বিজ্ঞান ভাবনা
বৈজ্ঞানিক ঐতিহ্যের স্রোতোধারা
আমাদের শিশু-কিশোরেরা মহাজাগতিক চিন্তার সঙ্গে কতটা পরিচিত? কীভাবে এগোচ্ছে বাংলাদেশে বিজ্ঞানচর্চার ধারা? বৈজ্ঞানিক ঐতিহ্যের স্রোতোধারা নিয়ে…
বিভিন্ন স্কুল-কলেজে বিজ্ঞান উৎসবে যাওয়ার সুবাদে শিশু-কিশোরদের সঙ্গে একধরনের ভাব বিনিময় হয়। অভিভাবকদের অভিজ্ঞতা ও নিজের পর্যবেক্ষণে ধরা দেয়, এখনকার কিশোরেরা ভীষণভাবে অস্থির ও কিছুটা রুক্ষ। অভিভাবকদের সঙ্গে এ প্রজেন্মের যোগাযোগে মারাত্মক দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে, সম্পর্ক একরকম ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। এর কারণ কি শুধুই রাজনৈতিক অস্থিরতা, শিক্ষায় অপর্যাপ্ততা? না, তার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে প্রযুক্তির আগ্রাসন। কারণ, শিক্ষা আমাদের সেই সাংস্কৃতিক অবস্থানে নিয়ে যেতে পারছে না, যার দ্বারা প্রযুক্তির সুস্থির ব্যবহার করতে পারি। মাঠঘাট ও নদী–নালাহীন খোলা জায়গা-শূন্য জীবন ও যুক্তিহীন মন তৈরি করছে। ফলে অভিজ্ঞতা, অতীত, ঐতিহ্য, এমনকি চারপাশের জগৎ শিশু–কিশোরদের মানসপট ধারণ করতে পারছে না; এগুলো থেকে প্রজন্ম পৃথক হয়ে পড়েছে। পরিণত করেছে প্রাযুক্তিক সুবিধা ভোগের এক অন্তহীন চোরাবালিতে।
কিন্তু এর মধ্যেও আশা জেগে ওঠে, যখন দেখি শিশু–কিশোরেরা নিজেদের পথ খুঁজে ফিরছে। দেড় দশক ধরে যেখানে যাই, সেখানে তার অদ্ভুত কিছু আভাস পাই। এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হই, যা আমাকে চমকে দেয়। ভাবনার অনেক গভীরে না গেলে এ ধরনের কথা বলা সম্ভব নয়।
একবার চট্টগ্রামের এক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী প্রশ্ন করে বসল: ‘আজও আমরা যখন বলি সূর্য ওঠে, সূর্য ডোবে; তা তো এ কথাই বলে—সূর্যের চারদিকে নয়, পৃথিবীর চারদিকে সূর্য ঘোরে।’ আমি চুপ হয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকি। অনুভব করি বুদ্ধিবৃত্তিক অর্জনকে সাধারণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যাপারে পৃথিবীর সংস্কৃতিগুলোর ব্যর্থতা। এ রকম আরেকটি জায়গা, বিশ্ব মহাকাশ সপ্তাহ উপলক্ষে চিত্রাঙ্কন মেলায় শিশুদের চিত্রকর্ম দেখার সুযোগ হয়েছিল। কয়েকটি চিত্রকর্ম আমাকে চমকে দিয়েছিল। ছবিগুলো দেখে আমার মনে হচ্ছিল, সম্প্রতি যে গ্রহ-নক্ষত্র আবিষ্কার, বহির্জাগতিক প্রাণের অনুসন্ধান এবং মহাজগৎ নিয়ে ভাবনা, তা শুধু বিজ্ঞানীদের প্রভাবিত করেনি, শিশুদের মানসজগৎকে প্রবলভাবে আলোড়িত করেছে। তার প্রতিফলন দেখেছি এ ছবিগুলোতে। অর্থাৎ বাংলাদেশেও সেই ছোঁয়া লেগেছে। এগুলো বলছে, এখানকার শিশুরাও আজ মহাজাগতিক চিন্তার ক্ষেত্র থেকে দূরে নয়। তাদের কল্পনায় ধরা দিচ্ছে মহাবিশ্ববিষয়ক অসীম চিন্তার আকাশ। এসব ভাবনা রংতুলিতে ফুটিয়ে তুলতে তাদের কষ্ট হচ্ছে না এতটুকু। রাজনৈতিক অবস্থা বা সামাজিক পরিস্থিতি যত জটিলই হোক না কেন, শিশুর মানসজগৎ ক্রমেই মহাজগতে ছড়িয়ে পড়ছে। তাদের ছবিগুলো বলছে, সব বাধা অতিক্রম করে আমরা এক অনাবিল ভবিষ্যতে পৌঁছাব।
