যেভাবে কচুরিপানা এল এ দেশে

কচুরিপানা একটি সামান্য জলজ উদ্ভিদ। আমরা হয়তো এর দিকে ফিরেও তাকাই না। অথচ একসময় কচুরিপানা এ দেশে এসেই পাকিয়ে তুলেছিল বিশাল ঝামেলা! মজার সেই ইতিহাস ও বিজ্ঞান...

জলাশয় ভরে গেছে দৃষ্টিনন্দন কচুরিপানা ফুলে। স্কুলপাড়া, ঈশ্বরদী, পাবনা, ৩ নভেম্বরছবি: হাসান মাহমুদ

কচুরিপানা ভাসমান বহুবর্ষজীবী জলজ উদ্ভিদ। তার সাতটি প্রজাতি রয়েছে। কচুরিপানার আদি নিবাস দক্ষিণ আমেরিকা। কচুরিপানা আইকর্নিয়া গণের অন্তর্ভুক্ত। বৈজ্ঞানিক নাম Eichhornia crassipes। এই উদ্ভিদ খুব দ্রুত বংশবিস্তার করতে পারে। দুই সপ্তাহের মধ্যে কচুরিপানার সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। এর বীজ উৎপাদনের হারও অনেক বেশি। ৩০ বছর পরও অঙ্কুরোদগম ঘটাতে পারে তাদের বীজ।

বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশের জলাশয়ে কচুরিপানার দেখা মেলে। তবে ভারতীয় উপমহাদেশে কচুরিপানা আসার ইতিহাস বেশ চমকপ্রদ। এটি মূলত দক্ষিণ আমেরিকার আমাজন বনাঞ্চলের উদ্ভিদ। ১৮ শতকের শেষের দিকে জর্জ মরগ্যান নামের এক পাট ব্যবসায়ী এ উপমহাদেশে কচুরিপানা নিয়ে আসেন। তিনি ভেবেছিলেন, এটি একধরনের অর্কিডজাতীয় ফুল। এরপর উদ্ভিদটি দ্রুত বাড়তে থাকে। ১৯২০ সালের মধ্যে বাংলার প্রায় প্রতিটি জলাশয় কচুরিপানায় ভরে যায়। নদ-নদীতে নৌ চলাচল দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। ফলে পাট ও আমন ধানের মতো জলাভূমির ফসল উৎপাদনে সমস্যা দেখা দেয়। বাংলার অর্থনীতিতে দেখা দেয় স্থবিরতা।

কচুরিপানা নিয়ে আসার জন্য জর্জ মরগ্যানকে এককথায় নিশ্চয়ই কেউ অপরাধী বলতে পারবেন না। আবার এর ফুলের সৌন্দর্যও কিন্তু কম নয়
ফাইল ছবি
সেবার রাজনীতিতেও কচুরিপানার প্রভাব পড়েছিল। ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে বাংলার সব প্রার্থীর প্রতিশ্রুতি ছিল কচুরিপানা হটানোর। ১৯৩৯ সালে ক্ষমতায় আসেন শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক।

কচুরিপানার হাত থেকে বাঁচতে তৎকালীন ইংরেজ প্রশাসকেরা ডাকলেন গবেষকদের। বাংলার প্রাদেশিক সরকারের তোড়জোড়ে গঠিত হয় সাত সদস্যবিশিষ্ট ‘কচুরিপানা কমিটি’। তাঁদের একজন ছিলেন বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু।

স্যার জগদীশচন্দ্র বসু
অলংকরণ: মাসুক হেলাল

সেবার রাজনীতিতেও কচুরিপানার প্রভাব পড়েছিল। ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে বাংলার সব প্রার্থীর প্রতিশ্রুতি ছিল কচুরিপানা হটানোর। ১৯৩৯ সালে ক্ষমতায় আসেন শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক। ওই বছর এপ্রিলের শেষ সপ্তাহকে পূর্ব বাংলায় ‘কচুরিপানা সপ্তাহ’ হিসেবে ঘোষণা দেন তিনি। ফজলুল হক–পরবর্তী সরকার কচুরিপানার দৌরাত্ম্য হ্রাসে বাংলার জলাভূমি আইন, বাংলার মিউনিসিপ্যালিটি আইন, বাংলার স্থানীয় সরকার আইন এবং বাংলার স্থানীয় গ্রাম সরকার আইন সংশোধন করে।

এত আইন করেও নাছোড়বান্দা কচুরিপানাকে কিন্তু থামানো যায়নি। সেটি তার দৌরাত্ম্য ঠিকই বজায় রেখেছিল। ষাটের দশকে আইয়ুব খান ক্ষমতা দখলের পর আরেক দফা যুদ্ধ ঘোষণা করেন কচুরিপানার বিরুদ্ধে। নানা ধরনের রাসায়নিক দিয়ে তা নির্মূলের চেষ্টা করা হয়। তবে রাসায়নিকের প্রভাবে কচুরিপানার সঙ্গে জলজ বাস্তুসংস্থানের ক্ষতি হয়। ফলে রাসায়নিক ব্যবহার বন্ধ করতে বাধ্য হয় আইয়ুব সরকার। রেহাই পেয়ে যায় কচুরিপানা।

শীতের ভোরে শিশিরভেজা কচুরিপানা ফুল। আমভিটা, ডুমুরিয়া, খুলনা, ২৬ নভেম্বর
ছবি: সাদ্দাম হোসেন

সার হিসেবে কচুরিপানার গুরুত্ব অনেক। বিশেষত পটাশ সার। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আজকাল পানির ওপর কচুরিপানার বেড তৈরি করে তাতে সবজির চারা উৎপাদন করা হয়। গাছের গোড়ায় কচুরিপানার স্তূপ গাছের বৃদ্ধি আর সজীবতা রক্ষায় দারুণ ভূমিকা পালন করে।

দেখা যাচ্ছে, কচুরিপানার ভালো-মন্দ দুই গুণই আছে। আজকাল হয়তো কচুরিপানা নিয়ে মানুষ তেমন আতঙ্কিত নয়। কারণ, মানুষ এর ব্যবহার শিখে নিয়েছে। সার হিসেবে ব্যবহার ছাড়াও গরুর খাবার হিসেবে কচুরিপানা ব্যবহৃত হয়। অনেক অঞ্চলে এটি গরুর প্রধান খাবার। তাই এ দেশে কচুরিপানা নিয়ে আসার জন্য জর্জ মরগ্যানকে এককথায় নিশ্চয়ই কেউ অপরাধী বলতে পারবেন না। আবার এর ফুলের সৌন্দর্যও কিন্তু কম নয়।

লেখক: শিক্ষার্থী, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়

সূত্র: উইকিপিডিয়া, বাংলাপিডিয়া

*লেখাটি ২০২৩ সালে বিজ্ঞানচিন্তার আগস্ট সংখ্যায় প্রকাশিত

আরও পড়ুন