প্রথমবার তাঁকে বজ্রপাত আঘাত করে ১৯৪২ সালের এপ্রিলে। একটি ‘ফায়ার লুকআউট টাওয়ার’-এ লুকিয়ে ছিলেন সে সময়। থান্ডারস্টর্ম বা বজ্রঝড় চলছিল এলাকায়। ও থেকে বাঁচার জন্যই এই টাওয়ারে আশ্রয় নেন তিনি। সাধারণত বন বা জাতীয় উদ্যানে (ইংরেজিতে যাকে ন্যাশনাল পার্ক বা ন্যাশনাল ফরেস্ট বলা হয়) এ ধরনের টাওয়ার থাকে। দায়িত্বশীল কেউ এতে থাকেন, দেখেন—দাবানল বা এরকম কোনো দুর্ঘটনা ঘটছে কি না কোথাও।
সেই টাওয়ারটি কেবল কিছুদিন আগে বানানো হয়েছে। কোনো লাইটনিং রড নেই। এ ধরনের রডের কাজ, বজ্রপাত ওর ওপর এসে পড়ে। ফলে আশপাশের সবকিছু বেঁচে যায়। ওর মধ্য দিয়ে ব্যাপক বিদ্যুৎ বা বৈদ্যুতিক চার্জ চলে যায় মাটিতে।
লাইটনিং রডহীন টাওয়ারের ওপর সেদিন ৭-৮ বার বজ্রপাত হয়। আগুন ধরে যায় টাওয়ারে। তাঁর ভাষ্যে, ‘আগুন দাপাদাপি করছিল সবখানে।’ ছুট দিলেন আগুন থেকে বাঁচতে। কয়েক ফিট দূরে এসে হানা দিল স্বয়ং বজ্র। সেই আঘাতে ডান পায়ের আধা ইঞ্চির মতো পুড়ে গেল। পায়ের পাতায় বজ্র ছুঁয়ে গেল, হারালেন নখ। জুতোয় বড় ছিদ্র রয়ে গেল চিহ্ন হিসেবে।
বজ্রপাত প্রথম আশপাশের গাছে আঘাত করে, সেখান থেকে ছুটে এসে খোলা জানালা দিয়ে আঘাত করে তাঁকে। ফলে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন তিনি। পুড়ে যায় তাঁর ভ্রু, চুলে আগুন ধরে যায়। কিন্তু এবারেও বড় ক্ষতি থেকে বেঁচে যান তিনি।
এই ঘটনা কোনো বানানো গল্প নয়, বাস্তব। কিছু কিছু মানুষের কপালে হয়তো শনি লেখা থাকে। একের পর এক দুর্ভাগ্য বা অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে থাকে তাঁদের জীবনে। নাকি সৌভাগ্য বলা উচিৎ? নাহয় এরকম দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে ফেরা তো মুখের কথা নয়। ঠিক এরকম একজন অপরিসীম সৌভাগ্যবান (বা ভয়ংকর দুর্ভাগা) মানুষের গল্প এটি।
মানুষটির নাম রয় সুলিভান। এক জীবনে সাত সাতবার বজ্রাহত হয়েছেন তিনি। এবং বেঁচে গেছেন প্রত্যেকবার! অবিশ্বাস্য, তাই না?
রয় সুলিভানের জন্ম যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ার গ্রিন কাউন্টিতে। দিনটা ছিল ১৯১২ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি। যুক্তরাষ্ট্রের শেনান্ডোয়াহ ন্যাশনাল পার্কে রেঞ্জার হিসেবে চাকরি নেন ১৯৩৬ সালে। দীর্ঘদিন রেঞ্জারের দায়িত্ব পালন করেছেন। ওপরের দুর্ঘটনাটি এ সময়ই ঘটেছে।
দ্বিতীয় দুর্ঘটনাটি ঘটে ১৯৬৯ সালের জুলাইয়ে। পাহাড়ি রাস্তা ধরে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিলেন সুলিভান। সাধারণত গাড়ির ধাতব দেহ ফ্যারাডে কেজ হিসেবে কাজ করে, মানুষকে রক্ষা করে বজ্রপাত থেকে। কিন্তু এই বজ্রপাত প্রথম আশপাশের গাছে আঘাত করে, সেখান থেকে ছুটে এসে খোলা জানালা দিয়ে আঘাত করে তাঁকে। ফলে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন তিনি। পুড়ে যায় তাঁর ভ্রু, চুলে আগুন ধরে যায়। কিন্তু এবারেও বড় ক্ষতি থেকে বেঁচে যান তিনি। পাহাড়ি পথের কিনারে গিয়ে থেমে যায় গাড়ি।
পার্কে টহল দিয়ে বেড়াচ্ছিলেন। দেখলেন, ঝড়োমেঘ তৈরি হচ্ছে। দ্রুত ট্রাক চালিয়ে সরে এলেন সুলিভান। অবশেষে যখন নিজেকে নিরাপদ মনে হলো, ট্রাক থামিয়ে নামলেন। এর কিছুক্ষণ পরেই আঘাত করল বজ্র।