পরিসংখ্যানবিদ প্রশান্ত মহলানবিশ ও সত্যেন্দ্রনাথ বসুর ছাত্র কাজী মোতাহার হোসেনের কথা বলা যায়; অথবা প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখা, সহযোগিতা ছাড়া যশোরের বকচর গ্রাম থেকে রাধা গোবিন্দের কথা চিন্তা করতে পারি। কীভাবে ৩৭ হাজার পরিবর্তনশীল (ভেরিয়েবল) নক্ষত্রকে লিপিবদ্ধ করেছিলেন তিনি।
এসব দৃশ্যকল্প আপন কল্পনায় কীভাবে শিশুরা ধারণ করল, এই প্রেক্ষাপট কীভাবে তাদের পথ দেখাল, তা আমার কাছে স্পষ্ট নয় বা বিজ্ঞানের সামাজিকীকরণও এখানে খুব একটা দৃশ্যমান নয়। শুধু বুঝেছি, শিশুর মানস গঠনে একটা প্রস্তুতি চলছে, নানা রকম পারিপার্শ্বিক প্রণোদনা বিজ্ঞানকে সংস্কৃতির অঙ্গীভূত করে সমাজ জাগাতে চাচ্ছে, পৌঁছাতে চাচ্ছে মহাজাগতিক মিলনমেলায়। তার প্রস্তুতি দেখা যাচ্ছে শিশুর মানস গঠনে, অর্থাৎ ভবিষ্যতের বাঙালি প্রজন্মের মধ্যে। তা যদি ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তাহলে বাঙালিরা পৃথিবীর নাগরিক হয়ে বিশ্ব মিলনমেলায় পৌঁছাতে পারবে।
হাঁটি হাঁটি পা ফেলে পদচারণ শুরু হয়েছিল বাঙালি সমাজে ঊনবিংশ শতাব্দীর সাতের দশকে জীবপদার্থবিজ্ঞানের পথিকৃৎ জগদীশচন্দ্র বসু, রসায়নের দিক্পাল আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের হাত ধরে। আমরা যদি আরেকটু সূক্ষ্মভাবে দৃষ্টিপাত করি, তাহলে দেখব ১৮৪৫-৫০–এর মধ্যে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, জগদীশ ও প্রফুল্লচন্দ্রের জন্মের আগে বিজ্ঞানের প্রাথমিক পাঠের বই রচনায় হাত দিয়েছিলেন। হঠাৎ জ্বলে ওঠা সেই স্ফুলিঙ্গ জগদীশচন্দ্র যেন তীব্রভাবে প্রজ্বালিত করে দীপশিখা আকারে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন শুধু বাংলা নয়, ভারতবর্ষজুড়ে। জগদীশচন্দ্র বসুকে চেনার উপায় গাছের সংবেদনশীলতা পরিমাপের আবিষ্কারক হিসেবে নয়, বেতারযন্ত্রের উদ্ভাবক হিসেবেও নয়, বরং বহির্জগতের চেতন-অচেতন পদার্থের সঙ্গে বেতার টেলিস্কোপে যোগাযোগের বর্তমানে যে চেষ্টা চলছে, সেখানে জগদীশের আবিষ্কৃত মিলিমিটার ওয়েভ বা তরঙ্গ (যেমন আটকামা লার্জ মিলিমিটার অ্যারেতে) প্রধান ভূমিকা রেখে চলেছে। সত্যি এটা আমাদের শিহরিত করে। রসায়নবিদ প্রফুল্লচন্দ্র রায় তাঁর জীবনব্যাপী কর্মোদ্দীপনা দিয়ে রসায়নচর্চার রীতিমতো অবকাঠামো তৈরি করে দিয়ে গেলেন এ অঞ্চলে। তিনি বলেন, ‘বিজ্ঞানের অনুশীলন কেবল বিজ্ঞানের জন্যই করিতে হবে এবং তাহার জন্য আত্মোসর্গ করিতে পারে, এমন লোকের প্রয়োজন।...