অধরা একমেরু চুম্বক

চুম্বক আমাদের বড় পরিচিত। আমাদের পৃথিবীর গোটা কেন্দ্রটাই আস্ত এক চুম্বক! আমরা জানি, যেকোনো চুম্বকের দুটি মেরু থাকে। কিন্তু এই মেরু দুটি আসে কোত্থেকে? শুধু একমেরুবিশিষ্ট চুম্বকের কি অস্তিত্ব আছে? পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এ প্রশ্নের সমাধান কী?

উত্তর মেরুর কাছে উত্তর মেরু আনলে দুটি চুম্বকই ছিটকে যায় দুই দিকে

মহাবিশ্ব আমাদের কাছে বিচিত্র সব রহস্য নিয়ে হাজির। এসব রহস্য খোলাসা করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। বিজ্ঞানীদের তাই মহাজাগতিক গোয়েন্দা বললে ভুল হয় না। মহাজাগতিক এই গোয়েন্দারা মহাবিশ্বের শুরুর গল্প বের করে ফেলেছেন, আবিষ্কার করেছেন মহাবিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ সব বৈশিষ্ট্য। নিউটনের মহাকর্ষ সূত্র মানুষকে চাঁদে নিয়ে গেছে, আইনস্টাইনের তত্ত্বের ভবিষ্যদ্বাণী থেকে আমরা শনাক্ত করেছি মহাকর্ষ তরঙ্গ। কিন্তু মহাবিশ্বকে এখনো একটিমাত্র সুতায়, একটি পূর্ণাঙ্গ তত্ত্বের ঘেরে বাঁধা যায়নি। আজও একটি পূর্ণাঙ্গ তত্ত্ব খুঁজে ফিরছেন বিজ্ঞানীরা। এর নাম সবকিছুর তত্ত্ব—দ্য থিওরি অব এভরিথিং।

বর্তমানে মহাবিশ্বকে ব্যাখ্যা করার কাজে পদার্থবিজ্ঞানের যে গঠনকাঠামো, তার নাম পদার্থবিজ্ঞানের প্রমিত মডেল—স্ট্যান্ডার্ড মডেল। এই মডেল অনেক কিছুর জবাব দিতে পারে বটে, তবে সবকিছুর জবাব দিতে পারে না। কিছু রহস্য আজও রয়ে গেছে। এ রকম একটি বড় রহস্য রয়েছে আমাদের চিরপরিচিত চুম্বকত্ব নিয়ে। রয়েছে বেশ কিছু প্রশ্ন।

চুম্বকের সঙ্গে আমাদের প্রায় সবার পরিচয় ছোটবেলায়। খেলনা গাড়ি খুলে-টুলে চুম্বক বের করে নিতে দারুণ মজা লাগত। আর আলাদা করে যেসব চুম্বক কিনতে পাওয়া যেত, সেগুলো হাতে নিলে রাখতে ইচ্ছা করত না। একটু বড় হয়ে আমরা বুঝলাম, চুম্বক জিনিসটি বড় অদ্ভুত।

বিদ্যুৎ মানে ইলেকট্রনের চলন। ইলেকট্রন নড়াচড়া করলে আমরা একধরনের শক্তি পাই। এই শক্তিকে বলা হয় বিদ্যুৎ শক্তি। আমাদের সব বাতি, পাখাসহ বৈদ্যুতিক সব যন্ত্রের পেছনে রয়েছে ইলেকট্রনের এই চলন।

আমরা জানি, একটি চুম্বকের দুটি মেরু থাকে। উত্তর ও দক্ষিণ মেরু। লোহা ও অন্যান্য জিনিসকে আকর্ষণ করে তো বটেই; তবে একটা দণ্ড চুম্বকের উত্তর মেরু আরেকটি চুম্বকের দক্ষিণ মেরুকে আকর্ষণ করে। কিন্তু উত্তর মেরুর কাছে উত্তর মেরু আনলে দুটি চুম্বকই ছিটকে যায় দুই দিকে। এখানে সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় হলো, একটা দণ্ড চুম্বককে মাঝখান থেকে কেটে বা ভেঙে ফেললে তার কোনো একটা মেরু চলে যায় না; বরং নতুন দুটি চুম্বক হয়, প্রতিটির আবার দুটি করে মেরু থাকে।

