ফিচার
ফোর কালার থিওরেম: ১০০ বছর পুরোনো রহস্য এবং গাণিতিক গবেষণায় কম্পিউটার যুগের সূচনা
জানেন তো, যেকোনো মানচিত্র আঁকতে শুধু চারটি রং লাগে? প্রশ্ন হলো, কেন? কীভাবে জানা গেল, আসলেই শুধু চার রং দিয়ে যেকোনো মানচিত্র আঁকা সম্ভব? এই সেই ঐতিহাসিক শতবর্ষ পুরাতন রহস্য, যার সমাধানে প্রথম কম্পিউটার ব্যবহৃত হয় গাণিতিক গবেষণায়…
ছোট্ট একটি প্রশ্ন
প্রশ্নটা সাধারণ। হয়তো দুবার ভাবার মতোও নয়। তবু সমস্যাটা হুট করে তাঁর মাথায় ঢুকে পড়ল। সেটা ১৮৫২ সালের কথা। ফ্রান্সিস গুথরি তখনো শিক্ষার্থী (ভবিষ্যতে তিনি হয়ে উঠবেন খ্যাতনামা গণিতবিদ ও উদ্ভিদবিজ্ঞানী)। মন দিয়ে আঁকছিলেন ইংল্যান্ডের মানচিত্র। হঠাৎ খেয়াল করলেন, এই মানচিত্রের সব কটি কাউন্টিকে নানা রঙে রাঙাতে চারটি রঙের বেশি তাঁর ব্যবহার করতে হচ্ছে না। অথচ এমনভাবেই তিনি মানচিত্রটা আঁকছেন যে পাশাপাশি কোনো দুটি কাউন্টিতে একই রং পড়েনি।
প্রথমে এটাকে সাধারণ ব্যাপারই মনে হলো। কিন্তু পরক্ষণেই ভাবলেন—এই নিয়ম কি সব মানচিত্রের জন্যই সত্য? যদি পৃথিবীর যেকোনো রঙিন মানচিত্র আঁকতে সর্বোচ্চ চারটি রঙের বেশি না লাগে, অর্থাৎ চার রং দিয়েই যেকোনো মানচিত্র নিখুঁতভাবে রাঙানো যায়, তাহলে কি এটা নিছক কাকতাল, নাকি গণিতের গভীরে লুকানো কোনো অলঙ্ঘনীয় নিয়ম?
ডিসক্রিট ম্যাথমেটিকস বা বিচ্ছিন্ন গণিতের একটা কৌশল এটা। সহজ করে বললে, বড় যেকোনো মানচিত্রে (বা গ্রাফে) কিছু ছোট ছোট নির্দিষ্ট অংশেরই বারবার পুনরাবৃত্তি হয়।
এই বিষয়টি তিনি জানালেন নিজের ভাই ফ্রেডরিখ গুথরিকে। ফ্রেডরিখ তখন ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক অগাস্টাস দে মরগানের ছাত্র। এই প্রফেসরের কাছেই তিনি নিজেও পড়েছেন আগে। দুই ভাই আলাপ করে অগাস্টাসকে চিঠি লিখলেন। এই ধারাবাহিকতায় প্রশ্নটি ছাপা হলো ব্রিটিশ ম্যাগাজিন দ্য অ্যাথেনিয়াম-এ, ১৮৫৪ সালে। এতে বিষয়টিকে উল্লেখ করা হলো ‘ফোর কালার থিওরেম’ নামে। বাংলা করলে যার অর্থ দাঁড়ায়, চার রঙা উপপাদ্য।
এই ছোট্ট প্রশ্নটিই গণিতের ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘ বিতর্কের জন্ম দেয়।
***
ফোর কালার থিওরেমের বিবৃতিটা আরেকবার দেখে নেওয়া যাক। এটি বলে, যেকোনো সমতল মানচিত্রে সংলগ্ন অঞ্চলগুলোকে ভিন্ন ভিন্ন রঙে রাঙাতে সর্বোচ্চ চারটি রঙই যথেষ্ট। অর্থাৎ কোনো মানচিত্র আঁকার সময় চারটি রং এমনভাবে ব্যবহার করা সম্ভব, যেখানে যেকোনো দুটি পার্শ্ববর্তী দেশ—অর্থাৎ যাদের মধ্যে সাধারণ সীমান্ত রয়েছে, এমন দেশগুলো—কখনোই একই রঙে আঁকা হবে না।