নিজের বাড়ির আঙিনাতেই তৃতীয়বারের মতো বজ্রপাত আঘাত হানে তাঁর ওপর। সেটা ছিল ১৯৭০ সালের জুলাইয়ের কথা। এবারে অবশ্য আঘাত করেনি ঠিক। কাছের এক বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমারে পরে তাঁর কাঁধ ছুঁয়ে গেছে।
এর দুই বছর পর, শেনানডোয়াহ ন্যাশনাল পার্কের ভেতরে এক রেঞ্জার স্টেশনে কাজ করছিলেন তিনি। এ সময় ফের আঘাত হানে বজ্রপাত। চুলে আগুন ধরে যায়, জ্যাকেট দিয়ে সেটা নিভিয়ে নেন তিনি। দ্রুত ছুটে যান বাথরুমে—তোয়ালে দিয়ে চুল মুছে ধাতস্থ হন। এ পর্যায়ে এসে মৃত্যুভয় তাঁকে ঘিরে ধরে। এর পর থেকে কোথাও বৃষ্টি বা ঝড় হলে তিনি গাড়ি থামিয়ে দিতেন। নিকটস্থ কোনো গাছের নিচে গিয়ে শুয়ে থাকতেন।
মুক্তি মিলল না তবু। বছর খানেক পরে, ১৯৭৩ সালের আগস্টে পঞ্চমবার বজ্রপাতের কবলে পড়লেন। পার্কে টহল দিয়ে বেড়াচ্ছিলেন। দেখলেন, ঝড়োমেঘ তৈরি হচ্ছে। দ্রুত ট্রাক চালিয়ে সরে এলেন সুলিভান। অবশেষে যখন নিজেকে নিরাপদ মনে হলো, ট্রাক থামিয়ে নামলেন। এর কিছুক্ষণ পরেই আঘাত করল বজ্র। সে যাত্রায় অবশ্য বেঁচে গেলেন, তেমন কিছুই হয়নি। আঘাতের পরে ক্রল করে সরে আসেন সেখান থেকে।
ষষ্ঠবার বজ্রহানা দিল ১৯৭৬ সালের ৫ জুন। গোড়ালিতে আঘাত পেলেন, চুলেও আগুন ধরে গেল। অল্পের ওপর দিয়ে বেঁচে গেলেন সে যাত্রায়।
সপ্তমবার বজ্র হানা দিল পরের বছরের ২৫ জুন। সে সময় তিনি মিঠাপানির পুলে মাছ ধরছিলেন। এ সময় বজ্র তাঁর মাথায় আঘাত করে, বুক ও পাকস্থলী পুড়িয়ে দিয়ে নেমে যায়।
সম্ভাবনা ও সত্যতা
৮০ বছরের জীবনকালে একবার বজ্রাহত হওয়ার সম্ভাবনা ১০ হাজারে ১ বার। কিন্তু সাত সাতবার বজ্রাহত হওয়ার সম্ভাবনা কতটা? জানা যায়, সংখ্যাটা হলো ১:১০২৮ (১-এর পর ২৮টা শূন্য)। অর্থাৎ ১০ অক্টালিয়নে ১ বার। তবে সুলিভানের জন্য এই সম্ভাবনা পুরো সঠিক নয়। ভার্জিনিয়ায় প্রতি বছর ৩৫ থেকে ৪৫ দিন বজ্রপাত হয়। এর বেশির ভাগ হয় জুন, জুলাই ও আগস্টে। ১৯৫৯ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে অন্তত ৫৮ জন বজ্রাঘাতে মারা গেছেন। আহত হয়েছে আরও অন্তত ২৩৮ জন।
বজ্রপাতের আঘাতে হৃৎপিণ্ড বন্ধ হয়ে মানুষ মারা যেতে পারে। কিন্তু এরপরও একজন মানুষ এতবার বজ্রাহত হয়েও বেঁচে গেছেন, এটা বিস্ময়কর। কিন্তু সুলিভানের ঘটনাগুলো ডকুমেন্টেড। গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে সবচেয়ে বেশি বজ্রাহত হয়েও বেঁচে যাওয়া মানুষের তালিকায় তাঁর নাম আছে। দ্য ওয়াশিংটন পোস্টে একটি বিস্তারিত নিবন্ধ আছে তাঁকে নিয়ে, আগ্রহীরা পড়তে পারেন।
স্বাভাবিকভাবে এমনটা সম্ভব বলে মনে হয় না। তবু প্রকৃতি অনেক সময় স্বাভাবিক হিসাব-নিকাশ এলোমেলো করে দেয়। সুলিভান তার জলজ্যন্ত উদাহরণ। শুধু তা-ই নয়, তাঁর স্ত্রীও একবার বজ্রাহত হন। শেষদিকে মানুষ তাঁকে বজ্রাহত হওয়ার ভয়ে এড়িয়ে চলতে শুরু করে।
১৯৮৩ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর, ৭১ বছর বয়সে মারা যান রয় সুলিভান। বলা উচিৎ, আত্মহত্যা করেন। বজ্রাঘাতের ভয় তাঁকে আত্মহত্যার দিকে নিয়ে যায়। নিজের মাথায় গুলি করে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন রয় সুলিভান।
ইতিহাসে তাঁর নাম লেখা আছে, থাকবে।