আরও পড়ুন

প্রশ্ন হলো প্রকৃতিতে কি একমেরু চুম্বক রয়েছে? মহাবিশ্ব নিয়ে আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্বগুলো এই সম্ভাবনাকে কিছুতেই নাকচ করে দিতে পারে না। আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো, চুম্বকের কেন দুটি মেরুই থাকে? এই মেরু দুটি আসছে কোত্থেকে? প্রশ্নটার আরেকটু গভীরে ঢুকলে বিষয়টি ভালোভাবে বোঝা যাবে।

দুই

আমরা জানি, লোহায় বিদ্যুৎ পরিচালনা করলে তার চৌম্বক ধর্ম দেখা যায়। কিন্তু চুম্বক জিনিসটা কী? মেরুগুলো তৈরি হচ্ছে কীভাবে?

বিষয়টি বুঝতে হলে প্রথমে বিদ্যুৎ ও চুম্বকের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন। স্কটিশ পদার্থবিজ্ঞানী জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল বিদ্যুৎ ও চুম্বকের মধ্যকার সম্পর্ক ব্যাখ্যা করেন কিছু সমীকরণ দিয়ে। এই সমীকরণগুলোকে বলা হয় ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণ। এই সমীকরণ থেকে আমরা জানতে পারি, চুম্বকত্বের জন্য যেমন বিদ্যুৎ দায়ী, তেমনি বিদ্যুতের পেছনে রয়েছে চুম্বকের কারিকুরি। একটুখানি অতিসরলীকরণ করা হলো। তবে আমাদের এ প্রসঙ্গের জন্য এটুকু করা যায়।

আমাদের চিরপরিচিত চুম্বক, যাতে দুটি মেরু থাকে (বাঁয়ে)। আর একমেরু চুম্বক থাকলে তা কেমন হতো, সেটা দেখানো হয়েছে ডানে।

আমরা জানি, বিদ্যুৎ মানে ইলেকট্রনের চলন। ইলেকট্রন নড়াচড়া করলে আমরা একধরনের শক্তি পাই। এই শক্তিকে বলা হয় বিদ্যুৎ শক্তি। আমাদের সব বাতি, পাখাসহ বৈদ্যুতিক সব যন্ত্রের পেছনে রয়েছে ইলেকট্রনের এই চলন। তবে বিদ্যুতের জন্য ইলেকট্রনকে কিন্তু স্থানান্তরিত হতে হয় না। এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে হয় না সত্যি সত্যি। ইলেকট্রন কাঁপে। এই কম্পনের মাধ্যমে সে পরের ইলেকট্রনটিকে শক্তি পাস করে দেয়। এই শক্তিই বিদ্যুৎ শক্তি। আর ম্যাক্সওয়েলের তত্ত্ব থেকে আমরা জানি, বিদ্যুৎক্ষেত্র যেখানে থাকে, তার সঙ্গে সমকোণে থাকে চৌম্বকক্ষেত্র। অর্থাৎ বিদ্যুত প্রবাহের ফলে তৈরি হয় চুম্বকত্ব।

তার মানে চুম্বকত্ব কী—এ প্রশ্নের সবচেয়ে মৌলিক জবাব হলো, যে পদার্থ দিয়ে চুম্বকটি তৈরি, তার ভেতরে থাকে ওই পদার্থের পরমাণু। আর পরমাণুর ভেতরে আছে ইলেকট্রন। এ ক্ষেত্রেও আসল কেরামতি এই ইলেকট্রনদের।

লোহার পরমাণুতে ইলেকট্রনগুলো নিউক্লিয়াসের চারপাশে এমনভাবে থাকে যে প্রতিটি পরমাণুতে চারটি বিজোড় সংখ্যক ইলেকট্রন দেখা যায়। ফলে প্রতিটি লোহার পরমাণুতে কতগুলো অতিক্ষুদ্র চৌম্বকক্ষেত্র তৈরি হয়।

