একজন মানুষ গড়ে কত বছর বাঁচে? ৫০ বছর, ৭৫ বছর, ১০০ বছর? মানুষের জন্য এটা অনেক সময়! কিন্তু গ্লাস স্পঞ্জ নামে সামুদ্রিক প্রাণীর জন্য ১০০ বছর মানে শৈশব! অনেক প্রাণীই মানুষের চেয়ে অনেক বেশি বছর বাঁচে। আজ তেমন কিছু প্রাণীর কথাই জানব।
অন্যান্য প্রাণীদের কথায় যাওয়ার আগে পৃথিবীর সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণীকে নিয়ে একটু আলোচনা করা যাক। পৃথিবীর সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী নিঃসন্দেহে মানুষ। আর বিশ্বের সবচেয়ে বয়স্ক মানুষ ছিলেন ফ্রান্সের জেন লুইস ক্যালমেন্ট। ১২২ বছর বেঁচেছিলেন তিনি। কিন্তু সবাই তাঁর মতো ভাগ্যবান নয়। বর্তমানে মানুষের গড় আয়ু ৭৩.১৬ বছর। ২০২১ সালের এক গবেষণা দেখা গেছে, তাত্ত্বিকভাবে মানুষ সর্বোচ্চ ১৫০ বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারে। কিন্তু ১০০ বছর পার হলেই শরীরের কোষগুলো আর সহজে নিজেকে ঠিক রাখতে পারে না। অথচ পৃথিবীর কিছু প্রাণী অনায়াসে বাঁচতে পারে কয়েকশ বছর। হয়তো ভাবছেন, কীভাবে? এর কিছু কারণ রয়েছে। প্রাণীদের শরীরের আকার, জীবনযাপন পদ্ধতি, খাদ্যাভ্যাস এবং পরিবেশ এতে বড় ভূমিকা রাখে।
এবার চলুন, পৃথিবীর কিছু দীর্ঘজীবী প্রাণী সম্পর্কে জানা যাক।
নেকেড মোল র্যাট – ৪০ বছর
মাত্র ৮ সেন্টিমিটার বা ৩ ইঞ্চি লম্বা এই প্রাণী দেখতে ইঁদুরের মতো। তবে ইঁদুর সাধারণত ২ বছর বাঁচে, কিন্তু নেকেড মোল র্যাট বাঁচতে পারে ৪০ বছর! এরা মাটির নিচে দলবদ্ধভাবে থাকে, ফলে শিকারিদের হাতে সহজে ধরা পড়ে না। এছাড়া, এদের শরীরে এমন এক ধরনের বিশেষ যৌগ আছে, যা ক্যান্সার প্রতিরোধ করে।
বাদুড় – ৪০ বছরের বেশি
একটি ছোট বাদুড়ের ওজন মাত্র ৬ গ্রাম, অথচ এটি বাঁচতে পারে ৪০ বছরের বেশি! বাদুড় উড়তে পারে, তাই শিকারিদের হাত থেকে সহজেই বেঁচে যায়। শীতকালে এরা ঘুমিয়ে কাটায় (হাইবারনেশন)। ফলে শরীরের শক্তি খরচ হয় কম এবং দীর্ঘদিন বেঁচে থাকে। অবশ্য সব বাদুড়ই ৪০ বছর বাঁচে না, কিন্তু ২০ বছরের আগে স্বাভাবিকভাবে কোনো বাদুড় মারা যায় না।
কাকাপো – ১০০ বছর
নিউজিল্যান্ডের কাকাপো পাখি উড়তে পারে না, কিন্তু এটি প্রায় ১০০ বছর বাঁচতে পারে। নিউজিল্যান্ডের বাইরে এই পাখি দেখা যায় না। দেশটিতে এদের কোনো স্থলবাসী শিকারিও নেই। ফলে শত্রু কম থাকায় এরা অনেক দিন বাঁচে। এদের মুখ অনেকটা প্যাঁচার মতো।
দৈত্যাকার কচ্ছপ – ২০০ বছর
বিশ্বের সবচেয়ে বয়স্ক কচ্ছপ জনাথন। ওটার বয়স কমপক্ষে ১৯২ বছর! বড় শরীর, ধীরগতির বিপাকক্রিয়া (মেটাবলিজম) এবং শক্ত খোলস থাকার কারণে কচ্ছপরা এত বছর বেঁচে থাকতে পারে। তবে অতিরিক্ত শিকার ও বন ধ্বংসের কারণে অনেক কচ্ছপ বিলুপ্তির পথে।
বোহেড তিমি – ২০০ বছর
বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘজীবী স্তন্যপায়ী প্রাণী বোহেড তিমি। এরা প্রায় ২০০ বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারে। বোহেড তিমির শরীরে বিশেষ কিছু জিন আছে, যা ক্যান্সার প্রতিরোধে সাহায্য করে। এছাড়া এরা ঠান্ডা পানিতে থাকে, যেখানে বিপাকক্রিয়া ধীরগতির হয়। ফলে বাঁচে বেশি দিন।
গ্রীনল্যান্ড হাঙর – ৪০০ বছর
গ্রীনল্যান্ডের হাঙর এতটাই ধীরগতিতে বড় হয় যে এটি প্রাপ্তবয়স্ক হতে প্রায় ১৫০ বছর লাগে! এদের শরীরেও বোহেড তিমির মতো বিশেষ ধরনের জিন আছে, যা শরীরের কোষের রোগ প্রতিরোধ করে। তাই এরা ৪০০ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে।
সামুদ্রিক শামুক – ৫০০ বছর
২০০৬ সালে বিজ্ঞানীরা ৫০৭ বছর বয়সী একটি সামুদ্রিক শামুক আবিষ্কার করেন! এগুলোকে বলা হয় ওশান কোহোগ। এটিও ঠান্ডা পানিতে থাকে এবং খুব ধীরগতিতে বাড়ে। তবে উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে এদের অস্তিত্ব প্রায় হুমকির মুখে।
ব্ল্যাক কোরাল – ৪,০০০ বছর
ব্ল্যাক কোরাল নামের সামুদ্রিক প্রাণী প্রায় ৪ হাজার বছর বেঁচে থাকতে পারে! এটি ধীরে ধীরে বাড়ে এবং সমুদ্রের গভীরে থাকে। এই প্রবাল পৃথিবীর প্রায় সব মহাসাগরে পাওয়া যায়। তবে গহনা তৈরিতে এই প্রবাল ব্যবহৃত হওয়ার কারণে মানুষ এগুলো বেশি বেশি সংগ্রহ করছে। এতে ব্ল্যাক কোরাল পড়েছে হুমকির মুখে।
গ্লাস স্পঞ্জ – ১৭,০০০ বছর
পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘজীবী প্রাণী হলো গ্লাস স্পঞ্জ। ১৭ হাজার বছর পর্যন্ত এরা বেঁচে থাকতে পারে! এটি সমুদ্রের গভীরে থাকে, যেখানে পানি খুব ঠান্ডা এবং স্থির থাকে। এরা ৩ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে।