জ্যোতির্বিদ্যা
ঈদ কবে, তা কি আগে জানা সম্ভব
প্রতিবছর একটা চিন্তা থাকে আমাদের, কবে রোজা হবে কিংবা কবে ঈদ হবে। এই চিন্তা অনেকখানি কমিয়ে ফেলা সম্ভব। এ জন্য জানতে হবে খানিকটা জ্যোতির্বিজ্ঞান। দুরবিনের সাহায্যে জ্যোতির্বিজ্ঞানের জ্ঞান কাজে লাগিয়ে সহজেই জানা সম্ভব চাঁদ কবে, কোথায় ও কখন দেখা যাবে।
প্রতিবছর রোজা আসে, ঈদ আসে। সেই সঙ্গে একটা উৎকণ্ঠা থাকে যে রোজা কবে শুরু হবে, ঈদ কবে হবে ইত্যাদি। চাঁদ তো আমরা সবাই দেখি। তবে অমাবস্যার ঠিক পরপরই ক্ষীণ ক্রিসেন্টের (কাস্তের) মতো নতুন যে চাঁদ আসে, তা আমাদের সচরাচর দেখা হয় না। রোজা আর ঈদের সময় এই নতুন চাঁদ নিয়ে আমরা অনেক কৌতূহলী থাকি। নিজেদের চেষ্টার পাশাপাশি চাঁদ দেখা কমিটির ঘোষণার জন্যও অপেক্ষা করি। তাই এ লেখায় চাঁদ দেখা নিয়ে আলোচনা করব।
ইসলামি পঞ্জিকা চাঁদের ওপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ এক অমাবস্যা থেকে পরবর্তী অমাবস্যা পর্যন্ত একটি মাস, এভাবে মোট ১২টি মাস। অমাবস্যার পর কখন নতুন চাঁদ দেখা যাবে, তার ওপর নির্ভর করে মাসগুলো ২৯ বা ৩০ দিনের হয়। এর কারণ হলো, এক অমাবস্যা থেকে পরের অমাবস্যায় যেতে চাঁদের ২৯.৫ দিন সময় লাগে ঠিকই, কিন্তু অমাবস্যা দিনের কোন সময় ঘটছে, তার ওপর নির্ভর করে আকাশে সূর্যাস্তের পর নতুন চাঁদ খালি চোখে কখন দেখা যাবে। এই তারতম্যের কারণ হলো চাঁদের কক্ষপথ একদম বৃত্তাকার নয়, বরং কিছুটা উপবৃত্তাকার। এ কারণে চাঁদের নিজ কক্ষপথে চলার গতি কমবেশি হয়। এখানে বলে রাখি, পৃথিবীর চারদিকে একবার প্রদক্ষিণ করতে চাঁদের সময় লাগে ২৭ দশমিক ৫ দিন। তবে এক চান্দ্রমাস বলতে আমরা ২৯ দশমিক ৫ দিনের হিসাবটাই ব্যবহার করি।
এখন প্রশ্ন হলো, পৃথিবীর সব জায়গায় রোজা ও ঈদ একই দিনে হয় না কেন? এর উত্তর জানতে হলে আমাদের দুটি ব্যাপার খেয়াল করতে হবে। একটি হলো অমাবস্যা দিনের কোন সময় ঘটছে আর আমরা পৃথিবীর কোথায় আছি। যেমন যুক্তরাষ্ট্র আর বাংলাদেশের মধ্যে সময়ের ব্যবধান ১১ বা ১২ ঘণ্টা। বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব দিকে থাকলেও সেখানে কেন বাংলাদেশের এক দিন আগে রোজা শুরু হলো, তা বোঝার চেষ্টা করা যাক।
১৪৪৬ হিজরির শাবান মাসের শেষে অমাবস্যা হয়েছে গ্রিনিচ সময় ২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাত ১২টা ৪৪ মিনিটে। সেই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টিক প্রান্তে সময় ছিল ২৭ ফেব্রুয়ারি, সন্ধ্যা ৭টা ৪৪ মিনিট; আর বাংলাদেশে সময় ছিল ২৮ ফেব্রুয়ারি, সকাল ৬টা ৪৪ মিনিট। এখন অমাবস্যার পর খালি চোখে সূর্যাস্তের পরপর নতুন চাঁদ দেখার জন্য নতুন চাঁদের বয়স কমপক্ষে ১৮ থেকে ২০ ঘণ্টার মধ্যে হতে হয়। পাশাপাশি সূর্য থেকে চাঁদের কৌণিক দূরত্ব ১০ থেকে ১২ ডিগ্রি থাকতে হয়। অমাবস্যার সময় চাঁদের বয়স শূন্য ধরা হয়। এই হিসাবে আকাশ পরিষ্কার থাকা সাপেক্ষে ২৮ ফেব্রুয়ারি সূর্যাস্তের পর যুক্তরাষ্ট্র থেকে পবিত্র রমজান মাসের চাঁদ দেখা যাওয়ার কথা। যে সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন চাঁদ, সেই সময়ে বাংলাদেশে ছিল ১ মার্চ ভোর। তাই বাংলাদেশে ১ মার্চ সূর্যাস্তের পর পবিত্র রমজান মাসের চাঁদ দেখা গেছে। তাই যুক্তরাষ্ট্রে ১ মার্চ ২০২৫, শনিবার ছিল প্রথম রোজা; আর বাংলাদেশে ছিল ২ মার্চ ২০২৫ (রোববার)। এখানে একটু খেয়াল করলে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে যে নতুন চাঁদ ছিল, তার বয়স এক দিনের কাছাকাছি; আর বাংলাদেশে ছিল প্রায় দেড় দিনের পুরোনো চাঁদ। তবে বাংলাদেশ থেকে অপেক্ষাকৃত একটু উজ্জ্বল আর আকাশের একটু ওপরের দিকে দেখা যাওয়ার কথা ছিল। মজার ব্যাপার হলো, সৌদি আরবে ২৮ ফেব্রুয়ারি খালি চোখে চাঁদ দেখা না যাওয়ার কথা থাকলেও তারা ১ মার্চ (শনিবার) রোজা শুরু করে। এর কারণ, সৌদি আরব খালি চোখে দেখার পাশাপাশি জ্যোতির্বিজ্ঞানের হিসাব আর দুরবিন ব্যবহার করে।
আমি একটা ছবি সংযুক্ত করেছি (চিত্র–১), যেখানে বছরের নির্দিষ্ট একটি দিনে পৃথিবীর কোথায় কীভাবে চাঁদ দেখা যাবে, তা দেখানো হয়েছে। উজ্জ্বল সবুজ রং দিয়ে বোঝানো হয়েছে, কোন এলাকায় খালি চোখে চাঁদ দেখা যাবে। হলুদ দিয়ে বোঝানো হয়েছে, বাইনোকুলার বা টেলিস্কোপ দিয়ে কোথায় দেখা যাবে। কমলা রং দিয়ে বোঝানো হয়েছে, কোন এলাকায় দুরবিন দিয়েও দেখা যাবে না। আর লাল রং দিয়ে বোঝানো হয়েছে, ওই দিন সূর্যাস্তের আগেই চাঁদ ডুবে যাবে। কমলা আর লাল রঙের মাঝের জায়গায় চাঁদের যে অবস্থা থাকে, তাকে বলা হয় ড্যানজন সীমা। এই সীমা হলো সূর্য থেকে ৭ ডিগ্রি কৌণিক দূরত্ব। এই সীমার মধ্যে সূর্যের আলোর প্রখরতার কারণে চাঁদ দেখা যায় না। ছবি থেকে আমরা দেখতে পাই, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র থেকে খালি চোখে চাঁদ দেখা যায়। সৌদি আরবের পশ্চিমের কিছু অংশে শুধু টেলিস্কোপ দিয়ে দেখা যায়, আর বাংলাদেশ থেকে দেখাই যাবে না।
এবার দেখি আমরা আসন্ন ঈদের দিন ঠিক করতে পারি কি না! এই ১৪৪৬ হিজরির রমজান মাসের শেষের অমাবস্যা হবে গ্রিনিচ সময় প্রায় বেলা ১১টায়। একই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টিক প্রান্তে হবে ২৯ মার্চ, ভোর প্রায় ৭টা আর বাংলাদেশে সময় হবে ২৯ মার্চ, বিকেল প্রায় ৫টা। এখন অবশ্য ডে লাইট সেভিংস টাইমের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব প্রান্তের সঙ্গে বাংলাদেশের সময়ের ব্যবধান এক ঘণ্টা বেড়েছে। এখন একটু ভিন্ন ব্যাপার ঘটবে। বাংলাদেশ থেকে ৩০ মার্চ সূর্যাস্তের পর ঈদের চাঁদ দেখা যাবে। তাই বাংলাদেশে ৩১ মার্চ ঈদ হওয়ার কথা। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রেও ৩০ মার্চ ঈদের চাঁদ দেখা যাবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রবাসী এবার বাংলাদেশের চেয়ে একটু পুরোনো চাঁদ দেখবে। আরও একটা ছবি (চিত্র–২) সংযুক্ত করলাম। এই ছবিতে বোঝানো হয়েছে, আগামী ঈদের চাঁদ ৩০ মার্চ কোথায় কোথায় দেখা যাবে। ছবিতে দেখা যাচ্ছে, সেদিন অস্ট্রেলিয়া ও পলিনেশিয়ার কিছু অংশ আর নিউজিল্যান্ড ছাড়া সবখানেই খালি চোখ বা দুরবিন দিয়ে ঈদের চাঁদ দেখা যাবে, যার যার স্থানীয় ৩০ মার্চ ২০২৫ সূর্যাস্তের পর। তাই ৩১ মার্চ ২০২৫ ঈদ হওয়ার কথা।
একটা সময় খালি চোখে চাঁদ দেখাই একমাত্র অবলম্বন ছিল। আর এখন আকাশে কোনো বস্তু কখন কোথায় থাকবে, তা আমরা নির্ভুলভাবে বলতে পারি। তা ছাড়া দুরবিন দিয়েও দেখতে পারি। বিভিন্ন দেশে চাঁদ দেখা কমিটি আছে, যাদের বেশির ভাগই সৌদি আরবকে অনুসরণ করে। তবে কবে রোজা বা ঈদ হবে, খালি চোখে দেখার পাশাপাশি জ্যোতির্বিজ্ঞানের সাহায্য নিয়ে এই হিসাবটা করলে সবার জন্যই বিষয়টা সহজ হতে পারে।
কিছু দেশ স্থানীয়ভাবে চাঁদ দেখার ওপর নির্ভরশীল। আমাদেরও চাঁদ দেখা কমিটি আছে। তারা চেষ্টা করলে একটু আগে থেকেই নিশ্চিতভাবে বলতে পারবে, কবে বাংলাদেশের সর্বত্র ঈদ হবে। এর ফলে দেশের ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় ভিন্ন ভিন্ন দিনে ঈদ হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে না।