পরমাণুর কেন্দ্রে থাকে ধনাত্মক চার্জযুক্ত নিউক্লিয়াস। আর একে ঘিরে থাকে এক বা একাধিক ঋণাত্মক চার্জযুক্ত ইলেকট্রন। প্রতিটি ইলেকট্রন তার চার্জের জন্য একটা অতিক্ষুদ্র চৌম্বকক্ষেত্র তৈরি করে। বিজ্ঞানীরা ইলেকট্রনের এই বৈশিষ্ট্যকে বলেন স্পিন। এই অতিক্ষুদ্র চৌম্বকক্ষেত্রগুলোর বেশ কয়েকটির মেরু যদি একই দিকে থাকে, তাহলে সেই বস্তু চুম্বক পদার্থে পরিণত হয়।

এমনিতে ইলেকট্রনের স্পিন ধর্ম একটি বিমূর্ত ধারণা। নামটি ‘স্পিন’, যার বাংলা হয় ঘূর্ণন। তাই অনেকে মনে করেন, ইলেকট্রন স্পিন করে মানে ঘোরে। আসলে তা নয়। আসলে চার্জযুক্ত কোনো বস্তু ঘুরতে থাকলে এর চারপাশে একধরনের চৌম্বকক্ষেত্র তৈরি হয়। বিজ্ঞানীরা ইলেকট্রনের চারপাশে এ ধরনের চৌম্বকক্ষেত্র পরিমাপ করেছেন। এই চৌম্বকক্ষেত্র তৈরি করার বৈশিষ্ট্যকে তাঁরা বলেন স্পিন। কারণ, স্পিনের দিক উল্টে দিলে চুম্বকক্ষেত্রের মেরুও উল্টে যায়।

দুই মেরুবিশিষ্ট একটি চুম্বক ভাঙলে দুই মেরুবিশিষ্ট দুটি আলাদা চুম্বক তৈরি হয়; দুটি একমেরু চুম্বক কখনোই পাওয়া যায় না

ইলেকট্রন সাধারণত জোড় বেঁধে থাকে। ফলে একটির স্পিন অন্যটির বিপরীতমুখী স্পিনকে বাতিল করে দেয়। তাই যেকোনো পরমাণুর মোট চুম্বকত্বের মান শূন্য হয়ে যায়। কিন্তু লোহার মতো কিছু পদার্থে এমনটি ঘটে না। লোহার কথাই বলি। লোহার পরমাণুতে ইলেকট্রনগুলো নিউক্লিয়াসের চারপাশে এমনভাবে থাকে যে প্রতিটি পরমাণুতে চারটি বিজোড় সংখ্যক ইলেকট্রন দেখা যায়। ফলে প্রতিটি লোহার পরমাণুতে কতগুলো অতিক্ষুদ্র চৌম্বকক্ষেত্র তৈরি হয়। এই চুম্বকক্ষেত্রগুলো একই দিকমুখী হলে সমন্বিতভাবে এদের একটি উত্তর মেরু ও একটি দক্ষিণ মেরু থাকে। এ জন্য লোহার চৌম্বক ধর্ম আছে।

এই চৌম্বক ধর্মটি কিন্তু এমনি এমনি কাজ করতে পারে না। এর পেছনে ভূচৌম্বকত্বের একটি বিষয়ও আছে। সেই বিষয়টা নিয়েও একটুখানি বলা প্রয়োজন।

আরও পড়ুন

আমরা জানি, চুম্বক শুধু উত্তর-দক্ষিণে ফিরে থাকে। পূর্ব-পশ্চিমে ফেরানোই যায় না। এর কারণ, পৃথিবীর কেন্দ্রটাই আস্ত একটা চুম্বক! পৃথিবীর কেন্দ্রে আছে অতি উত্তপ্ত কঠিন লোহার গোলক। এর তাপমাত্রা প্রায় ৫ হাজার ৭০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কেন্দ্রের কঠিন গোলকের চারপাশে আছে অপেক্ষাকৃত কম তাপমাত্রার তরল পদার্থ। তরলের উপাদান মূলত লোহা ও নিকেল। তাপমাত্রা, চাপ এবং গঠনগত পার্থক্যের কারণে গরম ও কম ঘন পদার্থ বাইরের স্তরে বেরিয়ে আসে। একইভাবে বাইরের স্তরের ঘন পদার্থগুলো চলে যায় ভেতরের স্তরে। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। সব সময় এটা ঘটছে। তবে পৃথিবীর উচ্চচাপের কারণে একেবারে কেন্দ্রের গোলকটি তরল হতে পারে না।

পৃথিবী তার নিজ অক্ষের ওপরে ক্রমাগত লাটিমের মতো ঘুরছে। এই ঘূর্ণনের কারণে কেন্দ্রে ‘কোরিওলিস ইফেক্ট’ নামে একধরনের প্রভাব তৈরি হয়। এ কারণে কেন্দ্রের তরলে তৈরি হয় একধরনের ঘূর্ণি। ফলে বৈদ্যুতিক স্রোত তৈরি হয়। আর এই বিদ্যুৎপ্রবাহের কারণেই তৈরি হয় অদৃশ্য চৌম্বকক্ষেত্র। বিদ্যুতের প্রবাহের সঙ্গে চুম্বকত্বের সংযোগ আমরা ইতিমধ্যে দেখেছি। যেখানে বিদ্যুৎ থাকবে, সেখানে চুম্বকও থাকবে। কিন্তু বিদ্যুৎটা আসছে কোত্থেকে?

বৈদ্যুতিক চার্জযুক্ত ধাতু কেন্দ্রের তরলের মাঝে ঘোরার সময় চৌম্বকক্ষেত্রের কারণে তৈরি হয় বিদ্যুৎপ্রবাহ। আবার বিদ্যুৎপ্রবাহের কারণে তৈরি হয় চৌম্বকক্ষেত্র। এটা একটা চক্র। এ চক্র চলতেই থাকে। মনে হতে পারে, পৃথিবীর কেন্দ্রে বুঝি নিরবচ্ছিন্নভাবে বাইরের কোনো সাহায্য ছাড়াই শক্তি তৈরি হচ্ছে। বিষয়টি আসলে এমন নয়। সূর্যের আকর্ষণে পৃথিবী যে প্রচণ্ড বেগে ঘুরছে, সেই ঘূর্ণনশক্তি থেকে কেন্দ্রে তৈরি হয় এই বিদ্যুৎ ও চৌম্বকশক্তি। সঙ্গে আছে পরমাণুর অভ্যন্তরীণ শক্তি ও পৃথিবীর অভ্যন্তরে জমা পড়া তাপশক্তির সক্রিয় প্রভাব।

চৌম্বকক্ষেত্র ছাড়া সৌরবায়ুর প্রভাবে বিলীন হয়ে যেত পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল। সূর্যের প্রচণ্ড তেজস্ক্রিয় বিকিরণ আছড়ে পড়ত পৃথিবীর বুকে

পৃথিবীর এই ভূচুম্বকের উত্তর মেরু আমাদের খেলনা চুম্বকগুলোর দক্ষিণ মেরুকে আকর্ষণ করে। আর আমাদের চুম্বকের উত্তর মেরুকে আকর্ষণ করে ভূচুম্বকের দক্ষিণ মেরু। এই বৈশিষ্ট্যের জন্যই চুম্বক দারুণ কাজের জিনিস। আমরা এখন জানি, শুধু খেলনা গাড়িতেই নয়, বাস্তবের বড় গাড়ি কিংবা ফ্রিজেও চুম্বক থাকে। এমনকি এই চৌম্বক বৈশিষ্ট্য কাজে লাগিয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানে এমআরআইয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাও করা হয়।

তবে এই ভূচৌম্বকত্ব আমাদের জন্য আরেকটি কারণে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবীর চারপাশে এক অদৃশ্য প্রতিরক্ষাবলয় গঠন করেছে এটি। চৌম্বকক্ষেত্র ঠিক কীভাবে পৃথিবীকে রক্ষা করছে? কী থেকে রক্ষা করছে?

পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র প্রতিমুহূর্তে ক্ষতিকর মহাজাগতিক রশ্মি থেকে রক্ষা করছে পৃথিবীকে। এই চৌম্বকক্ষেত্র ছাড়া সৌরবায়ুর প্রভাবে বিলীন হয়ে যেত পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল। সূর্যের প্রচণ্ড তেজস্ক্রিয় বিকিরণ আছড়ে পড়ত পৃথিবীর বুকে। মানুষকে বেঁচে থাকার জন্য বাস করতে হতো ভূত্বকের নিচে, পৃথিবীর ভেতরে। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, এককালে মঙ্গলেরও এ রকম চৌম্বকক্ষেত্র ছিল। সে সময় মঙ্গল ছিল বাসযোগ্য। কালের আবর্তে এটা বিলীন হয়ে গেছে। ফলে বিলীন হয়ে গেছে মঙ্গলের বাসযোগ্য বায়ুমণ্ডল। মঙ্গল তাই আজ মানুষ বা প্রাণের অনুপযোগী রুক্ষ এক লাল গ্রহ। চুম্বকত্ব তাই আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু তাত্ত্বিকভাবেই নয়, নিজেদের অস্তিত্বের সঙ্গে এর যোগসূত্রের কারণেও।

বিদ্যুৎ ও চুম্বকত্ব যদি একই ধরনের হবে, তবে এই পার্থক্য কেন? তর্কের খাতিরে এ প্রশ্নের উত্তর হতে পারে যে এভাবেই আমাদের মহাবিশ্ব তৈরি। কিন্তু এটা আসলে উত্তর হলো না। এ সমস্যার পূর্ণাঙ্গ সমাধান আমাদের অজানা।

সবই ঠিক আছে। চুম্বকত্ব কী, সেটা আমরা বুঝতে পারছি। জিনিসটি কীভাবে কাজ করে, সে বিষয়েও একটা ধারণা আমরা এখান থেকে পাই। কিন্তু এখানেই আমাদের দ্বিতীয় প্রশ্নটি উঠে আসে। ইলেকট্রন যে চৌম্বকক্ষেত্র তৈরি করে, তাতে একসঙ্গে দুটি মেরুই থাকে। প্রশ্ন হলো, কেন?

আমরা যদি বিদ্যুতের কথা ভাবি, তাহলে দেখব, ইলেকট্রন নামের কণাটির বৈদ্যুতিক চার্জ ঋণাত্মক। আবার পরমাণুর নিউক্লিয়াসে যে প্রোটন থাকে, তার চার্জ ধনাত্মক। অর্থাৎ বৈদ্যুতিক চার্জের ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাই, প্রকৃতিতে আলাদা বৈদ্যুতিক চার্জযুক্ত কণা আছে। কিন্তু আলাদা চৌম্বক মেরুবিশিষ্ট কণা পাই না। এখানে অনেকগুলো প্রশ্ন। প্রাথমিকভাবে তো সমস্যা এটাই যে আলাদা চৌম্বক মেরুবিশিষ্ট কণা নেই। কিন্তু এর ফলে প্রকৃতির প্রতিসাম্য নষ্ট হয়।

বৈদ্যুতিক চার্জের যেমন ধনাত্মক ও ঋণাত্মক কণা আছে, চুম্বকত্বের সেরকম উত্তর বা দক্ষিণ মেরুবিশিষ্ট একমেরু চুম্বক-কণা নেই; থাকলে সেটার ক্ষেত্ররেখা এরকম হতো

বিষয়টি হলো, ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণগুলোতে বিদ্যুৎ ও চুম্বকত্ব পুরোপুরি প্রতিসম (সিমেট্রিক) নয়। আরও পরিষ্কার করে বলা যায়, সমীকরণগুলোতে বিদ্যুৎ ও চুম্বকত্বের উৎস পুরোপুরি এক ধরনের নয়। এই পার্থক্যের কারণ হলো, প্রকৃতিতে আমরা আলাদা বৈদ্যুতিক চার্জ (ধনাত্মক ও ঋণাত্মক) পাই, কিন্তু আলাদা চৌম্বকীয় মেরু বা ম্যাগনেটিক মনোপোল পাই না। আগে যেমন বলেছি, চুম্বক সব সময় দুই মেরু (উত্তর ও দক্ষিণ) নিয়ে হাজির হয়। একটা চুম্বক দণ্ডকে ভাঙতে থাকলে আমরা ক্ষুদ্রাকৃতির চুম্বক পাই। সেগুলোতেও উত্তর ও দক্ষিণ—দুটি মেরুই থাকে। ইলেকট্রিক চার্জের ক্ষেত্রে কিন্তু এমনটি হয় না। পদার্থবিজ্ঞান গবেষণার অন্যতম চালিকা শক্তি হচ্ছে আমাদের প্রকৃতি এবং তত্ত্বে প্রতিসাম্য বা সিমেট্রির উপস্থিতি। তাই বিদ্যুৎ ও চুম্বকত্বের ক্ষেত্রে পুরোপুরি প্রতিসাম্য না পাওয়া পদার্থবিদদের জন্য মেনে নেওয়া কঠিন।

প্রশ্ন হলো, বিদ্যুৎ ও চুম্বকত্বের উৎসের ভেতর এই ভিন্নতা কেন? বিদ্যুৎ ও চুম্বকত্ব যদি একই ধরনের হবে, তবে এই পার্থক্য কেন? তর্কের খাতিরে এ প্রশ্নের উত্তর হতে পারে যে এভাবেই আমাদের মহাবিশ্ব তৈরি। কিন্তু এটা আসলে উত্তর হলো না। এ সমস্যার পূর্ণাঙ্গ সমাধান আমাদের অজানা। কেউ এ প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ উত্তর বা ব্যাখ্যা দিতে পারলে হয়তো নোবেল পুরস্কার পেয়ে যাবেন।

এ প্রসঙ্গ থেকে আমাদের প্রথম প্রশ্নটিও চলে এল। চৌম্বকীয় একমেরুর কি আসলেই অস্তিত্ব আছে? গোড়া থেকে শুরু করা যাক।

তিন

প্রথমবারের মতো একমেরু চুম্বকের ধারণা দেন পিয়েরে কুরি, ১৮৯৪ সালে। তিনি মূলত একটা কণার অস্তিত্বের সম্ভাবনার কথা বলেন, যার বৈদ্যুতিক চার্জ নয়, বরং চৌম্বকীয় চার্জ আছে; অর্থাৎ চৌম্বকীয় একমেরু। অর্থাৎ ইলেকট্রনের মতো একটি কণা, যার বৈশিষ্ট্য হবে—এতে দুটি নয়, একটি চৌম্বকীয় মেরু থাকবে।

আরও পড়ুন

এরপর এ বিষয় নিয়ে অনেক দিন উল্লেখযোগ্য কোনো কাজ হয়নি। এর অনেক বছর পরে বিষয়টি নিয়ে কাজ শুরু করেন গত শতাব্দীর অন্যতম সেরা পদার্থবিদ পল ডিরাক। ১৯৩১ সালে ডিরাক এ বিষয়ে একটি প্রবন্ধ লেখেন। তিনি দেখান, মহাবিশ্বে যদি একটিও একমেরু চুম্বকের অস্তিত্ব থাকে, তবে সব বৈদ্যুতিক চার্জ কোয়ান্টায়িত হতে হবে। কোয়ান্টায়িত মানে বৈদ্যুতিক চার্জ কেবল বিচ্ছিন্ন মানের হতে পারবে, যেমন ১ একক চার্জ বা ২ একক চার্জ। কিন্তু ১.১ একক চার্জ বা এ রকম ভগ্নাংশে হতে পারবে না। বৈদ্যুতিক চার্জ কোয়ান্টায়িত হওয়া কোয়ান্টাম বলবিদ্যার একটা শর্ত। কাজেই এটা ডিরাকের চৌম্বকীয় একমেরুর অস্তিত্বের ধারণার সঙ্গে মিলে যায়। কিন্তু এটা সন্দেহাতীতভাবে একমেরু চুম্বকের অস্তিত্ব প্রমাণ করে না। সত্তর ও আশির দশকে ডিরাকের এই চৌম্বকীয় একমেরু বা ম্যাগনেটিক মনোপোল নিয়ে বেশ কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে। তবে এসব পরীক্ষা থেকে সুনিশ্চিত কোনো ফলাফল পাওয়া যায়নি।

ডিরাকের এই একমেরুর ধারণা কিন্তু বিদ্যুৎ ও চুম্বকত্বের জন্য আবশ্যক নয়। একমেরু ছাড়াও বিদ্যুৎ ও চুম্বকত্বের বর্তমান তত্ত্ব সংগতিপূর্ণ। তবু বিষয়টি একটা ‘কিন্তু’ হয়ে রয়েছে পদার্থবিজ্ঞানের জগতে।

কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যায় বিভিন্ন তত্ত্বকে ব্যাখ্যা করার জন্য একধরনের বিশেষ গাণিতিক কাঠামো ব্যবহার করা হয়। বিদ্যুৎ ও চুম্বকত্বের জন্য যে বিশেষ ধরনের কোয়ান্টাম বলবিদ্যা ব্যবহার করা হয়, তাকে বলে কোয়ান্টাম ইলেকট্রোডায়নামিকস। এই তত্ত্বে অনেক ধরনের প্রতিসাম্য থাকে।

পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র প্রতিমুহূর্তে ক্ষতিকর মহাজাগতিক রশ্মি থেকে রক্ষা করছে পৃথিবীকে

প্রতিসাম্য মানে বিশেষ কিছু কাজ করার পরও প্রতিসম বস্তু, পরিমাপক বা তত্ত্বের কোনো পরিবর্তন না হওয়া, যেমন মানুষ বা অন্য প্রাণীর দেহের ভেতর ডান-বাম প্রতিসাম্য রয়েছে। আমাদের শরীরের ডান পাশ আর বাঁ পাশ এক রকম। আবার উদ্ভিদজগতে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় ঘূর্ণন প্রতিসমতা, যেমন ধরুন, চার পাপড়ির একটা ফুল। তার ডাল ধরে ৯০ ডিগ্রি ঘোরালেও দেখতে ঠিক একই রকম লাগবে। যদি কোনো কারণে একটা পাপড়ি ভেঙে পড়ে যায়, তখন আমরা বলব, এই ঘূর্ণন প্রতিসমতা ভেঙে গেছে। আমাদের প্রকৃতিতে এমন অনেক ধরনের প্রতিসাম্য আছে। আবার কিছু প্রতিসমতার ধারণা শুধুই গাণিতিক। এ ধরনের একটি প্রতিসাম্য বা সিমেট্রিকে বলে ‘গেজ সিমেট্রি’। এই প্রতিসাম্য আছে বলেই কোয়ান্টাম ইলেকট্রোডায়নামিকসকে গেজতত্ত্ব বলা হয়। অর্থাৎ এটা একধরনের গেজতত্ত্ব। এ ছাড়া আরও কিছু গেজতত্ত্ব আছে, যেখানে একমেরুর অস্তিত্ব আছে। এটা তত্ত্বসংশ্লিষ্ট প্রতিসমতার সঙ্গে সম্পর্কিত এবং আবশ্যকীয় একটি বিষয়। এ ধরনের এক মেরুকে তুফত-পোলিয়াকভ মনোপোল বলা হয়। তারা ডিরাক মনোপোল থেকে গাণিতিকভাবে আলাদা।

তার মানে কখনো যদি বিজ্ঞানীরা, আমাদের মহাজাগতিক গোয়েন্দারা সবকিছুর তত্ত্ব খুঁজে পান, তবেই হয়তো আমরা এ প্রশ্নের নিশ্চিত একটি জবাব পাব যে একমেরু চুম্বকের অস্তিত্ব আসলেই রয়েছে কি না।

আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব স্ট্রিং থিওরি। অনেকের ধারণা, এটি হতে পারে আমাদের সবকিছুর তত্ত্ব। এ তত্ত্বও গাণিতিকভাবে একমেরুর অস্তিত্বের কথা বলে। একইভাবে কসমোলজি বা সৃষ্টিতত্ত্বও একমেরুর কথা বলে। সৃষ্টিতত্ত্ব মূলত মহাবিশ্বের সৃষ্টি ও এর ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলে। এতেও একমেরুর ধারণা স্পষ্ট। বিজ্ঞানীদের ধারণা, শিশুমহাবিশ্বের পরিস্থিতি যেহেতু আমাদের আজকের মহাবিশ্ব থেকে অনেকটা ভিন্ন ছিল, অনেক উত্তপ্ত ছিল, তাই সম্ভবত সেই মহাবিশ্বে একমেরু চুম্বকের অস্তিত্ব ছিল। কিন্তু এর কোনো প্রমাণ আজও পাওয়া যায়নি।

