তৈরি হলো ফোমের মতো হালকা, কিন্তু স্টিলের চেয়ে শক্তিশালী পদার্থ, নেপথ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা

ছবি: পিটার সার্লেস

সম্প্রতি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে নতুন এক পদার্থ তৈরি করেছেন বিজ্ঞানীদের আন্তর্জাতিক একটি দল। কার্বন ন্যানোকণায় তৈরি এ উপাদান ওজনে স্টাইরোফোমের মতো হালকা, কিন্তু স্টিল বা ইস্পাতের চেয়ে বহু গুণ শক্তিশালী। কানাডার টরোন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের মেকানিক্যাল ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল বিভাগের গবেষক পিটার সার্লেসের নেতৃত্বে উত্তর কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র এবং জার্মানির বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা এটি তৈরির কাজে যুক্ত ছিলেন। ২৩ জানুয়ারি তাঁদের গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক জার্নাল অ্যাডভান্সড মেকানিক্যাল-এ।

ন্যানোম্যাটেরিয়াল বা ন্যানোপদার্থ তৈরিতে মেশিন লার্নিং (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে শেখানোর একটি প্রক্রিয়া) ও থ্রিডি প্রিন্টার ব্যবহার করেছেন বিজ্ঞানীরা। তাঁদের এ ন্যানোপদার্থ প্রচলিত কার্বন ন্যানোটিউবের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি শক্তিশালী। বিমান ও গাড়িসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি তৈরিতে উপাদানটি ব্যবহার করা যাবে। ওজনে কম হওয়ায় এই পদার্থের তৈরি যানবাহন বেশ জ্বালানী সাশ্রয়ী হবে বলে মনে করছেন গবেষকেরা।

আরও পড়ুন

কানাডার টরোন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক টবিন ফিলেটার এ গবেষণার অন্যতম সহযোগী। নিজেদের উদ্ভাবন সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমাদের আশা, নতুন এ ন্যানোপদার্থ ভবিষ্যতে বিমান, হেলিকপ্টারসহ মহাকাশযান তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখবে। ওজনে হালকা হওয়ায় উড্ডয়নের সময়ে উড়োযানে জ্বালানি খরচ কমবে। ফলে এসব যানবাহনের উচ্চ কার্বন নিঃসরণ কমে আসবে। তা ছাড়া অনেক বেশি ঘাতসহ হওয়ায় এসব যানের নিরাপত্তা ও কার্যক্ষমতাও থাকবে অটুট।’

অনেক সময় বিভিন্ন পদার্থের কাঠিন্য ও ঘাতসহনীয়তার মধ্যে বৈপরীত্য দেখা যায়। উদাহরণ হিসেবে সিরামিকের কথা বলা যেতে পারে। সিরামিকের কাঠিন্য অনেক বেশি হলেও এটি বেশি চাপ সহ্য করতে পারে না। অর্থাৎ কম ঘাতসহ হয়। ফলে সামান্য বল প্রয়োগ করলেই ভেঙে যায়।

একই সমস্যা দেখা যায় বিভিন্ন ন্যানোপদার্থের ক্ষেত্রে। বিশেষ করে যেসব ন্যানোপদার্থ অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অণুর কাঠামো দিয়ে তৈরি, সেগুলোতে এ সমস্যা দেখা যায়। এ ধরনের কাঠামোর দৈর্ঘ্য হয় আমাদের চুলের পুরুত্বের ১০০ ভাগের ১ ভাগ। ওজনের তুলনায় এসব উপাদানের কাঠিন্য অনেক বেশি হয়। কিন্তু ঘাতসহনীয়তা কম থাকে। অর্থাৎ সিরামিকের মতো অল্প চাপে ভেঙে যায়। এ কারণেই এই উপাদানগুলো সব জায়গায় ব্যবহার করা যায় না। যদিও কার্বন ন্যানোটিউব এই সমস্যা অনেকটাই সমাধান করেছিল, কিন্তু এখনকার এই উপাদান আরও বেশি কার্যকর।

‘আমরা যখন সমস্যাটি নিয়ে ভাবছিলাম, তখন বুঝতে পারলাম মেশিন লার্নিংয়ের জন্য এটা আদর্শ সমস্যা হতে পারে।’
পিটার সার্লেস, গবেষক, মেকানিক্যাল ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল বিভাগ, টরোন্টো বিশ্ববিদ্যালয়, কানাডা

ফলে ন্যানোমেটেরিয়ালের আরও ভালো ডিজাইন খুঁজতে গবেষকেরা বিভিন্ন জ্যামিতিক কাঠামো ও এদের বৈশিষ্ট্য কম্পিউটারে সিমুলেট করেন। এরপর মেশিন লার্নিং অ্যালগরিদমের মাধ্যমে কাঠামো ও এদের বৈশিষ্ট্যের সাদৃশ্য বিশ্লেষণ করা হয়। অ্যালগরিদমটি গবেষকদের দেওয়া ডিজাইন থেকে শিখতে থাকে। তারপর এই ন্যানোপদার্থের কাঠামো ডিজাইন করা হয়। সেই সঙ্গে এর সম্ভাব্য চাপ সহনশীলতা ও কাঠিন্যের মাত্রা নির্ণয় করে দেখায়।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তৈরি ন্যানোল্যাটিস বা ন্যানোকেলাসের নকশা হাতে পাওয়ার পর গবেষকেরা থ্রিডি প্রিন্টারের মাধ্যমে তা বাস্তবে তৈরি করে এর কার্যকারিতা পরীক্ষা করে দেখেন। তাতে দেখা যায়, নতুন ন্যানোপদার্থটি প্রতি ঘনমিটার/কেজিতে ২.০৩ মেগাপাসকেল চাপ সহ্য করতে সক্ষম। একই পরিমাণ টাইটেনিয়াম ধাতু এর মাত্র ৫ ভাগের এক ভাগ চাপ সহ্য করতে পারে। অর্থাৎ, সবচেয়ে শক্তিশালী ধাতু টাইটেনিয়ামের তুলনায় নতুন আবিষ্কৃত ন্যানোপদার্থ প্রায় পাঁচ গুণ শক্তিশালী।

গবেষকদের দাবি, ন্যানোপদার্থ তৈরিতে এবারই প্রথম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহৃত হয়েছে। দ্রুততম সময়ে এটি ইনপুট দেওয়া ডিজাইনগুলো বিশ্লেষণ করে নিজে এই কাঠামোর ডিজাইন তৈরি করেছে। কোন জ্যামিতিক কাঠামো সবচেয়ে কার্যকর, এটি তা শিখে নিয়েছে দারুণভাবে। এখন এ ন্যানোপদার্থ বড় পরিসরে উৎপাদন করে বাস্তবে কাজে লাগানোর কথা ভাবছেন তাঁরা। ভবিষ্যতে এ ধরনের আরও শক্তিশালী ন্যানোপদার্থ কীভাবে তৈরি করা যায়, তা নিয়েও কাজ করবে বলে জানিয়েছে বিজ্ঞানী দলটি।

লেখক: শিক্ষার্থী, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

সূত্র: লাইভ সায়েন্স, অ্যাডভান্স ম্যাটেরিয়ালস জার্নাল