গাছপালার রংবাজি

গাছ এবং সবুজ যেন পরস্পরের সমার্থক

গাছ এবং সবুজ যেন পরস্পরের সমার্থক। কারণ গাছ বলতে আমরা সবুজকেই বুঝি। আবার উল্টোটাও সত্য। কিন্তু সবুজ ছাড়াও গাছে আরও রং দেখা যায়—হলুদ, ধুসর, বেগুনি কিংবা লাল। আবার কিছু গাছের ফুলের রংও বিচিত্র। এ ছাড়া গাছের বাকল বা ছালেও অনেক সময় কিছু রং হতে দেখা যায়। এর পেছনের কারণ কী? রঙের এই রহস্যটা কী?

যেকোনো বস্তুর নির্দিষ্ট কোনো রং দেখার পেছনে আলোর একটা ভূমিকা আছে। ওই বস্তু আলোর বর্ণালির যে রংটি প্রতিফলিত করে, সেটাই আমরা বস্তুটার রং হিসেবে দেখতে পাই। আরও সহজভাবে বললে, সূর্যের আলোয় লুকিয়ে আছে সাতটি রং। রংধনুতে যে সাতটি রং দেখা যায়, সেগুলো—বেনীআসহকলা বা বেগুনি, নীল, আসমানি, সবুজ, হলুদ, কমলা এবং লাল। যে বস্তু আলোর সব রং শুষে নেয়, সেই বস্তুকে আমরা কালো দেখতে পাই। অন্যদিকে যে বস্তু সবগুলো রং প্রতিফলিত করে, তাকে আমরা দেখি সাদা। আবার বস্তু যদি সবুজ রং বাদে সব আলো শুষে নেয়, আর সবুজটাকে প্রতিফলিত করে, তাহলে সেই বস্তুকে আমরা দেখতে পাব সবুজ হিসেবে।

গাছের রঙের ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার। গাছের ফল-ফুল, লতাপাতার রঙের মূল কারণ বিশেষ ধরনের কিছু পিগমেন্ট বা রঞ্জক পদার্থ। পাতায় মূলত তিন ধরনের পিগমেন্ট বা রঞ্জক পদার্থ থাকে। সেগুলো হলো ক্লোরোফিল, ক্যারোটিনয়েড এবং অ্যান্থোসায়ানিন। কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে বেশির ভাগ গাছের পাতা সবুজ। বলা ভালো, পাতায় সবুজ রঙের বিভিন্ন শেড দেখা যায়। এ রঙের কারণ ক্লোরোফিল নামের পিগমেন্ট। ক্লোরোফিলের কারণেই সবুজ উদ্ভিদ সালোকসংশ্লেষণ বা ফটোসিন্থেসিস নামের বিশেষ প্রক্রিয়ায় নিজেদের খাবার নিজেরাই তৈরি করতে পারে।

ক্লোরোপ্লাস্ট
আরও পড়ুন

এখন ক্লোরোফিল শব্দটা আমাদের প্রায় সবার কাছে পরিচিত মনে হলেও শব্দটি আসলে কৃত্রিমভাবে তৈরি। এ শব্দের আদি উৎস গ্রিক শব্দ ক্লোরোস (Chloros) এবং ফাইলন (phyllon)। শব্দ দুটোর অর্থ যথাক্রমে সবুজ এবং পাতা। তাই আক্ষরিক অর্থে ক্লোরোফিল মানে সবুজ পাতা। ক্লোরোফিলেরও আবার রকমফের আছে। বিজ্ঞানীদের হিসেবে, গাছের পাতায় সাধারণত ছয় ধরনের ক্লোরোফিল থাকে। এর মধ্যে প্রধান দুটি হলো ক্লোরোফিল এ এবং ক্লোরোফিল বি।

ক্লোরোফিল এ সাধারণত দৃশ্যমান আলোর বেগুনি ও কমলা রং বেশি শোষণ করে। অন্যদিকে ক্লোরোফিল বি শোষণ করে নীল ও হলুদ রঙের আলো। এ এবং বি-এর মধ্যে তফাত যাই হোক, একটা বিষয়ে দুই ক্লোরোফিলেরই মিল আছে। সেটা হলো, কোনোটাই সবুজ আলো শোষণ করে না। তাই গাছের পাতা থেকে সবুজ আলো প্রতিফলিত হয়ে আমাদের চোখে পড়ে। আমাদের চোখে গাছের পাতার রং তাই সবুজ।

রাসায়নিক দিক থেকে দেখতে গেলে, ক্লোরোফিল অণু গঠিত হয় কার্বন, হাইড্রোজেন, ম্যাগনেশিয়াম, নাইট্রোজেন এবং অক্সিজেনের সমন্বয়ে। ক্লোরোফিল অণুর একপ্রান্তে একটা বলয়ের মতো আকৃতি থাকে। আর এই বলয়ের মধ্যমণি ম্যাগনেশিয়াম পরমাণু। পাতা যদি পানিতে সিদ্ধ করা হয়, তাহলে বলয়ের মাঝখান থেকে এই ম্যাগনেশিয়াম পরমাণু সরে যায়। তার জায়গা দখল করে হাইড্রোজেন পরমাণু। তাতে পাতার উজ্জ্বল সবুজ রংটা বদলে বিবর্ণ হয়ে যায়। সে কারণেই সবুজ শাক-সবজি রান্নার সময় বেশি সেদ্ধ করলে শেষপর্যন্ত তাদের অধিকাংশই সবুজ হারিয়ে বিবর্ণ হয়ে যায়।

ক্লোরোফিল এ-এর রাসায়নিক গঠন

পাতার রং সবুজ হলেও বিভিন্ন শাকসবজি বা ফলমূলের রংয়ের বৈচিত্র্য দেখা যায়। যেমন ভুট্টা, গাজর, লালশাক ইত্যাদির রং লালচে, হলুদ বা কমলা হয়। এর কারণ ক্যারোটিন পিগমেন্ট। বিটা ক্যারোটিন অণু বেশ লম্বা। অন্তত ক্লোরোফিলের চেয়ে বেশ লম্বা। এ অণুতে একক বন্ধনের পাশাপাশি বেশ কয়েকটি দ্বিবন্ধন থাকে। সেগুলোর অবস্থান থাকে পর্যায়ক্রমে। অর্থাৎ একটি একক বন্ধনের পর একটি দ্বিবন্ধন, তারপর আবারও একক বন্ধন। দ্বিবন্ধনের মাধ্যমে কার্বন পরমাণুগুলো পরস্পর জোড়া লেগে থাকে। পরীক্ষায় দেখা গেছে, যে অণু যত বড়, তার ইলেকট্রনগুলো এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে যেতে সময় লাগে তত বেশি। আর এসব ইলেকট্রন এমন আলো প্রতিফলিত করে, যার তরঙ্গদৈর্ঘ্য ইলেকট্রনের গতির সঙ্গে ঠিকভাবে খাপ খায়। তাই বড় অণু থেকে প্রতিফলিত হয় বড় তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো। যেমন লাল, কমলা বা হলুদ আলো। অন্যদিকে ছোট অণু থেকে প্রতিফলিত হয় ছোট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো। যেমন সবুজ। সে কারণেই গাছের পাতা সবুজ দেখা যায়। আর লালশাক, গাজর, ভুট্টা আমাদের চোখে দেখায় লালচে, হলদে বা কমলা রঙের।

বিটা ক্যারোটিনের রাসায়নিক গঠন

উদ্ভিদের তৃতীয় পিগমেন্টটির নাম অ্যান্থোসায়ানিন। এদের অণুতেই একটা বলয় থাকে এবং পর্যায়ক্রমে একক ও দ্বিবন্ধনও থাকে। তবে ক্লোরোফিল, ক্যারোটিনয়েডের তুলনায় এদের অণুর দৈর্ঘ্য ছোট। তাই এই অণু থেকে প্রতিফলিত হয় আরও ছোট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো। যেমন নীল বা বেগুনি। অ্যান্থোসায়ানিন থাকে বলেই বেগুন, বিট, জাম এবং বেগুনি আঙুরের রং আমাদের কাছে বেগুনি বলে মনে হয়। মজার ব্যাপার হলো, অ্যান্থোসায়ানিনে যদি অ্যাসিড যোগ করা হয়, তাহলে তাদের রং বদলে যায়। যেমন আঙুরের রসে ভিনেগার (অ্যাসিড) যোগ করলে, তা লাল রং ধারণ করে।