শুধু প্রকৃতিতে নয়, পরীক্ষাগারেও একমেরু চুম্বকের দেখা পাওয়ার অনেক চেষ্টা করেছেন বিজ্ঞানীরা, যেমন ২০১১ থেকে সার্নের এ প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে। মনোপোল অ্যান্ড এক্সোটিকস ডিটেক্টর অ্যাট দ্য লার্জ হ্যাড্রন কলাইডার (Monopole and Exotics Detector at the Large Hadron Collider—MoEDAL) নামের এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো একমেরু চুম্বক খুঁজে বের করা। প্রস্তাব অনুযায়ী প্রকল্প পরিচালনা করেও কোনো সাফল্য পাওয়া যায়নি। এর একটা সম্ভাব্য কারণ হলো বিজ্ঞানীদের ধারণা, একমেরু চুম্বকের জন্য পরীক্ষাটি পরিচালনা করতে যে পরিমাণ শক্তির প্রয়োজন, তা সার্নের বর্তমান সক্ষমতার বাইরে। সুনির্দিষ্ট সংখ্যা বললে বিষয়টি আরেকটু ভালোভাবে বোঝা যাবে।

এমনিতে ইলেকট্রনের স্পিন ধর্ম একটি বিমূর্ত ধারণা। নামটি ‘স্পিন’, যার বাংলা হয় ঘূর্ণন। তাই অনেকে মনে করেন, ইলেকট্রন স্পিন করে মানে ঘোরে

সার্নের পার্টিকেল অ্যাকসিলারেটর বর্তমানে প্রায় ১০ টেরা ইলেকট্রন ভোল্টের মতো শক্তিতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে পারে। বিভিন্ন তত্ত্ব থেকে গাণিতিকভাবে অনুমান করা হয়, মনোপোল দেখতে হলে এই পরীক্ষা করতে হতে পারে সর্বোচ্চ ১০১৪ টেরা ইলেকট্রন ভোল্টে। ১০১৪ মানে একের পরে ১৪টি শূন্য। এটা একমেরু চুম্বকের জন্য পরিচালিত প্রয়োজনীয় পরীক্ষায় শক্তির ঊর্ধ্বসীমা। অর্থাৎ সর্বোচ্চ এই শক্তির প্রয়োজন হতে পারে, তবে এর কম শক্তিতেও কাজ হতে পারে। যদি আসলেই এতটা শক্তির প্রয়োজন হয়, তবে নিকট ভবিষ্যতে পরীক্ষাগারে একমেরু চুম্বক পাওয়ার সম্ভাবনা নেই বললে চলে।

বিশ শতকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদার্থবিজ্ঞানী রিচার্ড ফাইনম্যানের একটা কথা আছে, মহাবিশ্বের নিয়মগুলো খানিকটা সুবিশাল পরিসরে চলমান একটা দাবা খেলা বোঝার মতো। আপনি যদি আগে থেকে নিয়মগুলো না জানেন, শুধু কিছুটা সময় এই খেলা দেখে নিয়মগুলো বের করা কঠিন। মহাবিশ্বের জন্মের প্রায় ১ হাজার ৩৮০ কোটি বছর পর আমাদের বিজ্ঞানচর্চার শুরু। এই খেলার অল্প কিছু নিয়ম আমরা কেবল জানি।

তার মানে কখনো যদি বিজ্ঞানীরা, আমাদের মহাজাগতিক গোয়েন্দারা সবকিছুর তত্ত্ব খুঁজে পান, তবেই হয়তো আমরা এ প্রশ্নের নিশ্চিত একটি জবাব পাব যে একমেরু চুম্বকের অস্তিত্ব আসলেই রয়েছে কি না। বর্তমানের বেশির ভাগ তত্ত্ব এই একমেরু চুম্বকের অস্তিত্বের কথা বলে। তবে আজও এটি আমাদের কাছে অধরা রহস্যই রয়ে গেছে।

সূত্র: নেচার, সায়েন্টিফিক আমেরিকান, উইকিপিডিয়া ও বিজ্ঞানচিন্তা

*লেখাটি ২০২৩ সালে বিজ্ঞানচিন্তার আগস্ট সংখ্যায় প্রকাশিত

আরও পড়ুন