পদার্থবিজ্ঞান
রিচার্ড ফাইনম্যানের ভাষ্যে মাইকেল ফ্যারাডের গবেষণার গুরুত্ব
ব্রিটিশ পদার্থবিদ মাইকেল ফ্যারাডে এক অনন্য প্রতিভা। প্রথাগত শিক্ষা ছাড়াই পদার্থবিদ্যা ও রসায়নের জগতে বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন তিনি। শুধু গবেষণা নয়, বিজ্ঞান শিক্ষা ছড়িয়ে দিতেও কাজ করেছেন এই বিজ্ঞানী। ১৮২৫ সালের ২৪ মার্চ জনপ্রিয় রয়্যাল ইনস্টিটিউশন ‘ক্রিসমাস লেকচার’ শুরু করেন তিনি, যা আজও ব্রিটেনে বিজ্ঞান শিক্ষার অন্যতম বড় আয়োজন। রয়্যাল ইনস্টিটিউশন আজও এই লেকচার আয়োজন করে। আজ এই ক্রিসমাস লেকচারের ২০০ বছর পূর্তি।
২০ শতকের অন্যতম মেধাবী পদার্থবিদ রিচার্ড ফাইনম্যান তাঁর দ্য মিনিং অব ইট অল বইয়ে লিখে গেছেন এই লেকচারগুলোর কথা, লিখেছেন এই বিজ্ঞানীর কথা। চলুন, আজকের এই দিনে নোবেলজয়ী পদার্থবিদ রিচার্ড ফাইনম্যানের ভাষ্যে জেনে নেওয়া যাক ক্রিসমাস লেকচার ও মাইকেল ফ্যারাডের গবেষণার গুরুত্ব। প্রকাশিত এই অংশটি অনুবাদ করেছেন উচ্ছ্বাস তৌসিফ।
বিজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক এর বিষয়বস্তু। আর বিদ্যুতের মতো ইন্টারেস্টিং বিষয় আর কটি আছে?
ধনাত্মক ও ঋণাত্মক চার্জের মধ্যকার এই আকর্ষণ বল অত্যন্ত শক্তিশালী। তাই যেকোনো সাধারণ পদার্থের সব ধনাত্মক ও ঋণাত্মক চার্জ বৈদ্যুতিক আকর্ষণের ফলে দারুণ এক ভারসাম্যে চলে আসে। সব ধনাত্মক চার্জ একজোট হয়ে সব ঋণাত্মক চার্জকে আকর্ষণ করে। দীর্ঘকাল কেউ বিদ্যুতের এই অদ্ভুত কাজকর্ম খেয়ালই করেনি। মাঝেমধ্যে অ্যাম্বারের টুকরোকে কোনো কারণে ঘষলে, সেটা যখন একটুকরো কাগজকে আকর্ষণ করত, তখন হয়তো তারা এর কিছুটা টের পেত। কিন্তু এখন এসব নিয়ে নাড়াচাড়া করতে গেলে আমরা বুঝতে পারি, এর ভেতরে বিস্ময়কর পরিমাণের দক্ষযজ্ঞ চলছে। অথচ আজও বিজ্ঞানের গুরুত্ব সম্পূর্ণভাবে উপলব্ধি করতে পারি না আমরা।
একটা উদাহরণ দিই। শিশু-কিশোরদের জন্য ফ্যারাডের ৬ খণ্ডের একটা ক্রিসমাস লেকচার সিরিজ আছে। নাম, কেমিক্যাল হিস্ট্রি অব অ্যা ক্যান্ডেল। ফ্যারাডের এই লেকচারের মূল বক্তব্য হলো, আপনি যা ইচ্ছা, যেকোনো কিছুর দিকে তাকান। ভালো করে লক্ষ করলে ঠিকই বুঝতে পারবেন, পুরো মহাবিশ্বটার সঙ্গেই এর একটা নিবিড় যোগাযোগ আছে। আপনি সেই যোগাযোগটাকেই দেখছেন, বুঝতে চেষ্টা করছেন। সে জন্য মোমবাতির সবগুলো বৈশিষ্ট্যের দিকে তাকিয়ে ফ্যারাডে এর দহন, রসায়ন ইত্যাদি খুঁজে পেয়েছিলেন। বইটার ভূমিকায় ফ্যারাডের জীবন ও তার কিছু আবিষ্কার নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। সেখানে লেখা হয়েছে, রাসায়নিক পদার্থের তড়িৎ বিশ্লেষণের জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুতের পরিমাণ, বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া পরমাণুর সংখ্যাকে তাদের যোজনী দিয়ে ভাগ করলে যে ভাগফল পাওয়া যায়, তার সমানুপাতিক। আরও লেখা হয়েছে, তাঁর আবিষ্কৃত নীতিগুলো এখন ক্রোম প্লেটিং, অ্যালুমিনিয়ামের অ্যানোডিক কালারিং এবং শিল্পক্ষেত্রে এরকম আরও ডজনখানেক কাজে ব্যবহৃত হয়। কথাটা আমার একদম পছন্দ হয়নি।
ফ্যারাডে তাঁর নিজের আবিষ্কার নিয়ে কী বলেছিলেন, জানেন?
