১৬৮৯ সালের কথা। স্যার আইজ্যাক নিউটন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সদস্য হিসেবে সংসদ তথা ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্য মনোনীত হন। এক বছর ধরে এ দায়িত্ব পালন করেন তিনি। কথিত আছে, এই পুরো সময়ে তিনি শুধু একটি বাক্য বলেছিলেন। একবার এক সহকারীকে ডেকে বলেছিলেন, ‘জানালাটা খুলে দাও’। ব্যস, এটুকুই!
নিউটনের গোটা জীবনটাও এই একটি বাক্য দিয়ে প্রকাশ করা যেতে পারে। সারা জীবন তিনি মানুষের জন্য খুলে ধরতে চেয়েছেন অন্যরকম এক জানালা। যে জানালায় চোখ রেখে আমরা জেনেছি, পৃথিবীতে আপেল যেভাবে মাটিতে পড়ে, একইভাবে চাঁদ পড়ছে পৃথিবীর চারপাশে। সত্যিই—শুধু ঘুরছেই না, চাঁদ আসলে প্রতি মুহূর্তে পড়ছে পৃথিবীকে ঘিরে! পদার্থবিদ্যার যে কয়টা শাখার কথা আপনি ভাবতে পারেন, মহাকর্ষ, অপটিকস বা আলোকবিজ্ঞান, গতিবিদ্যা এবং এটি প্রকাশের জন্য প্রয়োজনীয় গণিত—ডিফরেন্সিয়েশন এবং ইন্টিগ্রেশন—এই সবকিছু মাত্র একজন মানুষ আবিষ্কার করেছেন, ভাবা যায়? স্যার আইজ্যাক নিউটনের ঘটনা বহুল জীবনের নানা দিক উঠে এসেছে ‘নিউটনের হাত ধরে’ অধ্যায়ে। এর মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে প্রদীপ দেবের মহাবিশ্বের রহস্য সন্ধানে।
১৯৭৭ সালে যাত্রা করে নভোযান দুটো। সে সময় লক্ষ্য ছিল সৌরজগতের দূরবর্তী দুটি গ্রহ—শনি আর বৃহস্পতিকে জানার জন্য দুটি নভোযান পাঠানো। বিজ্ঞানীরা ভেবেছিলেন, মেরে-কেটে নভোযান দুটি বছর পাঁচের কাজ করতে পারলেই হলো।
মহাবিশ্বের রহস্য মানেই আমাদের মাথায় উঁকি দেয় মহাকাশ। কত সব জটিল রহস্য তাতে! সেই জটিল রহস্যের কথা ভাবলে আমাদের অবশ্য মনে হবে ব্ল্যাকহোল বা কৃষ্ণগহ্বর, গ্যালাক্সি-নক্ষত্র ইত্যাদির কথা। এই বই অবশ্য মহাবিশ্বের রহস্য নিয়ে আলোচনা করেনি সে অর্থে। বরং এতে উঠে এসেছে সেই সব রহস্য ভেদ করার মানুষের আজন্ম প্রচেষ্টার কথা।
ভয়েজার ১ ও ২ নভোযানের কথা পাঠক হয়তো খানিকটা জানেন। ১৯৭৭ সালে যাত্রা করে নভোযান দুটো। সে সময় লক্ষ্য ছিল সৌরজগতের দূরবর্তী দুটি গ্রহ—শনি আর বৃহস্পতিকে জানার জন্য দুটি নভোযান পাঠানো। বিজ্ঞানীরা ভেবেছিলেন, মেরে-কেটে নভোযান দুটি বছর পাঁচের কাজ করতে পারলেই হলো। সেই দুটি নভোযান আজও ছুটে চলেছে, পেরিয়ে গেছে সৌরজগতের সীমা; তবু তারা ছুটছে, ছুটছে… এবং প্রায় ৪৮ বছর ধরে ছুটে চলেছে এভাবে। অবিশ্বাস্য এই মহাকাশযাত্রা, বুকে তাদের গোল্ডেন রেকর্ড, তাতে পৃথিবীর গান, নানা শব্দ—কোনো এক মহাজাগতিক সভ্যতার সন্ধানে ছুটে চলেছে ভয়েজার দুটি।