ক্লোরোফিল নিয়ে আরও কথা

কিছুক্ষণ আগে, গাছের পাতার যে সবুজ রংয়ের কথা বললাম, তা আসে ক্লোরোফিলের কারণে। সূর্যের আলোর কারণেই গাছ ক্লোরোফিল তৈরি করতে পারে। ঘাসের ওপর কয়েকদিন ইট চাপা দিয়ে রাখলেই ব্যাপারটা বুঝতে পারবেন। তখন দেখা যাবে, ইটের নিচে ঢাকা পড়া যেসব ঘাস সূর্যের আলো পায়নি, সেগুলো আর সবুজ নেই, বরং বিবর্ণ হয়ে গেছে।

আগেই বলেছি, গাছের পাতায় ক্লোরোফিল ছাড়াও ক্যারোটিনয়েড ও অ্যান্থোসায়ানিন থাকে। কিন্তু এই তিনটি পিগমেন্টের মধ্যে পাতায় ক্লোরোফিলের পরিমাণ থাকে সবচেয়ে বেশি। সে কারণে পাতায় ক্লোরোফিলে রাজত্ব প্রায় একচেটিয়া, পাতার রংও তাই সবুজ। কিন্তু পাতায় এত বেশি ক্লোরোফিল থাকার কারণ কী?

আসলে গাছের বেঁচে থাকার জন্য ক্লোরোফিল খুব গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক উপাদান। কারণ এটি সূর্যের আলো শোষণ করে, গাছের জন্য প্রয়োজনীয় খাবার (গ্লুকোজ) তৈরি করে। আলো ব্যবহার করে প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয় বলে এ প্রক্রিয়াকে বলা হয় সালোকসংশ্লেষণ বা ফটোসিন্থেসিস। এ প্রক্রিয়ায় মাটি থেকে পানি এবং বাতাস থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড ব্যবহার করে গাছ। আর উপজাত হিসেবে বাতাসে ছেড়ে দেয় অক্সিজেন। এই অক্সিজেন ব্যবহার করেই পৃথিবীর সব জীবজন্তু বেঁচে থাকে।

অ্যান্থোসায়ানিনের রাসায়নিক গঠন

ক্লোরোফিল গাছের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলেও এটি তৈরি করা গাছের জন্য বেশ কঠিন। একটা গাছ শুধু সেই অংশেই ক্লোরোফিল তৈরি করে, যেখানে সবচেয়ে বেশি সূর্যালোক পায়। গাছের পাতাগুলো সাধারণত শাখাপ্রশাখার শেষপ্রান্তে থাকে। পাতার কারণে গাছের গুড়ি বা অন্য অংশ ছায়ায় ঢাকা পড়ে থাকে। তাই সেখানে সূর্যের আলো ঠিকভাবে পৌঁছাতে পারে না। সে কারণেই গাছের গুড়ি বা শাখা-প্রশাখায় ক্লোরোফিল খুব কম থাকে কিংবা একেবারেই থাকে না। আবার বাঁধাকপি, লেটুসের বাইরের অংশ যতটা সবুজ, তার ভেতরের দিকে সবুজের পরিমাণ তত কমতে থাকে। এর কারণ হলো, কোনো গাছই তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ক্লোরোফিল অপচয় করতে চায় না। তাই যেখানে সূর্যের আলো পৌঁছায় না, সেখানে ক্লোরোফিলও থাকে না।

কিন্তু তারপরও মাঝেমধ্যেই গাছের পাতার রং বদলে যায়। সবুজ পাতাগুলো ধীরে ধীরে হলদে রং ধারণ করে। তারপর ধুসর হয়ে যায়। হুট করে একদিন গাছ থেকে টুপ করে খসেও পড়ে। বিশেষ করে শীতকালে গাছের পাতা বেশি ঝরে পড়তে দেখা যায়। সেটা ঘটে কেন?

এ ধরনের ঘটনা ঘটে দুটি কারণে। প্রথমত, গাছের পাতা ক্লোরোফিল ক্রমে হারাতে থাকে এবং তার জায়গা দখল করতে থাকে হলুদ ক্যারোটিনয়েড পিগমেন্ট। তাই এ সময় পাতার রং হলুদ হতে শুরু করে। আরেকটি ব্যাপার হলো, অ্যান্থোসায়ানিনের উৎপাদন। এ পিগমেন্টের কারণে বসন্তকালে গাছের ফুল-ফল নীল ও বেগুনি কিংবা গাঢ় লাল রং ধারণ করে।

পাতার বয়স বেশি হয়ে গেলেও তার কর্মক্ষমতা কমে যায়। এ সময় নতুন পাতা গজানোর জন্যও গাছ নিজের পুরোনো পাতা ঝরিয়ে ফেলে

গাছের পাতা ঝরে কেন

নির্দিষ্ট কিছু কারণে গাছের পাতা ঝরে যায়। যেমন গাছের কোনো পাতা ক্ষতিগ্রস্ত হলে ঝরে যায়। আবার অতিরিক্ত সূর্যের আলোর কারণে পাতা পুড়ে গেলে, কিংবা গাছ যখন পর্যাপ্ত পানি ও আলো পায় না, তখন গাছ ইচ্ছে করেই নিজের পাতা ঝরায়। এ ধরনের ঘটনা সাধারণত শীতকালে বেশি ঘটে। কারণ এ সময় প্রচণ্ড শীত ও সূর্যের আলোর অভাব থাকে। শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে অনেক জায়গায় পানির অভাবও দেখা দেয়। তাই গাছপালা টিকে থাকার জন্য নিজের দৈহিক কার্যকলাপ সীমিত করে ফেলে।

আবার পাতার বয়স বেশি হয়ে গেলেও তার কর্মক্ষমতা কমে যায়। এ সময় নতুন পাতা গজানোর জন্যও গাছ নিজের পুরোনো পাতা ঝরিয়ে ফেলে। যেমন শীত শেষে বসন্তকালে পর্যাপ্ত সূর্যালোক এবং অনুকূল তাপমাত্রায় গাছ আবারও নিজের স্বাভাবিক দৈহিক কার্যক্রম শুরু করে। তাই এ সময় গাছে নতুন পাতা গজাতে দেখা যায়।

পাতা ঝরার কালেও আমাদের অজান্তে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে গাছে গাছে। কোনো পাতা ঝরে পড়ার আগে গাছ ওই পাতায় পুষ্টি উপাদান পাঠানো বন্ধ করে দেয়। আবার ওই পাতা থেকে উপকারী কিছু রাসায়নিক উপাদান সরিয়ে ফেলে। আসলে সেগুলো অন্য কোথাও সংরক্ষণ করে রাখে পুনর্ব্যবহারের জন্য। এভাবে ওই পাতার ক্লোরোফিল ক্রমে কমে থাকে। গাছে সবুজ রংয়ের আম বা কলা পাকার প্রক্রিয়াও প্রায় এরকম। পাকা আম বা কলা হলুদ হওয়ার কারণ হলো, ক্লোরোফিল কমে হলুদ ক্যারোটিনয়েডের পরিমাণ বেড়ে যায়।

আরও পড়ুন

আবার কিছু গাছ পাতা ঝরিয়ে ফেলার প্রস্তুতি হিসেবে অ্যান্থোসায়ানিন উৎপাদন করে। এ সময় পাতাগুলোতে পুষ্টি উপাদানের অভাব থাকে। কিন্তু অক্সিজেনের কারণে যাতে পাতাগুলো খুব বেশি ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে জন্য এই পিগমেন্ট উৎপাদন করে গাছ। এই সময়টুকুতে পাতাগুলোর প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান গাছ একে একে শোষণ করে নেয়। এরপর পাতাগুলো ঝরে পড়তে থাকে।

অ্যান্থোসায়ানিন থাকায় তখনও পাতাগুলো পরোক্ষভাবে গাছের উপকার করতে থাকে। অ্যান্থোসায়ানিন গাছের নিচের মাটিতে অন্য গাছের বৃদ্ধি ঠেকিয়ে দেয়। ফলে বসন্তকালে নিজের জন্য বেশি পুষ্টি উপাদান মাটি থেকে সংগ্রহ করতে পারে গাছ।

সূত্র: হোয়াই ইজ মিল্ক হোয়াইট অ্যান্ড ২০০ আদার কিউরিয়াস কেমেস্ট্রি কোয়েশ্চন্স/ আ্যালেক্সা কোলহো এবং সাইমন কিউলেন ফিল্ড

ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক

উইকিপিডিয়া