তিনি বলেছিলেন, ‘পরমাণু কিছু কিছু উপায়ে বৈদ্যুতিক শক্তির সঙ্গে জড়িত। তাদের সবচেয়ে দারুণ বৈশিষ্ট্যগুলো এর সঙ্গেই জড়িয়ে আছে। এর মধ্যে একটা হলো তাদের পারস্পরিক রাসায়নিক সম্পর্ক।’ তিনি আবিষ্কার করেছিলেন, পরমাণু কীভাবে একসঙ্গে থাকবে, তা যে জিনিসটা নিয়ন্ত্রণ করে; আয়রন বা লোহা ও অক্সিজেনের মিশেলে সৃষ্ট আয়রন অক্সাইডে মৌল দুটির অনুপাত ও বিন্যাস কেমন হবে, তা যে জিনিসটা ঠিক করে দেয়, সেটা হলো—এর কোনো কোনোটি বৈদ্যুতিকভাবে ধনাত্মক, আর কোনো কোনোটি বৈদ্যুতিকভাবে ঋণাত্মক। এগুলো পরস্পরকে সুনির্দিষ্ট সমানুপাতে আকর্ষণ করে। তিনি আরও আবিষ্কার করেছিলেন, পরমাণুতে বিদ্যুৎ থাকে একক বা প্যাকেট আকারে। দুটোই গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার।
তবে সবচেয়ে উত্তেজনাকর বিষয়টা হলো, এটা ছিল বিজ্ঞানের ইতিহাসের সবচেয়ে নাটকীয় মুহূর্তগুলোর একটি। এটা সেই দুর্লভতম মুহূর্তগুলোর একটি, যখন দুটো ব্যাপক ক্ষেত্র একসঙ্গে একীভূত হয়ে যায়, একাকার হয়ে যায় মিলেমিশে। ফ্যারাডে আচমকা আবিষ্কার করলেন, দুটো আপাত ভিন্ন জিনিস আসলে একই জিনিসের দুটো ভিন্ন রূপ। বিদ্যুৎ নিয়ে গবেষণা করা হচ্ছিল, রসায়ন নিয়েও চলছিল গবেষণা। অথচ হঠাৎ দেখা গেল, দুটো আসলে একই জিনিসের ভিন্ন রূপ—বৈদ্যুতিক বলের পরিবর্তনের ফলেই রাসায়নিক বদলে যায়। আজও আমরা এগুলোকে সেভাবেই জানি, বুঝি। ফলে ‘তাঁর আবিষ্কৃত নীতিগুলো ক্রোম প্লেটিংয়ে ব্যবহৃত হয়’—শুধু এটুকু বলা আসলে মেনে নেওয়া যায় না। এতে তাঁর গবেষণার গুরুত্ব আড়ালে পড়ে যায়।
আপনারা জানেন, শারীরতত্ত্বের যেকোনো আবিষ্কারের জন্যই সংবাদপত্রের একটা বাঁধা বাক্য আছে। ‘আবিষ্কারক বলেছেন, ক্যান্সার সারাতে এই আবিষ্কার কাজে লাগতে পারে।’ কিন্তু তারা সেই আবিষ্কারটার নিজস্ব মূল্যটুকু ব্যাখ্যা করতে পারে না। এটিও সে রকম।
প্রকৃতি কীভাবে কাজ করে, তা বোঝার চেষ্টা করা অত সহজ নয়। মানুষের কার্যকরণ ক্ষমতার ভয়ংকর এক পরীক্ষা এটি। সূক্ষ্ম চাতুর্য দরকার পড়ে এ জন্য। দরকার পড়ে যুক্তির সরু সুতো ধরে হেঁটে যাওয়া। খেয়াল রাখতে হয়, কী হবে—তা আন্দাজ করতে গিয়ে যাতে কোনো ভুল না হয়। কোয়ান্টাম বলবিদ্যা কিংবা আপেক্ষিকতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ধারণাগুলো এর ভালো উদাহরণ। তবে এগুলোর আরও বহু আগের, মাইকের ফ্যারাডের গবেষণাকেও এই সূক্ষ্ম চাতুর্যের আদর্শ উদাহরণ বলা যায়।