মেহেদি আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। যুগ যুগ ধরে ঈদ, পূজা, বিয়ে ও উৎসব উদ্যাপনে মেহেদি ব্যবহৃত হচ্ছে। মেহেদির রঙে চমৎকার সব নকশারাঙা হাত যেন উৎসবের আনন্দ আরও বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু এর রঙের রহস্য কী? কীভাবে মেহেদি আমাদের ত্বকে রঙের ছাপ ফেলে?
হেনা বা মেহেদিগাছের পাতা থেকে তৈরি একধরনের রঞ্জক পদার্থ এই মেহেদি বা মেন্দি। ভালো করে বেটে ত্বকে লাগালে কিছু সময়ের মধ্যে ত্বক লালচে–কমলা হয়ে ওঠে। মেহেদি দিয়ে ত্বকে করা সুন্দর নকশা ও বডি আর্ট বিশ্বজুড়ে ‘মেহেন্দি’ নামেই পরিচিত। আরও ভালোভাবে মেহেদির রং পেতে হলে প্রথমে মেহেদিগাছের পাতাগুলোকে ভালোভাবে গুঁড়া করে নিতে হয়। এরপর এর সঙ্গে সামান্য তেল বা অম্লীয় দ্রবণ, যেমন লেবুর রস মিশিয়ে একটি পেস্ট তৈরি করতে হয়। এই পেস্টই ত্বক ও চুলে ব্যবহার করলে আসল মেহেদির রং পাওয়া যায়। ইংরেজিতে একে বলা হয় রেড হেনা।
মেহেদির রঙের পেছনে রয়েছে এর পাতার মধ্যে থাকা রঞ্জক অণু। এর নাম লসোন (lawsone)। লসোন যখন ত্বকের কোষের সংস্পর্শে আসে, তখন এটি কেরাটিন নামে একধরনের প্রোটিনের সঙ্গে রাসায়নিক বন্ধনে যুক্ত হয়। ত্বকের ওই কোষগুলো স্বাভাবিক নিয়মে ঝরে যাওয়ার আগপর্যন্ত এই বন্ধন টিকে থাকে।
মেহেদি লাগানোর পর কমপক্ষে কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা না করলে ত্বকে গাঢ় রং হয় না। কারণ, লসোন ত্বকের গভীরে প্রবেশ করতে কিছুটা সময় লাগে। এ কারণেই মেহেদি লাগানোর পর কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। এই সময়টুকু লসোনকে ত্বকের গভীরে প্রবেশ করতে সাহায্য করে, যাতে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত মেহেদির রং গাঢ় ও স্থায়ী হয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বিশ্বের কিছু অঞ্চলে ‘কালো মেহেদি’ তৈরি করার জন্য চুলের রঙে ব্যবহৃত পি-ফেনিলিনডায়ামিন বা পিপিডি নামে একধরনের উপাদান মেশানো হয়। ত্বকের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিশ্বের অনেক দেশেই এই পিপিডি ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কারণ, এটি ত্বকের সঙ্গে বিরূপ প্রতিক্রিয়া করে নানা রকম ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে।
ত্বকের গভীরে
মেহেদি ত্বকের ঠিক কত গভীরে প্রবেশ করতে পারে...
১. মেহেদির পেস্ট
মেহেদি সরাসরি ত্বকে প্রয়োগ করা হয়, যাতে লসোন অণুগুলো ত্বকের কোষে প্রবেশ করে কেরাটিন অণুর সঙ্গে বন্ধন তৈরি করতে পারে।
২. ত্বকের বাইরের স্তর
এটি ত্বকের সর্ববহিঃস্থ ‘এপিডার্মিস’ স্তর। এখানে ‘কেরাটিনোসাইট’ নামে কেরাটিন বহনকারী কোষগুলো দ্রুত পুনরুৎপাদিত হয়।
৩. গভীরে প্রবেশের সীমা
ত্বকের তুলনামূলক পুরু অংশে মেহেদি প্রয়োগ করলে, যেমন পিঠ বা হাতের তালুতে লসোন ৩০টি কোষের স্তর পর্যন্ত গভীরে প্রবেশ করতে পারে।
৪. দানাদার স্তর
মেহেদি ত্বকের দানাদার স্তরে প্রবেশ করে না। এ স্তর ত্বকের অভেদ্য (পানিরোধী) বাধা হিসেবে কাজ করে।
৫. বেসেল স্তর
ত্বকের সবচেয়ে গভীর স্তর, যেখানে নতুন প্রতিরক্ষামূলক কেরাটিনোসাইট কোষ তৈরি হয়।
মেহেদির আদি উৎপত্তি
মেহেদির উৎপত্তি কোথায়, তা সুনির্দিষ্টভাবে বলা কঠিন। তবে ১৮৯৪ থেকে ৫৩৯ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের মধ্যে প্রাচীন ব্যাবিলনীয় সভ্যতায় মেহেদি ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়। একই রকম প্রমাণ মেলে প্রাচীন মিসরীয় সভ্যতায়, ৩১০০ থেকে ৩৯৫ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের মধ্যে। প্রাচীনকালে মেহেদি মৃতদেহ সাজানো এবং কিছু ক্ষেত্রে মমি তৈরির সময় লিনেন কাপড় রাঙাতে ব্যবহার করা হতো। চুল ও নখে পাওয়া কেরাটিনের মতোই, মেহেদির লসোন ক্ষয় প্রতিরোধী, মৃত্যুর পরও দেহে থেকে যায়। প্রত্নতাত্ত্বিকেরা যখন মিসরের ফারাও দ্বিতীয় রামেসিসের, যিনি রামেসিস দ্য গ্রেট নামে পরিচিত—মমি পরীক্ষা করেন, তখন তাঁরা আবিষ্কার করেন যে মমির চুল মৃত্যুর সময় সাদা হওয়ায় মেহেদি দিয়ে উজ্জ্বল কমলা রঙে রঞ্জিত করা হয়।