শুনতে তো সহজই মনে হচ্ছে। মানচিত্রের ক্ষেত্রে বিষয়টাকে অত বড় করে ভাবাও হয়নি। কিন্তু পরে দেখা গেল, এটা আসলে গ্রাফ থিওরির একটা বড় সমস্যা।
গ্রাফ থিওরি কী? গণিত বা কম্পিউটারবিজ্ঞানের যে শাখা গ্রাফ নিয়ে কাজ করে, সেটাই গ্রাফ থিওরি। গ্রাফ মানে, এতে কিছু বিন্দু থাকবে, কিছু রেখা এই বিন্দুগুলোর কোনো কোনোটি বা সব কটিকে যুক্ত করবে। শুধু মানচিত্র না, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, টেলিকমিউনিকেশন ম্যাপিং, বায়োমেডিক্যাল রিসার্চ, রাসায়নিক অণুর মডেল, কোয়ান্টাম কম্পিউটিংসহ নানা ক্ষেত্রে এই থিওরি ব্যবহৃত হয়। সঙ্গত কারণেই সমস্যাটা সমাধান করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল। কিন্তু এই সমস্যার প্রমাণ করতে গিয়ে থতমত খেয়ে গেলেন গণিতবিদেরা।
প্রায় ১০০ বছর ধরে নানা তর্ক-বিতর্কের মধ্য দিয়ে সমস্যাটা টিকে রইল। ইতিহাসে এই প্রথম কোনো সমস্যা সমাধান করতে কম্পিউটারের সাহায্য নিতে বাধ্য হলেন বিজ্ঞানীরা।
১৯৩৬টি মৌলিক কনফিগারেশন বা ধরনের নির্দিষ্ট কিছু অংশকে এককের মতো ব্যবহার করে সব ধরনের মানচিত্র আঁকা সম্ভব। এর মানে দাঁড়ায়, এই ১৯৩৬টি কনফিগারেশন তৈরি করতে চারটি রং যথেষ্ট বলে যদি প্রমাণ করা যায়
কিন্তু কেন? এই সমস্যা এত জটিল হলো কী করে? আসলে ফোর কালার থিওরেম প্রমাণ করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা সংখ্যার বিশালতার কাছে আটকে গেলেন। সবধরনের মানচিত্রের জন্য এটি সত্য কিনা, তা নিশ্চিত করার উপায় কী? একটা উপায় হলো এর সাধারণ বা সার্বিক রূপ বের করা। সেটা তাঁরা করতে পারেননি। তাহলে গুনতে হবে, যাচাই করতে হবে নানা ধরনের মানচিত্র। সমস্যাটা ওখানেই—সব মানচিত্রের জন্য বিষয়টা আলাদাভাবে যাচাই করা ছিল প্রায় অসম্ভব! ধরা যাক, ১০ হাজার ধরনের মানচিত্রের জন্য বিষয়টা যাচাই করা হলো। কিন্তু ১০ হাজার ১তম ধরনের মানচিত্রটি যে ব্যতিক্রম হবে না, তার নিশ্চয়তা কী?
১০০ বছর পরে
প্রথমদিকে অনেক গণিতবিদ এই থিওরেম প্রমাণের চেষ্টা করলেন প্রাণপণে। কিন্তু প্রতিবারই কোথাও না কোথাও আটকে যাচ্ছিলেন তাঁরা। ১৮৭৯ সালে আলফ্রেড কোম্প নামে এক গণিতবিদ দাবি করলেন, তিনি উপপাদ্যটি প্রমাণ করেছেন। কিন্তু কয়েক বছর পর দেখা গেল, তাঁর যুক্তিতে ভুল ছিল। প্রায় ১০০ বছর পর, ১৯৫০-এর দশকে এসে গণিতবিদেরা নতুন এক কৌশল আবিষ্কার করলেন—ডিসচার্জিং মেথড। বাংলায় বলা যেতে পারে, অবক্ষেপণ পদ্ধতি।
