যেকোনো বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য মানতে হয় সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি—বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি। এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো এক্সপেরিমেন্ট বা পরীক্ষণ। যেকোনো বৈজ্ঞানিক ধারণা (হাইপোথিসিস) গবেষণাগারে পরীক্ষা করে দেখতে হয়। নতুন আবিষ্কার বা উদ্ভাবন আসলেই কতটা কার্যকর, তাও পরীক্ষা করে দেখা হয় গবেষণাগারে। এ জন্য ব্যবহার করা হয় নানারকম বৈজ্ঞানিক সরঞ্জাম। এসব পরীক্ষার মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষ বা সমাজের ওপর নতুন আবিষ্কার বা উদ্ভাবনের প্রভাব। যেমন নতুন কোনো ওষুধ বা ভ্যাকসিন আবিষ্কৃত হলো। এটি সরাসরি মানুষের ওপর প্রয়োগ করা হয় না। এর আগে বেশ কয়েকটি ধাপ অনুসরণ করেন বিজ্ঞানীরা। এর মধ্যে অন্যতম হলো ইঁদুর (Mouse and Rat), গিনিপিগসহ অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর ওপর প্রয়োগ করে দেখা। এসব গবেষণায় ব্যবহৃত প্রাণীর ধরন নির্ভর করে গবেষণার বিষয়ের ওপর। কিন্তু প্রাণীদের ওপর এসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয় কেন?
সে জন্য তাকাতে হবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের দিকে। প্রাণিদেহে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চিকিৎসাবিজ্ঞানের নানা গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। নতুন ওষুধ বা চিকিৎসা পদ্ধতি আবিষ্কারের পর মানবদেহে ব্যবহারের আগে বিজ্ঞানীরা সাধারণত ইঁদুর বা গিনিপিগের ওপর পরীক্ষা চালিয়ে দেখেন। মানুষের জন্য তা নিরাপদ ও কার্যকর কি না, তাও পরীক্ষা করেন। মেডিক্যাল ট্রায়ালে ব্যবহৃত বেশির ভাগ ইঁদুর জাতীয় প্রাণীর বংশবৃদ্ধি করা হয়, যাতে শুধু লিঙ্গপার্থক্য ছাড়া জিনগত আর সব বৈশিষ্ট্য একই হয়। ন্যাশনাল হিউম্যান জিনোম রিসার্চ ইনস্টিটিউটের মতে, মেডিক্যাল পরীক্ষার ফলাফল একই রকম করতে এটা করা হয়। পরীক্ষায় যে ইঁদুর ব্যবহার করা হয়, কিছু নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে সেগুলোর একই জাতের হতে হয়।
যুক্তরাষ্ট্রর ফাউন্ডেশন ফর বায়োমেডিকেল রিসার্চের (এফবিআর) মতে, গত বিশ বছরে ইঁদুর এবং মানুষের মধ্যে মিলগুলো আরও বেড়েছে। বিজ্ঞানীরা ইঁদুর নিয়ে গবেষণা করতে পছন্দ করেন, এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো, ইঁদুরের জিনগত পরিবর্তন করা সহজ।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণায় ইঁদুরকে মডেল হিসেবে ব্যবহার করার আরেকটি কারণ হলো, এদের জিনগত, জৈবিক এবং আচরণগত বৈশিষ্ট্য মানুষের সঙ্গে অনেকটাই মেলে। আসলে ইঁদুর আর আমাদের ডিএনএ ৯৮ শতাংশের বেশি মিলে যায়। ফলে মানুষের বিভিন্ন রোগের লক্ষণ দেখা যায় ইঁদুর জাতীয় প্রাণীর মধ্যেও। এই গবেষণার সঙ্গে যুক্ত আছেন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথের (এনআইএইচ) অফিস অব ল্যাবরেটরি অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ারের প্রতিনিধি জেনি হ্যালিস্কি। তিনি বলেন, ‘ইঁদুর, গিনিপিগসহ কিছু স্তন্যপায়ী প্রাণীর শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া মানুষের সঙ্গে অনেকখানি মেলে। তাই মানুষের রোগের ওপর গবেষণা করার জন্য এদের ব্যবহার করা হয়। কারণ, এদের ওপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে মানুষের রোগের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়।’
যুক্তরাষ্ট্রর ফাউন্ডেশন ফর বায়োমেডিকেল রিসার্চের (এফবিআর) মতে, গত বিশ বছরে ইঁদুর এবং মানুষের মধ্যে মিলগুলো আরও বেড়েছে। বিজ্ঞানীরা ইঁদুর নিয়ে গবেষণা করতে পছন্দ করেন, এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো, ইঁদুরের জিনগত পরিবর্তন করা সহজ। বিজ্ঞানীরা এখন গবেষণাগারে এমন ইঁদুর তৈরি করতে সক্ষম, যাদের শরীরে মানুষের রোগের মতো জিন থাকে। এদের ‘ট্রান্সজেনিক মাইস’ বলা হয়। একইভাবে কিছু বিশেষ জিন বাদ দিয়ে ‘নকআউট মাইস’ তৈরি করা যায়। এই ইঁদুরগুলো ক্যানসার সৃষ্টিকারী রাসায়নিক কার্সিনোজেন এবং ওষুধের নিরাপত্তা পরীক্ষার জন্য ব্যবহৃত হয়। তা ছাড়া গবেষকেরা ইঁদুরের অ্যানাটমি বা দেহের গঠন-কাঠামো, ফিজিওলজি বা শারীরতত্ত্ব এবং জিনতত্ত্ব সম্পর্কে ভালোভাবে জানেন। ফলে ইঁদুরের আচরণ বা বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তনগুলো সহজেই বুঝতে পারেন বিজ্ঞানীরা। এসব কারণ ইঁদুরকে গবেষণার জন্য আরও বেশি উপযুক্ত করে তুলেছে। আবার এসসিআইডি মাইস নামে বিশেষ কিছু ইঁদুর আছে, যাদের জন্ম থেকেই শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকে না। এফবিআরের মতে, মানুষের সুস্থ ও ক্যানসারযুক্ত কোষের ওপর গবেষণার জন্য এই ইঁদুরগুলো ব্যবহার করা হয়। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ছানি, স্থূলতা, খিঁচুনি, শ্বাসকষ্ট, বধিরতা, পারকিনসনস, আলঝেইমার, ক্যানসার, সিস্টিক ফাইব্রোসিস, এইচআইভি এইডস এবং হৃদরোগের মতো রোগের মডেল হিসেবে ইঁদুর জাতীয় প্রাণী ব্যবহার করা হয়।
এগুলো ছাড়াও আরও বেশ কয়েকটি যুক্তি আছে বিজ্ঞানীদের কাছে ইঁদুর ব্যবহারের পেছনে। বেশির ভাগ বৈজ্ঞানিক গবেষণাগার ছোট হয়। তাই গবেষণাগারে রেখে গবেষণা করা যায়, এমন প্রাণীদের মধ্যে প্রথমেই রয়েছে ইঁদুর ও গিনিপিগ আকারের ছোট প্রাণী। ফলে জায়গা কম লাগে। আর এদের বেশি পরিচর্যা করার প্রয়োজন হয় না। গবেষণাগারে হাতি বা জিরাফের মতো বড় প্রাণীর ওপর পরীক্ষা চালাতে গেলে বিজ্ঞানীদের এদের জন্য জায়গা করে দেওয়া খুব কঠিন হতো। দেখাশোনা করতে করতে সময় চলে যেতে অনেক। আরেকটি কারণ হলো, ইদুঁর বা গিনিপিগ খুব শান্ত প্রাণী। গবেষণার সময় খুব বেশি একটা আক্রমণও করে না এরা। ফলে বিজ্ঞানীদের আক্রান্ত হওয়ার তেমন ভয় বা ঝুঁকিও নেই।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণায় ইঁদুরকে মডেল হিসেবে ব্যবহার করার আরেকটি কারণ হলো, এদের জিনগত, জৈবিক এবং আচরণগত বৈশিষ্ট্য মানুষের সঙ্গে অনেকটাই মেলে। আসলে ইঁদুর আর আমাদের ডিএনএ ৯৮ শতাংশের বেশি মিলে যায়।
ইঁদুর আবার দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে। ফলে অল্প খরচে প্রচুর ইঁদুর পাওয়া যায়। যাদের প্রয়োজন, তাদের জন্য ইঁদুর সব সময় সহজলভ্য। দ্রুত এবং ঘন ঘন বাচ্চা জন্ম দেওয়ার ক্ষমতা গবেষণার জন্য একটি বড় সুবিধা। ইঁদুরের জীবনকাল কয়েক বছর হওয়ায় গবেষকেরা সহজেই বিভিন্ন প্রজন্ম নিয়ে গবেষণা করতে পারেন।
পশু পাখিদের ওপর এ ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা নিয়ে অনেকের মনেই আছে নানা প্রশ্ন। যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড মেডিসিন অনেকদিন ধরে প্রাণীদের ওপর গবেষণা করছে। তাদের মতে, গবেষণাগারের প্রাণীদের প্রতি মানবিক আচরণ নৈতিক এবং বৈজ্ঞানিক—উভয় দিক থেকেই অপরিহার্য। প্রাণীদের ভালোভাবে যত্ন না নিলে, আশানুরূপ গবেষণা করা যায় না।
এখন পর্যন্ত এমন কিছু পাওয়া যায়নি, যা মানুষের মতো শ্বাস নিতে পারে, আর যার শরীরের ভেতরের অঙ্গগুলো মানুষের মতো কাজ করে। এমন আবিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত গবেষকদের নতুন ওষুধ ও চিকিৎসার কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা পরীক্ষা করতে এবং বন্ধ্যাত্ব, জন্মগত ত্রুটি, ক্যানসার সৃষ্টির মতো বিপজ্জনক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া শনাক্ত করতে এসব প্রাণী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল আইনে বলা আছে, মানুষের ওপর কোনো গবেষণা চালানোর অনুমতি দেওয়ার আগে নতুন চিকিৎসার নিরাপত্তা এবং কার্যকারিতা প্রদর্শনের জন্য ‘নন-হিউমান এনিম্যাল’-এর ওপর গবেষণা করা বাধ্যতামূলক। এই গবেষণা ও পরীক্ষা থেকে শুধু মানুষই উপকৃত হয় না, মানুষের ব্যবহারের জন্য তৈরি শত শত ওষুধ ও চিকিৎসা এখন নিয়মিতভাবে পশুচিকিৎসা ক্লিনিকেও ব্যবহৃত হয়।
পশু পাখিদের ওপর এ ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা নিয়ে অনেকের মনেই আছে নানা প্রশ্ন। যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড মেডিসিন অনেকদিন ধরে প্রাণীদের ওপর গবেষণা করছে।
এটা মনে রাখা জরুরি যে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে চিকিৎসা গবেষণার জন্য যে প্রাণী ব্যবহার করা হয়, এদের ৯৫ শতাংশই ইঁদুর ও গিনিপিগ। আর এই প্রাণীগুলো শুধু চিকিৎসা ক্ষেত্রে গবেষণার একটা অংশ। স্ট্যানফোর্ডের গবেষকেরা তাঁদের তত্ত্বাবধানে থাকা প্রাণীদের সর্বোচ্চ যত্ন নিশ্চিত করেন। তাঁরা ফেডারেল ও অঙ্গরাজ্যের আইনি নির্দেশিকা ও মানবিকনীতি কঠোরভাবে মেনে গবেষণা করেন। গবেষণাগারে পশু পরিচর্যা এবং পালনের ক্ষেত্রে নতুন তথ্য ও ফলাফলের ভিত্তিতে তাঁদের পশু পরিচর্যা পদ্ধতি ক্রমাগত পরিবর্তন করতে হয়।
স্ট্যানফোর্ডের মতো অনেক গবেষণাগারে প্রাণীদের নিয়ে গবেষণা করতে হলে সরকারি কমিটির কাছে প্রস্তাব জমা দিতে হয় গবেষকদের। কমিটির অনুমতি পেলেই কেবল গবেষণা শুরু করা যায়। তবে প্রাণী ব্যবহার যতটা সম্ভব কমানোর চেষ্টা করা হয় এখন। এর বদলে বিকল্প পদ্ধতি, যেমন কোষ ও টিস্যু কালচার, কম্পিউটার সিমুলেশন ইত্যাদি ব্যবহার করার চেষ্টা করেন অনেক গবেষক।