ইউরোপে গত শতাব্দী ধরে বিজ্ঞানের এমন সব সেবক জন্মিয়াছেন, যাহারা কোনোরূপ আর্থিক লাভের আশা না করিয়া বিজ্ঞানের জন্য বিজ্ঞানচর্চা করিয়াছেন।’ এ ধারার পথ ধরে কোয়ান্টাম পরিসংখ্যানের জনক সত্যেন্দ্রনাথ বসু, জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানের জনক মেঘনাদ সাহাদের অবদান আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে জ্বলজ্বল করছে। সত্যেন্দ্রনাথ বসু স্রেফ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের এক কক্ষে বসে কোয়ান্টাম পরিসংখ্যানের পথ দেখালেন। যে তত্ত্ব বলে দুই ধরনের কণা মহাবিশ্ব গঠনে ভূমিকা রাখে, তার একটি—বোসন কণা কোয়ান্টাম পরিসংখ্যান মেনে চলে।
এ ছাড়া পরিসংখ্যানবিদ প্রশান্ত মহলানবিশ ও সত্যেন্দ্রনাথ বসুর ছাত্র কাজী মোতাহার হোসেনের কথা বলা যায়; অথবা প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখা, সহযোগিতা ছাড়া যশোরের বকচর গ্রাম থেকে রাধা গোবিন্দের কথা চিন্তা করতে পারি। কীভাবে ৩৭ হাজার পরিবর্তনশীল (ভেরিয়েবল) নক্ষত্রকে লিপিবদ্ধ করেছিলেন তিনি। তাঁর আবিষ্কার, ‘মানচিত্রে না থাকা আকাশে একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র দেখতে পাওয়া’, সময়টা ছিল ১৯১৮ সালের ৭ জুন। নোভা অ্যাকুইলা-৩ ১৯১৮ নামের পরিবর্তনশীল এই পর্যবেক্ষণের কথা হার্ভার্ড মানমন্দিরে জানালে তাঁকে আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন অব ভেরিয়েবল স্টার অবজারভার (AAVSO) সম্মানসূচক সদস্যপদ প্রদান করে। প্রাতিষ্ঠানিক, অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে অসাধারণ কর্মকাণ্ডের উদাহরণ বাংলাজুড়ে রয়েছে। কিন্তু ’৪৭-এর দেশভাগের ক্ষত এবং আমাদের মধ্যে বিজ্ঞান শিক্ষাকে সঠিকভাবে তুলে ধরতে না পারার কারণে ৭০ বছরেও বৈজ্ঞানিক ঐতিহ্য নির্মাণে আমরা সক্ষম হতে পারিনি।
স্বাধীনতা–উত্তর বাংলাদেশে বিজ্ঞানচর্চা ও প্রসারে অনেকেই কাজ করে গেছেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য আবদুল্লাহ আল–মুতী, যিনি বিজ্ঞানচর্চায় কিশোর–তরুণদের আগ্রহীকরণে সাড়া ফেলেছেন। তাঁর বই এবং সাংগঠনিক শক্তি আমাদের বিজ্ঞানে শুধু কৌতূহলী করেনি, তাঁর ভাষাশৈলী শৈশবমানসে স্বপ্ন দেখিয়েছে।
তারপরও থেমে থাকিনি আমরা। রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতাসংগ্রামের আত্মত্যাগীরা দেশগতভাবে না হলেও ধারণাগতভাবে বাংলাকে একীভূত হওয়ার সুযোগ করে দেন। আমরা বলতে পারলাম, ’৪৭–পূর্ব বিজ্ঞান গবেষক ও কর্মীরা আমাদের বৈজ্ঞানিক ধারার একটা অংশ। স্বাধীনতা–উত্তর বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নাম রসায়নবিদ ড. কুদরাত–এ–খুদা, যাঁর নামে বাংলাদেশ শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা প্রণয়নে