বিজ্ঞান জগতে মাইকেল ফ্যারাডে এক অনন্য প্রতিভা। প্রথাগত শিক্ষা ছাড়াই পদার্থবিদ্যা ও রসায়নের জগতে বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন তিনি। সাধারণ বই বাঁধাইয়ের কারিগর থেকে হয়ে ওঠেন বিজ্ঞানী। বিদ্যুৎ ও চুম্বকের ওপর তাঁর যুগান্তকারী গবেষণা ভবিষ্যতে অনেক বড় আবিষ্কারের ভিত্তি গড়ে দেয়। বলা যায়, আধুনিক বৈদ্যুতিক সভ্যতার ভিত্তি গড়ে উঠেছে তাঁর ও বিজ্ঞানী ম্যাক্সওয়েলের হাতে। বলা যায়, পরোক্ষভাবে আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্বেও তাঁর গবেষণার ভূমিকা ছিল।
সম্প্রতি তাঁর হাতে লেখা কিছু পুরাতন নোটবুক প্রথমবারের মতো ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশ করা হচ্ছে। এই নোটবুকগুলোতে ১৮১২ সালে রয়্যাল ইনস্টিটিউশনে বিজ্ঞানী স্যার হামফ্রি ডেভির দেওয়া কিছু লেকচারের হাতে লেখা নোট রয়েছে। সেই সময় ১৩ বছর বয়সে স্কুল ছাড়তে বাধ্য হওয়ায় ফ্যারাডে বই বাঁধাইয়ের কাজ করতেন। কিন্তু তাঁর বিজ্ঞান শেখার অদম্য ইচ্ছা ছিল। তিনি ডেভির লেকচারগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনে নিজ হাতে সুন্দরভাবে লিখে রেখেছিলেন। এমনকি লেকচারের বিষয়গুলো বুঝতে ছবি এঁকে নোটও তৈরি করেছিলেন।
এ ব্যাপারে রয়্যাল ইনস্টিটিউশনের হেরিটেজ বিভাগের প্রধান শার্লট নিউ বলেন, ‘এই নোটবুকগুলোর কোনোটিই গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা হয়নি। সাধারণ মানুষের কাছে নোটগুলো প্রায় অজানা ছিল।’
ফ্যারাডে এই নোটবুক ডেভিকে উপহার দেন, যাতে তিনি বিজ্ঞান গবেষণার জগতে প্রবেশের সুযোগ পান। আসলে রয়্যাল ইনস্টিটিউশনে একটা চাকরি প্রত্যাশা করেছিলেন ফ্যারাডে। ডেভি অবশ্য প্রথমে ফ্যারাডেকে প্রত্যাখ্যান করেন। কিন্তু কিছুদিন পর যখন রয়্যাল ইনস্টিটিউশনের এক গবেষণা সহকারী চাকরি হারান, তখন ফ্যারাডেকে সুযোগ দেন ডেভি। নতুন চাকরিতে বই বাঁধাইয়ের চেয়ে কম বেতন পেতেন ফ্যারাডে। কিন্তু গবেষণাগারে কাজ করার সুযোগ পাবেন ভেবে চাকরিটা নিয়ে নেন। এরপর বিদ্যুৎ ও চুম্বকত্ব নিয়ে গবেষণা শুরু করেন তিনি।
পরের ৫৫ বছরে ফ্যারাডে বিজ্ঞান জগতে একের পর এক যুগান্তকারী আবিষ্কার করেন। ১৮২১ সালে তিনি ঘূর্ণমান চৌম্বকক্ষেত্রের কারণে বিদ্যুৎ সৃষ্টির বিষয়টি আবিষ্কার করেন, যা আধুনিক বৈদ্যুতিক মোটরের ভিত্তি গড়ে দেয়। ১৮২৩ সালে প্রথম গ্যাস তরল করে দেখান তিনি এবং ১৮৩১ সালে বৈদ্যুতিক জেনারেটর তৈরি করেন। একই বছর ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ইনডাকশনের সূত্র আবিষ্কার করেন, যা বিদ্যুৎ উৎপাদনের মূল ভিত্তি। এ ছাড়াও তিনি আয়ন, ক্যাথোড ও ইলেকট্রোড—এরকম কিছু বৈজ্ঞানিক শব্দ (পরিভাষা) তৈরি করেন এবং প্রমাণ করেন, আলো ও তড়িৎ-চৌম্বকত্ব পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত। আইনস্টাইন ফ্যারাডেকে এত গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন যে তিনি নিজের গবেষণাগারের দেয়ালে ফ্যারাডের ছবি ঝুলিয়ে রাখতেন।
ফ্যারাডে কেবল বিজ্ঞানীই ছিলেন না, তিনি বিজ্ঞান শিক্ষা ছড়িয়ে দিতেও কাজ করেছেন। ডেভির কাছে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি ১৮২৫ সালে জনপ্রিয় রয়্যাল ইনস্টিটিউশন ‘ক্রিসমাস লেকচার’ শুরু করেন, যা আজও ব্রিটেনে বিজ্ঞান শিক্ষার অন্যতম বড় আয়োজন। রয়্যাল ইনস্টিটিউশন আজও এই লেকচার আয়োজন করে।
এই নোটবুকগুলোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ আগামী ২৪ মার্চ প্রথমবারের মতো অনলাইনে প্রকাশ করা হবে। এই দিনই ফ্যারাডে তাঁর বিখ্যাত ক্রিসমাস লেকচার শুরু করেছিলেন। অর্থাৎ আগামী ২৪ মার্চ ক্রিসমাস বক্তৃতার ২০০ বছর পূর্তি হবে। ধাপে ধাপে তাঁর সব নোটবুক ডিজিটাইজ করে প্রকাশ করা হবে, যাতে নতুন প্রজন্ম সহজেই তাঁর গবেষণা সম্পর্কে জানতে পারে।
ফ্যারাডের জীবন প্রমাণ করে, জানার ইচ্ছা থাকলে কোনো সীমাবদ্ধতাই বাধা হতে পারে না। এক সাধারণ বই বাঁধাইয়ের কারিগর থেকে তাঁর বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী হয়ে ওঠার গল্প আজও বিজ্ঞানপ্রেমীদের অনুপ্রেরণা জোগায়।