ডিসক্রিট ম্যাথমেটিকস বা বিচ্ছিন্ন গণিতের একটা কৌশল এটা। সহজ করে বললে, বড় যেকোনো মানচিত্রে (বা গ্রাফে) কিছু ছোট ছোট নির্দিষ্ট অংশেরই বারবার পুনরাবৃত্তি হয়। এই অংশগুলোর আকার-আকৃতি ভিন্ন হতে পারে—কিন্তু দেখা গেল, এই নির্দিষ্ট ছোট অংশগুলো মোট ১৯৩৬ ধরনের হতে পারে। অর্থাৎ ১৯৩৬টি মৌলিক কনফিগারেশন বা ধরনের নির্দিষ্ট কিছু অংশকে এককের মতো ব্যবহার করে সব ধরনের মানচিত্র আঁকা সম্ভব। এর মানে দাঁড়ায়, এই ১৯৩৬টি কনফিগারেশন তৈরি করতে চারটি রং যথেষ্ট বলে যদি প্রমাণ করা যায়, তাহলে যেকোনো মানচিত্রের জন্য এই থিওরেম সত্য বলে প্রমাণিত হবে। কিন্তু এতগুলো কনফিগারেশন হাতে-কলমে করে দেখা তো সহজ নয়। বাধ্য হয়ে কম্পিউটারের সাহায্য নিলেন তাঁরা।
ফোর কালার থিওরেমের জন্য ইতিহাসে প্রথম এই কাজ করলেন বিজ্ঞানীরা। এই প্রথম কোনো তত্ত্ব প্রমাণে মানুষ পুরোপুরি কম্পিউটারের ওপর নির্ভর করল। কিন্তু অনেকেই এ নিয়ে প্রশ্ন তুললেন।
সেটা ১৯৭৬ সালের কথা। দুই মার্কিন গণিতবিদ কেনেথ অ্যাপেল ও উলফগ্যাং হাকেন সিদ্ধান্ত নিলেন, তাঁরা কম্পিউটারের সাহায্যে এই ১৯৩৬টি কনফিগারেশন পরীক্ষা করে দেখবেন। সে জন্য লেখা হলো বিশেষ কম্পিউটার প্রোগ্রাম। সেই প্রোগ্রাম যাচাই করে দেখাল, আসলেই মাত্র চারটি রং দিয়ে যেকোনো রঙিন মানচিত্র আঁকা সম্ভব।
এভাবে প্রমাণিত হলো ফোর কালার থিওরেম। এবং শুরু হলো অদ্ভুত এক বিতর্ক!
কম্পিউটারের প্রমাণ কি বিশ্বাসযোগ্য
আজ যখন কাউকে লোন দেওয়া কতটা ঝুঁকিপূর্ণ—তা যাচাই করা হয়, তখন কেউ কোনো প্রশ্ন করেন না। কম্পিউটার আজ শুধু অর্থনৈতিক বিশ্লেষণই করে না, নতুন রাসায়ণিক অণুর বিন্যাস কেমন হবে, আবহাওয়া বা জলবায়ুর প্যাটার্ন কিংবা বিভিন্ন গ্রহের অতীত ও ভবিষ্যতের অনুমান—সবই করে। কিন্তু এককালে মানুষ নিজ বুদ্ধিতে প্রমাণের ওপর নির্ভর করত। প্রথমে কাগজে-কলমে তত্ত্বটা প্রমাণ করা হতো। পরে প্রমাণিত বড় হিসাব-নিকাশ করতে কম্পিউটার কাজে লাগত সহায়ক যন্ত্র হিসেবে। অর্থাৎ ২ + ২ = ৪; এভাবে যোগ কাজ করে, এটুকু প্রমাণিত—এটা জেনে বড় কোনো যোগের জন্য কম্পিউটার ব্যবহার করা হতো। কিন্তু নতুন কিছু প্রমাণের জন্য কেউ কম্পিউটার ব্যবহার করত না।
ফোর কালার থিওরেমের জন্য ইতিহাসে প্রথম এই কাজ করলেন বিজ্ঞানীরা। এই প্রথম কোনো তত্ত্ব প্রমাণে মানুষ পুরোপুরি কম্পিউটারের ওপর নির্ভর করল। কিন্তু অনেকেই এ নিয়ে প্রশ্ন তুললেন। কম্পিউটার কি আসলেই বিশ্বাসযোগ্য? সত্যিই কোনো ভুল করেনি তো? কিন্তু নানাভাবে পরীক্ষা করেও দেখা গেল, কম্পিউটার ভুল করেনি। ২০০৫ সালে আরও আধুনিক কম্পিউটারের সাহায্যে আরও নিখুঁতভাবে বিষয়টি যাচাই করা হয়। দেখা গেল, ফোর কালার থিওরেম আসলেই কাজ করে।
এভাবে গাণিতিক গবেষণার অংশে পরিণত হলো কম্পিউটার, পরিণত হলো যেকোনো তত্ত্ব ব্যবহারের কাজে নির্ভরযোগ্য টুলে। এভাবে মানুষ যন্ত্রের ওপর নির্ভর করতে শিখল। সূচনা হলো এক নতুন দিগন্তের।