অধিক শোকে কি মানুষের মৃত্যু হতে পারে

অধিক শোকে মৃত্যুর ঘটনা বাস্তবের চেয়ে মুভিতে বেশি দেখা যায়। বাংলা মুভিতে সংখ্যাটা আরও বেশি। হঠাৎ অতি দুঃখে বা শোকে বৃদ্ধ মা-বাবাকে মারা যেতে দেখা যেত। শুধু মুভিতেই নয়, সাহিত্যেই এমন ঘটনা দেখা গেছে। শেক্‌সপিয়ারের কিং লিয়ার নাটকে এমন একটা দৃশ্য ছিল। বাংলা সিনেমাতে অহরহ এই ঘটনা ঘটে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আসলেই কি অধিক শোকে মানুষ মারা যেতে পারে? নাকি এটা শুধু মুভি ও বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ? বিজ্ঞান কী বলে?

বিজ্ঞান বলছে, সত্যিই এমন একটি রোগ আছে, যার নাম টাকোটসুবো সিনড্রোম। এটি হৃদ্‌যন্ত্রের একটি অস্বাভাবিক অবস্থা, যেখানে বাম ভেন্ট্রিকল স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি ফুলে যায়, ফলে ঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। বড় কোনো শারীরিক বা মানসিক আঘাতের পর সাধারণত এমন রোগ দেখা যায়। আর এ রোগে সত্যিই কিছু মানুষের মৃত্যু হতে পারে।

সৌভাগ্যক্রমে এ রোগ তেমন প্রাণঘাতী নয়। মাত্র ৪ শতাংশ রোগী এতে মারা যান।

অধিক শোকে মৃত্যুর গল্পগাঁথা বহু পুরানো। তবে চিকিৎসকরা এর বাস্তব উদাহরণ পেতে শুরু করেন ১৯৬০-এর দশকে। একটা কেস স্টাডি করে দেখা গেছে, একজন মধ্যবয়সী নারী প্রিয়জনের মৃত্যুর শোকে কয়েক দিনের মধ্যেই মারা গেছেন। কিন্তু কেন মারা গেছেন, তা তখন জানা যায়নি। পরে চিকিৎসা প্রযুক্তি আরও উন্নত হলে বোঝা যায়, শোকগ্রস্ত অনেক রোগীর হৃদ্‌যন্ত্রের বাম ভেন্ট্রিকল ফুলে গেছে। ১৯৯০ সালে জাপানের হিরোশিমা সিটি হাসপাতালের চিকিৎসকেরা এই অবস্থার নাম দেন টাকোটসুবো।

এ রোগের কারণ এখনো পুরোপুরি বোঝা যায়নি, তবে কিছু সম্ভাব্য ব্যাখ্যা রয়েছে। বড় কোনো মানসিক ধাক্কা বা দুঃখজনক ঘটনার ফলে শরীরে প্রচুর স্ট্রেস হরমোন তৈরি হয়। এই হরমোনগুলো হৃদ্‌যন্ত্রের ওপর প্রভাব ফেলে এবং এর পেশিগুলো শিথিল হয়ে যায়। এতে হৃদ্‌যন্ত্রে স্বাভাবিকভাবে রক্ত প্রবাহ হয় না। কিছু গবেষকের মতে, এই অবস্থায় হৃদ্‌যন্ত্র সাময়িকভাবে অচেতন হয়ে পড়তে পারে। 

আরও পড়ুন

আরেকটি ব্যাখ্যা হলো, ইস্ট্রোজেন হরমোনের অভাবও এর পেছনে কাজ করতে পারে। দেখা গেছে, বেশিরভাগ টাকুটসুবো রোগীই বয়স্ক নারী। তাঁদের দেহের ইস্ট্রোজেন এমনিতেই কমে যায়।

তবে এটি বিরল রোগ। সাধারণত ২ শতাংশ হার্ট অ্যাটাকের রোগীদের ক্ষেত্রে এটি ধরা পড়ে। ১৯৮০ সালে পিটার রাহকো নামে এক চিকিৎসক এমন একটি ঘটনা প্রত্যক্ষ করেন। এক মা তার ছেলের মৃতদেহ দেখে কয়েক মিনিটের মধ্যেই বুকে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। পরীক্ষা করে দেখা যায়, তাঁর হৃদ্‌যন্ত্রের ধমনীতে কোনো ব্লকেজ ছিল না ঠিকই, কিন্তু হৃদ্‌যন্ত্রের কর্মক্ষমতা অনেক কমে গিয়েছিল। পরে বোঝা যায়, এটি টাকোটসুবো সিনড্রোম ছিল। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, মানসিক চাপের কারণে এই রোগ হতে পারে। যেমন কোভিড অতিমারি, ভূমিকম্পের কারণে দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ তৈরি হতে পারে। এছাড়া যারা বিষণ্নতায় ভোগেন, তাঁদেরও এই রোগ হওয়ার ঝুঁকি বেশি।

তবে সৌভাগ্যক্রমে এ রোগ তেমন প্রাণঘাতী নয়। মাত্র ৪ শতাংশ রোগী এতে মারা যান। প্রায় ৭৫ শতাংশ রোগী ১০ দিনের মধ্যে সুস্থ হয়ে ওঠেন, অনেকে মাত্র ২-৩ দিনের মধ্যেই ভালো হয়ে যান। অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্যি, কিছু ক্ষেত্রে মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে রোগী সুস্থ হয়ে যেতে পারেন। 

তাই অধিক শোকে মানুষের মৃত্যু নিশ্চয়ই হতে পারে, তবে সম্ভাবনা খুব কম। 

সূত্র: সায়েন্স নিউজ এক্সপ্লোরার

আরও পড়ুন