মহাকর্ষীয় লেন্স বলতে কী বোঝায়?
আনোয়ার জামান: মহাকর্ষীয় লেন্স বা গ্র্যাভিটিশনাল লেন্স বিষয়টি ইদানীং জ্যোতির্বিজ্ঞানে বেশ আলোচিত। দুটি গ্যালাক্সি যখন আমাদের দৃষ্টিরেখা বরাবর একটির পেছনে আরেকটি অবস্থান করে, তখন পেছনের গ্যালাক্সি থেকে আসা আলো সামনের গ্যালাক্সির মহাকর্ষ বলের কারণে বেঁকে যায়। এতে পেছনের গ্যালাক্সিটিকে আর সরাসরি দেখা যায় না, কিন্তু এটির বিবর্ধিত ও কিছুটা বিকৃত বিম্ব একাধিকবার দেখা যায় আমাদের চোখে বা টেলিস্কোপ দিয়ে। আলোর পথ বেঁকে যাওয়ার এ বিষয়ের সঙ্গে কাচের তৈরি লেন্সের মধ্য দিয়ে আলো বেঁকে যাওয়ার মিল আছে। তাই এ ঘটনাকে ডাকা হয় মহাকর্ষীয় লেন্স।
আলবার্ট আইনস্টাইন ১৯১৫ সালে যে সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব দিয়েছিলেন, তা থেকেই মহাকর্ষ বলের কারণে আলোর এ ধরনের বেঁকে যাওয়ার ভবিষ্যদ্বাণী করা হয় প্রথমবারের মতো। ১৯১৯ সালে একটি পরীক্ষার মাধ্যমে ব্যাপারটা প্রমাণ করেন ব্রিটিশ জ্যোতির্বিজ্ঞানী আর্থার এডিংটন। মহাকর্ষীয় লেন্স বেশ দুর্লভ একটি বস্তু। আমাদের মহাবিশ্বে প্রায় ২০ লাখ কোটি গ্যালাক্সির মধ্যে মহাকর্ষীয় লেন্স হিসেবে কাজ করে, এমন গ্যালাক্সির খোঁজ পাওয়া গেছে শুধু কয়েক হাজারের মতো। কিন্তু এই দুর্লভ লেন্সগুলো গ্যালাক্সি ও মহাবিশ্বের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য পরিমাপের জন্য অত্যন্ত কার্যকর বলে নতুন নতুন লেন্সের খোঁজ পাওয়া বেশ মূল্যবান।
আইনস্টাইন জিগজ্যাগ কী?
আনোয়ার জামান: আইনস্টাইন জিগজ্যাগ হচ্ছে একটি বিশেষ ধরনের মহাকর্ষীয় লেন্স। এ ক্ষেত্রে দুটি নয়, তিনটি গ্যালাক্সি একই দৃষ্টিরেখা বরাবর অবস্থান করে। ফলে একদম পেছনের গ্যালাক্সি থেকে আসা আলোকরেখা এর সামনের দুটি গ্যালাক্সির পাশ দিয়ে আসার সময় দুবার বেঁকে জিগজ্যাগ পথে আমাদের কাছে এসে পৌঁছায়। সাধারণ লেন্সের ক্ষেত্রে পেছনের গ্যালাক্সিকে দুবার বা চারবার দেখা যায়; কিন্তু আইনস্টাইন জিগজ্যাগের ক্ষেত্রে দেখা যায় এর চেয়ে বেশিবার, যেমন আমাদের আবিষ্কৃত ক্ষেত্রে দেখা গেছে ছয়বার। এ ধরনের ঘটনা তৈরি করতে যেহেতু তিনটি গ্যালাক্সিকে এক দৃষ্টিরেখা বরাবর অবস্থান করতে হয়, তাই এটি সাধারণ লেন্সের তুলনায় আরও ৫০ হাজার গুণ দুর্লভ। আমাদের আবিষ্কৃত লেন্সটি আরও স্পেশাল। এর কারণ, একদম পেছনের গ্যালাক্সিটি একটি কোয়েসার। একটি গ্যালাক্সির কেন্দ্রস্থলের উজ্জ্বলতা যখন অনেক বেড়ে যায়, তখন তাকে কোয়েসার বলে ডাকে। এই জিগজ্যাগ লেন্সটির এ ধরনের অনন্য বৈশিষ্ট্যগুলোর কারণে এটি ব্যবহার করে আমরা একই সঙ্গে মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের হার ও ডার্ক এনার্জি নামের মহাবিশ্বের রহস্যময় অজানা উপাদানের ঘনত্ব মাপতে পারব। আমাদের গবেষণা দল বর্তমানে এই পরিমাপের কাজগুলো করছে। পরিমাপের ফলাফল আমরা নিকট ভবিষ্যতে প্রকাশ করব।
কীভাবে আবিষ্কার করলেন এই লেন্স?
ছয়টি কোয়েসারের উজ্জ্বলতা দুই বছর পর্যবেক্ষণ করার পর আমাদের টিম মেম্বার ফ্রেড ডাক্স ও মার্টিন মিলন খেয়াল করল, ছয়টি বিম্বেরই উজ্জ্বলতার উত্থান-পতন সম্পূর্ণ মিলে যায়।
আনোয়ার জামান: আমাদের আবিষ্কারটি একটু সৌভাগ্যপ্রসূত। এ লেন্সকে ২০১৮ সালে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক একটি সম্ভাব্য সাধারণ লেন্স হিসেবে শনাক্ত করেন। সেটা করা হয়েছিল নাসার স্যাটেলাইট থেকে তোলা একটি ঝাপসা ছবি থেকে। তারপর আমাদের গবেষণা দল এ লেন্সের একটি পরিষ্কার হাই রেজল্যুশনের ছবি সংগ্রহ করে। সেটা করা হয়েছিল হাবল স্পেস টেলিস্কোপ ব্যবহার করে। ওই ছবিতে আমরা দেখতে পাই, এই লেন্সে সাধারণ চারটির বদলে কোয়েসারের ছয়টি বিম্ব দেখা যাচ্ছে।
আমরা প্রথমে মনে করেছিলাম, সামনের লেন্স গ্যালাক্সিটির পেছনে দুটি আলাদা কোয়েসার রয়েছে। সেখানে একটিকে দুবার এবং অন্যটিকে চারবার দেখা যাচ্ছে। এরপর আমাদের টিম এই ছয়টি কোয়েসারের উজ্জ্বলতার উত্থান–পতন পর্যবেক্ষণ করা শুরু করে। একই সময় আমি জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ থেকে এই লেন্সের একদম সামনের গ্যালাক্সিটির স্পেকট্রাল ডেটা সংগ্রহ করি। এ লেন্স ব্যবহার করা হয় মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের হার বা হাবল ধ্রুবক মাপার জন্য।
ছয়টি কোয়েসারের উজ্জ্বলতা দুই বছর পর্যবেক্ষণ করার পর আমাদের টিম মেম্বার ফ্রেড ডাক্স ও মার্টিন মিলন খেয়াল করল, ছয়টি বিম্বেরই উজ্জ্বলতার উত্থান-পতন সম্পূর্ণ মিলে যায়। এটি ইঙ্গিত করে, এই ছয়টি বিম্ব একই কোয়েসার থেকে এসেছে। এবং এটি আসলে একটি জিগজ্যাগ লেন্স। কিন্তু সে ক্ষেত্রে দৃষ্টিরেখা বরাবর মাঝখানে আরও একটি গ্যালাক্সি দরকার, যেটা তখন পর্যন্ত শনাক্ত হয়নি। তখন ফ্রেড ও মার্টিন আমাকে জিজ্ঞাসা করল, জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের ডেটায় মাঝখানের গ্যালাক্সির অস্তিত্ব শনাক্ত করা যায় কি না, তা দেখার জন্য। যদিও আমি এ ডেটা নিয়েছিলাম একদম সামনের গ্যালাক্সিটিকে কেন্দ্র করে। সৌভাগ্যজনকভাবে মাঝখানের গ্যালাক্সিটির সামান্য একটু অংশ এই ডেটায় ধরা পড়ে। সেটা থেকে আমরা এই মাঝখানের গ্যালাক্সিটির দূরত্ব পরিমাপ করে নিশ্চিত হই যে মাঝখানের গ্যালাক্সিটি আসলেই সামনের গ্যালাক্সি ও পেছনের কোয়েসারের মধ্যবর্তী দূরত্বে অবস্থিত। এ থেকেই এই লেন্স প্রথম আবিষ্কৃত আইনস্টাইন জিগজ্যাগ লেন্স হিসেবে প্রমাণিত হয়।
আপনার সম্পর্কে জানতে চাই।
আনোয়ার জামান: আমি জন্মেছি বাংলাদেশের সুনামগঞ্জ জেলায়। ছোটবেলায় সিলেটের ব্লু বার্ড হাইস্কুলে এবং পরে সিলেট ক্যাডেট কলেজ থেকে পড়াশোনা শেষে প্রথমে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি হয়েছিলাম। কিন্তু তার পরপরই আমি মনবুশো বৃত্তি পেয়ে জাপানে গিয়ে টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। সেখানে ফিজিকসে পড়াশোনা করি। তারপর পিএইচডি করতে যোগ দিই যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া লস অ্যাঞ্জেলেসে। সেখান থেকে পিএইচডি শেষ করি ২০২০ সালে।
এরপর আমি পোস্টডক্টরাল রিসার্চার হিসেবে কাজ শুরু করি ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোয়। ২০২১ সালে নাসা থেকে আইনস্টাইন ফেলোশিপ অ্যাওয়ার্ড পাই। নাসা প্রতিবছর আটজন পোস্টডক্টরাল গবেষককে এই অ্যাওয়ার্ড দেয়। সেটা ব্যবহার করে তিন বছর স্বাধীনভাবে গবেষণাকর্ম পরিচালনা করা যায় গবেষকের ইচ্ছানুযায়ী বিষয়ে। আমার গবেষণায় আমি মহাকর্ষীয় লেন্সিংয়ের মাধ্যমে মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের হার ও ডার্ক এনার্জির ঘনত্ব মাপার পাশাপাশি গত ৭০০ কোটি বছরে বিশাল আকারের গ্যালাক্সিগুলোর গঠন ও বিবর্তনপদ্ধতি নির্ণয় করছি।
বাংলাদেশে মহাকাশ নিয়ে গবেষণার সুযোগ কেমন?
বাংলাদেশের বেশ কিছু শিক্ষার্থী বর্তমানে এ রকম গবেষণা প্রজেক্টে যুক্ত আছেন। আমি অ্যাস্ট্রো-ব্রিজ নামের একটি প্রোগ্রাম তৈরি করেছি। সেখানে বাংলাদেশের ১৯ শিক্ষার্থী আমার সঙ্গে প্রজেক্টে কাজ করে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন।
আনোয়ার জামান: বাংলাদেশে মৌলিক গবেষণার সুযোগ কম থাকলেও শিক্ষার্থীরা কিন্তু বেশ আগ্রহী। যদিও বাংলাদেশে এখনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্যোতির্বিজ্ঞান বিভাগ নেই। সম্প্রতি ইনডিপেনডেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশে জ্যোতির্বিদ্যাকে মাইনর হিসেবে নেওয়া যাচ্ছে, যা বাংলাদেশে প্রথম ও বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ। আইইউবিতে জ্যোতির্বিজ্ঞানী প্রফেসর খান আসাদের নেতৃত্বে নতুন একটি গবেষণা সেন্টারও চালু হয়েছে, যার নাম সেন্টার ফর অ্যাস্ট্রোনমি, স্পেস সায়েন্স অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিকস, সংক্ষেপে কাসা। এই সেন্টারের সঙ্গে আমিসহ বাংলাদেশের আরও বেশ কজন মহাকাশবিজ্ঞানী যুক্ত আছি। বর্তমানে এই সেন্টারে কিছু গবেষণা প্রজেক্ট শুরু করার প্ল্যান চলছে। সেটা নিকট ভবিষ্যতে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য গবেষণার সুযোগ তৈরি করবে।
পাশাপাশি বাংলাদেশের আন্ডারগ্র্যাজুয়েট বা মাস্টার্স লেভেলের শিক্ষার্থীরা অন্যান্য বিভিন্ন দেশের সামার রিসার্চ প্রজেক্টে অ্যাপ্লিকেশন করে সেখানে গবেষণা করার সুযোগ খুঁজতে পারেন। এ ছাড়া আগ্রহী শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশের জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাঁদের সঙ্গে বর্তমান কোনো প্রজেক্টে কাজ করার সুযোগ রয়েছে কি না, জিজ্ঞাসা করে দেখতে পারেন।
বাংলাদেশের বেশ কিছু শিক্ষার্থী বর্তমানে এ রকম গবেষণা প্রজেক্টে যুক্ত আছেন। আমি অ্যাস্ট্রো-ব্রিজ নামের একটি প্রোগ্রাম তৈরি করেছি। সেখানে বাংলাদেশের ১৯ শিক্ষার্থী আমার সঙ্গে প্রজেক্টে কাজ করে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন। মজার ব্যাপার হলো, আমার জানামতে, এটিই পর্যবেক্ষণ মহাকাশবিজ্ঞানে প্রথম গবেষণাপত্র, যেখানে গবেষকদের সবাই বাংলাদেশি। এই একটি প্রজেক্টের মাধ্যমে গবেষণাপত্র লিখেছেন, এ রকম বাংলাদেশি জ্যোতির্বিজ্ঞানীর সংখ্যা এক ধাপে বেড়েছে প্রায় তিন গুণ। এই প্রজেক্টের শিক্ষার্থীরা অনেক চমৎকার কাজ করেছেন। এ থেকে প্রমাণিত হয়, বাংলাদেশে এ ধরনের গবেষণায় অদম্য আগ্রহ রয়েছে। সেটা মেটাতে ভবিষ্যতে আরও বেশি সুযোগ-সুবিধা তৈরি করা দরকার।
আপনাকে ধন্যবাদ।
আনোয়ার জামান: আপনাকেও ধন্যবাদ।