এটি একটি শুভসূচনা ছিল, কিন্তু তেমন কিছু বাস্তবায়ন করা যায়নি। তাঁর নামে ১৮টি আবিষ্কারের প্যাটেন্ট রয়েছে। আমরা জানি শৈবালবিদ নুরুল ইসলামের কথা, যিনি শৈবালের একটি গণ এবং ২০০ প্রজাতি ও ভ্যারাইটি শনাক্ত করেছিলেন। এই শৈবালবিদ বিশ্ববিজ্ঞানে বাংলাদেশের মর্যাদা তুলে ধরেছিলেন। জানা যায়, তাঁর গবেষণাকর্ম মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ে সংরক্ষিত রয়েছে।
এ ধারার পরবর্তী উল্লেখযোগ্য সংযোজন কসমোলজিস্ট জামাল নজরুল ইসলাম এবং রায় চৌধুরী সমীকরণের স্রষ্টা বরিশালের অমল কুমার রায় চৌধুরীর কথা। অধ্যাপক জামাল নজরুলের মতো আপেক্ষিক তত্ত্ব নিয়ে এত দীর্ঘ সময় কেউ গবেষণা করেননি। প্রায় ৪০ বছর যে গবেষণার অনেক কিছুই বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানীদের সহযোগিতা করেছে। অমল কুমার রায় চৌধুরীর সমীকরণ পেনরোজ-হকিংয়ের কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে, সে কথা তাঁরাও বলেছেন। আমরা জানি, হরিধানের উদ্ভাবক হরিপদ কাপালীর দীর্ঘ সংগ্রামের পথপরিক্রমার কথা। গ্রামের এই কৃষকদের ঐতিহ্য পরম্পরা এবং অভিজ্ঞতাকে আপন আলোয় নিয়ে তাঁর খেতে ধানের সংখ্যা বেশি থাকা ধানের একটি গোছাকে আলাদা করে রাখেন। ধানগাছটিও পুরুষ্ট ছিল। তিনি ওই গোছাকে আলাদা করে লালন-পালন করেন। পরের বছর সেই গোছার ধান দিয়ে একটুখানি জায়গায় বীজতলা আর সেই চারা লাগালেন খানিক জায়গায়। ফলনের পর দেখা গেল এ ধানের ফলন বেশি। পরের বছর নিজের জমিতে কেবল নতুন ওই ধানের চাষ করতে থাকেন। আর পেয়ে যান বিআর-১১ কিংবা স্বর্ণার চেয়ে উচ্চফলনশীল ধান। এই কর্মকাণ্ড কৃত্রিম নির্বাচন বা আর্টিফিশিয়াল সিলেকশনের একটা গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হতে পারে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা মৌলিক নীতিমালার ভিত্তিতে তাঁর কাজের ব্যাখ্যা দিতে পারলে অন্যান্য কৃষক শুধু নন, গবেষকদেরও কাজের ক্ষেত্রে সুবিধা হতো এবং নিরাপদ খাদ্য তৈরির একটি পথ বিকশিত হতো। তবে আশাব্যঞ্জক যে বর্তমান সরকার নবম ও দশম শ্রেণির কৃষিশিক্ষা বইতে হরিপদ কাপালীর কথা ইতিমধ্যে অন্তর্ভুক্ত করেছে। তেমনিভাবে যদি জামাল নজরুল ইসলাম, রাধা গোবিন্দের নাম যুক্ত করা যেত, আমরা ঐতিহ্যের শক্তি ধারণে আরও এগিয়ে যেতাম।
স্বাধীনতা–উত্তর বাংলাদেশে বিজ্ঞানচর্চা ও প্রসারে অনেকেই কাজ করে গেছেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য আবদুল্লাহ আল–মুতী, যিনি বিজ্ঞানচর্চায় কিশোর–তরুণদের আগ্রহীকরণে সাড়া ফেলেছেন। তাঁর বই এবং সাংগঠনিক শক্তি আমাদের বিজ্ঞানে শুধু কৌতূহলী করেনি, তাঁর ভাষাশৈলী শৈশবমানসে স্বপ্ন দেখিয়েছে। আবদুল জব্বার এ দেশের জ্যোতির্বিদ্যার বিকাশে অগ্রপথিকই নন, একটি প্রতিষ্ঠানও বটে। বাংলা ভাষায় এ শাস্ত্রের যত গ্রন্থ রয়েছে, তার পুরোভাগে রয়েছে তাঁর গ্রন্থগুলো। বিশেষত তারা-পরিচিতি অনবদ্য ও অতুলনীয়। তিনি সারা জীবন চিন্তা করেছেন, নিরলস সাধনা করেছেন—মানুষকে বিকশিত করতে হবে, করতে হবে আধুনিক, বিজ্ঞানমনস্ক এবং বিজ্ঞানসচেতন।
বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া এক শিক্ষার্থী আমাকে একবার বলেছিলেন, ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে হেঁটে বেড়ালে এত নোবেল লরিয়েট এবং খ্যাতনামা বিজ্ঞানীদের দেখা মেলে, যাঁদের আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক অবদান, তখন নিজেরও বিশ্বমাপের কাজ করতে ইচ্ছা জাগে।
এ ছাড়া আছেন প্রকৃতিবিদ দ্বিজেন শর্মা, যিনি ষাটের দশক থেকে জীববিজ্ঞানের মৌলিক ধারণাগুলো মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য নিরলস চর্চা করে গেছেন। বংশগতিবিজ্ঞান ও রসায়নের অসাধারণ সব বইয়ের অনুবাদক তিনি। তিনি একজন সমাজতাত্ত্বিকও ছিলেন। প্রকৃতি সংরক্ষণে তাঁর যে প্রচেষ্টা, তা বলে শেষ করার মতো নয়। পদার্থবিদ এ এম হারুন অর রশীদ, বিজ্ঞানলেখক ও অধ্যাপক জহুরুল হক অনেক গ্রন্থ লিখে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বিজ্ঞানের আলো জ্বালানোর কাজ করে গেছেন। ড. এ আর খান ও ড. আলী আসগর নিরলসভাবে অধ্যাপনা করে গেছেন। এ দেশে ক্লাব পর্যায়ের বিজ্ঞান আন্দোলনে সশরীর উপস্থিত থেকে ভবিষ্যতের বিজ্ঞানী হওয়ার স্বপ্ন জুগিয়েছেন। আলী আসগর অনেক গ্রন্থ লিখেছেন, ছিলেন অনেক উদার মনের মানুষ; অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে উল্লেখযোগ্য আরেকজন ব্যক্তি হচ্ছেন এফ আর সরকার, যিনি নিজের গ্রাম সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুরকে বিশ্বে মহাকাশ গ্রাম হিসেবে পরিচিত করিয়েছিলেন।
বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া এক শিক্ষার্থী আমাকে একবার বলেছিলেন, ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে হেঁটে বেড়ালে এত নোবেল লরিয়েট এবং খ্যাতনামা বিজ্ঞানীদের দেখা মেলে, যাঁদের আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক অবদান, তখন নিজেরও বিশ্বমাপের কাজ করতে ইচ্ছা জাগে। বিশ্ববিজ্ঞানের স্রোতে মিশে যাওয়ার জন্য আমাদের প্রাথমিক উপাদান, আমাদের ঐতিহ্য বিকশিত হয়ে চলেছে। আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব রয়েছেন, যাঁদের নাম এখানে আসেনি। এভাবে বর্তমান সরকার যদি আমাদের সামগ্রিক বৈজ্ঞানিক ঐতিহ্য স্কুল-কলেজের শিক্ষার মাধ্যমে তুলে ধরে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেয়, তাহলে বাঙালিদের বিশ্ববিজ্ঞানের এক দারুণ ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে।