার পর তাঁদের পেশিশক্তি পুরোপুরি ফিট হতে কয়েক মাস লেগে যায়।

শুধু পেশিই নয়, হাড় এবং হৃদপিণ্ডও দুর্বল হয়ে যায়। মাধ্যাকর্ষণ না থাকলে হাড়ের ওপর চাপ পড়ে না, ফলে হাড় ধীরে ধীরে ভঙ্গুর ও দুর্বল হয়ে পড়ে। সাধারণত, শরীরের কোষ পুরোনো হাড়কে ভেঙে নতুন হাড় তৈরি করে। কিন্তু মহাকাশে এই প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটে। এ ব্যাপারে অধ্যাপক বেইলি বলেন, ‘প্রতি মাসে নভোচারীদের হাড় ও পেশি প্রায় ১ শতাংশ ক্ষয় হয়’।

তবে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয় হলো, পৃথিবীতে ফিরে আসার পর হাড় স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে বছরের পর বছর লেগে যায়। অনেকের শরীর পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ও না।

আরও পড়ুন
মহাকাশে ভ্রমণকে কি নিরাপদ যাত্রা বলা যায়? প্রশ্নটা এখন বিজ্ঞানীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, ভবিষ্যতে নভোচারীদের মঙ্গল গ্রহে পাঠানোর পরিকল্পনা চলছে। সেখানে যেতে আসতে সময় লাগবে প্রায় তিন বছর।

হৃদপিণ্ডের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে। পৃথিবীতে আমাদের হৃদপিণ্ডকে রক্ত মধ্যাকর্ষণের বিরুদ্ধে টেনে তুলতে হয়। কিন্তু মহাকাশে সেই পরিশ্রম করতে হয় না, ফলে হৃদপিণ্ডও দুর্বল হয়ে পড়ে।

এছাড়া, মহাকাশে শরীরের তরল পদার্থ ওপরের দিকে উঠে যায়। কারণ, মধ্যাকর্ষণ না থাকায় তা আর নিচের দিকে নামতে পারে না। ফলে মুখ ফোলা ফোলা দেখায়। কিন্তু এর চেয়েও ভয়ঙ্কর হলো, মস্তিষ্কে চাপ বেড়ে যায়। বদলে যায় চোখের গঠন। এমনকি দৃষ্টিশক্তিও দুর্বল হয়ে যেতে পারে! বিজ্ঞানীরা একে বলেন ‘স্পেসফ্লাইট-অ্যাসোসিয়েট নিউরো-অকুলার সিনড্রোম’। 

মার্কিন প্রতিষ্ঠান ভার্জিন গ্যালাক্টিক, ব্লু অরিজিনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান মহাকাশ নিয়ে কাজ করছে
রয়টার্স

মাঝেমধ্যে দেহের এই পরিবর্তন স্থায়ী হয়ে যেতে পারে। নভোচারীদের জন্য এটা বড় চ্যালেঞ্জ। নভোচারীরা যখন পৃথিবীতে ফেরেন, তখন শুধু বাহ্যিক পরিবর্তন নয়, দেহেও ভেতরেও পরিবর্তন দেখা যায়। শরীরের ভালো ব্যাকটেরিয়াগুলো বদলে যায়। ফলে নষ্ট হয়ে যায় ভারসাম্য রক্ষা করার ক্ষমতা। টিম পিক বলেন, ‘ফিরে আসার পর দুই-তিন দিন হাঁটা, দাঁড়িয়ে থাকা—সব কিছুই কষ্টকর। তখন মাথা ঘোরে, ভারসাম্য ঠিক থাকে না।’

মহাকাশে কোনো দিক-নির্দেশনা নেই, ওপর-নিচে বলে কিছু হয় না। ফলে পৃথিবীতে ফেরার পর দেহকে নতুন করে মধ্যাকর্ষণের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হয়।

তাহলে সুনিতা উইলিয়ামস এবং ব্যারি উইলমোরের জন্য কী অপেক্ষা করছে? তাঁরা আপাতত এখন বিশ্রামে আছেন। কিন্তু তাঁদের সামনে রয়েছে কঠোর পুনর্বাসন প্রক্রিয়া। তাঁদের পেশিশক্তি ঠিক হতে কয়েক মাস লেগে যাবে। হাড়ের ঘনত্ব আগের অবস্থায় ফিরতেও সময় লাগবে। এমনকি দেহের কিছু পরিবর্তন কখনোই আগের অবস্থায় ফিরবে না!

মাঝেমধ্যে দেহের এই পরিবর্তন স্থায়ী হয়ে যেতে পারে। নভোচারীদের জন্য এটা বড় চ্যালেঞ্জ। নভোচারীরা যখন পৃথিবীতে ফেরেন, তখন শুধু বাহ্যিক পরিবর্তন নয়, দেহেও ভেতরেও পরিবর্তন দেখা যায়।
আরও পড়ুন

এ ব্যাপারে ব্রিটিশ নভোচারী হেলেন শারম্যান বলেন, ‘হাড় ঠিক হতে কয়েক বছর লেগে যায়, কিন্তু নতুনভাবে গঠিত হাড় হয়তো কখনোই আগের মতো শক্তিশালী হবে না।’

বিশ্বের প্রথম মানব হিসেবে মহাকাশে হাঁটেন সোভিয়েত নভোচারী অ্যালেক্সি লিওনভ (প্রতীকী ছবি)
ছবি: এএফপি

তাহলে মহাকাশে ভ্রমণকে কি নিরাপদ যাত্রা বলা যায়? প্রশ্নটা এখন বিজ্ঞানীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, ভবিষ্যতে নভোচারীদের মঙ্গল গ্রহে পাঠানোর পরিকল্পনা চলছে। সেখানে যেতে আসতে সময় লাগবে প্রায় তিন বছর। এতদিন মহাকাশে থাকলে মানুষের শরীরের কী অবস্থা হবে? নাসার গবেষকরা এখন এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন। তাঁরা চেষ্টা করছেন নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করতে, যাতে নভোচারীদের শরীরে ক্ষতি কম হয়। 

সবমিলিয়ে, মহাকাশে ভ্রমণ অসাধারণ এক অভিজ্ঞতা। তবে এটি মানুষের শরীরের জন্য সহজ কিছু নয়। পেশি ও হাড়ের ক্ষতি, হৃদপিণ্ডের দুর্বলতা, দৃষ্টিশক্তির পরিবর্তন—এসব মোকাবেলা করা বিজ্ঞানীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

সূত্র: বিবিসি

আরও পড়ুন