একনজরে
মহাবিশ্বের রহস্য সন্ধানে
লেখক: প্রদীপ দেব
মূল্য: ২৮০ টাকা
পৃষ্ঠা: ১২০
প্রচ্ছদ: এআই আর্ট/ উচ্ছ্বাস তৌসিফ
প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ২০২৫
প্রকাশক: অনুপম প্রকাশনী
হাবল টেলিস্কোপের উত্তরসূরী হিসেবে সম্প্রতি মহাকাশে ঘাঁটি গেড়েছে নতুন এক নভোদুরবিন—জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ। হাবলের আজ বয়স হয়েছে, প্রযুক্তির উন্নতি হয়েছে বহু গুণে, এবারে তাই শুধু মহাবিশ্বের গ্যালাক্সি-তারা দেখাই নয়, মহাবিশ্বের প্রথম আলো, আদিমতম গ্যালাক্সিগুলোর সূচনা দেখতে চান বিজ্ঞানীরা।
আরও আরও দূরের বিশ্বটাকে জানতে মানুষ বানিয়েছে টেলিস্কোপ নামের ‘টাইম মেশিন’। এতে চোখ রেখে মহাবিশ্বের অতীত দেখা যায়, দেখা যায় বহু দূরের এবং বহু বহুর আগের নক্ষত্রের জন্ম-মৃত্যু এবং গ্যালাক্সির বিবর্তন। টেলিস্কোপের সূচনা হয়েছিল গ্যালিলিওর হাতে। তারপর কালের আবর্তে আমরা জেনেছি, শুধু মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিটাই মহাবিশ্ব নয়; মহাবিশ্ব বিশাল, বিপুল। এই কথাগুলো আমাদের প্রথম জানিয়েছিলেন এডউইন হাবল—তাঁর সম্মানে তাই মানুষ বানিয়েছে হাবল টেলিস্কোপ, মানুষের বানানো অন্যতম শক্তিশালী এই টেলিস্কোপ কয়েক যুগ ধরে সমাধান করেছে একের পর এক মহাজাগতিক রহস্য, খুলে দিয়েছে অন্যরকম এক ‘জানালা’। হাবল টেলিস্কোপের উত্তরসূরী হিসেবে সম্প্রতি মহাকাশে ঘাঁটি গেড়েছে নতুন এক নভোদুরবিন—জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ। হাবলের আজ বয়স হয়েছে, প্রযুক্তির উন্নতি হয়েছে বহু গুণে, এবারে তাই শুধু মহাবিশ্বের গ্যালাক্সি-তারা দেখাই নয়, মহাবিশ্বের প্রথম আলো, আদিমতম গ্যালাক্সিগুলোর সূচনা দেখতে চান বিজ্ঞানীরা। এ কাজটিই করতে চলেছে জেমস ওয়েব নভোদুরবিন। কিন্তু হাবল বা জেমস ওয়েবের মতো স্পেস টেলিস্কোপগুলো কীভাবে কাজ করে? খুঁটিনাটি বিষয়গুলো জানা যাবে বইটিতে। একইভাবে জানা যাবে মঙ্গলে পার্সিভিয়ারেন্স নভোযানের কথা, বহুল ‘অধ্যাবসায়’-এর প্রমাণ রেখে যেটি মঙ্গলকে আরও ভালোভাবে জানার চেষ্টা করছে; ওদিকে পৃথিবীকে ঘিরে এক অদ্ভুত উড়ন্ত গবেষণাগারে মানুষ চালাচ্ছে বিচিত্র সব এক্সপেরিমেন্ট। উড়ন্ত সেই গবেষণাগারের নাম আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন।
কিছু অমীমাংসিত প্রশ্ন রয়ে গেছে আজও বিজ্ঞানীদের সামনে। ডার্ক ম্যাটার বা গুপ্ত বস্তু এবং ডার্ক এনার্জি বা গুপ্ত শক্তি এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, মহাবিশ্বের মাত্র ৫ শতাংশ জানি আমরা। বাকি ৯৫ শতাংশ অজানার তালিকায় শুধু দুটি জিনিস—আজব এক ভর, আমরা জানি ভর মানে বস্তু, অথচ সেই বস্তুর চিহ্নও শনাক্ত করা যাচ্ছে না—এই হলো গুপ্ত বস্তু। আর মহাকর্ষের বিপরীতে অদ্ভুত এক শক্তি মহাবিশ্বটাকে টেনে প্রসারিত করে চলেছে আজন্ম—সেই শক্তি যে কী, সে রহস্যের সমাধান হয়নি আজও। সেটাই গুপ্ত শক্তি। ডার্ক এনার্জি। আছে মহাজাগতিক রশ্মি, ইউএফওসহ অদ্ভুত সব মহাজাগতিক রহস্য।
প্রতিটি অধ্যায়ের শেষে চিত্র ও তথ্যের সূত্র আছে—চিত্রসূত্রে সূত্রের পাশাপাশি রয়েছে ছবির ব্যাখ্যা, যেটি হয়তো ক্যাপশনে আরও বেশি মানানসই হতো, পাঠকের জন্যও হতো সুবিধাজনক। কিছু বানান ভুল রয়েছে, যার পরিমাণ খুব বেশি নয়।
এই সব রহস্যের কথা নিয়ে মহাবিশ্বের রহস্য সন্ধানে। মোট এক ডজন লেখা আছে বইটিতে, অর্থাৎ এক ডজন রহস্যের সন্ধানের কথা। লেখাগুলো স্বয়ংসম্পূর্ণ। প্রতিটি অধ্যায় পাঠক পড়তে পারবেন আলাদাভাবে, তবে একটি অধ্যায়ের সঙ্গে আরেকটির সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। এতে হয়তো খানিকটা অতৃপ্তি বোধ হতে পারে। আবার প্রতিটি লেখা একটু বিরতি নিয়ে পড়লে, এর ভিন্নতা, স্বয়ংসম্পূর্ণতার বিষয়টি উপলব্ধি করা যাবে; তখন হয়তো সেই অতৃপ্তির চিন্তাটি ওভাবে আসবে না। প্রতিটি অধ্যায়ের শেষে চিত্র ও তথ্যের সূত্র আছে—চিত্রসূত্রে সূত্রের পাশাপাশি রয়েছে ছবির ব্যাখ্যা, যেটি হয়তো ক্যাপশনে আরও বেশি মানানসই হতো, পাঠকের জন্যও হতো সুবিধাজনক। কিছু বানান ভুল রয়েছে, যার পরিমাণ খুব বেশি নয়। তবে কিছু জায়গায় ইংরেজির অনুবাদ, বিশেষ করে নাম বা প্রোপার নাউনের অনুবাদ—যেমন পার্সিভিয়ারেন্স নিয়ে অধ্যায়টির নাম ‘মঙ্গলে অধ্যাবসায়’—এসব হয়তো পাঠককে খানিকটা অস্বস্তিকর অনুভূতি দেবে। এটুকু সরিয়ে রেখে ভাবলে, প্রতিটি অধ্যায় বেশ সুখপাঠ্য। লেখাগুলোতে ইতিহাস যেমন আছে, সবার পড়ার মতো, তেমনি খানিকটা সিরিয়াস পাঠকের জন্য ছোট করে প্রয়োজনীয় সমীকরণের উল্লেখও আছে বিভিন্ন জায়গায়।
লেখক বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নের আরএমআইটি ইউনিভার্সিটির শিক্ষক। তাঁর শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা সহজে বোঝানো ও ব্যাখ্যার ধাঁচে স্পষ্ট। মহাবিশ্বের রহস্যভেদে আগ্রহী পাঠকদের জন্য বইটি উপভোগ্য হবে নিঃসন্দেহে। চমৎকার বইটি প্রকাশ করেছে অনুপম প্রকাশনী।
বইটি পাওয়া যাচ্ছে একুশে বইমেলায় অনুপম প্রকাশনীর প্যাভিলিয়নসহ অনলাইন ও অফলাইনের বিভিন্ন বুকশপে।