পানি দিবস: পানির জানা-অজানা ৫

প্রতিবছর ২২ মার্চ বিশ্ব পানি দিবস পালন করা হয়। ১৯৯২ সালের ২২ ডিসেম্বর ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে জাতিসংঘের এক সভায় এই প্রস্তাব গৃহীত হয়। ১৯৯৩ সালে পালিত হয় প্রথম বিশ্ব পানি দিবস। বাংলাদেশেও প্রতিবছর বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে এ দিবস পালন করা হয়। চলতি বছরের বিশ্ব পানি দিবসের প্রতিপাদ্য ‘হিমবাহ সংরক্ষণ’। চলুন, এই দিনে পানি সম্পর্কে ৫টি মজার তথ্য জেনে নিই।

১. পৃথিবীর বেশির ভাগ অক্সিজেন আসে সমুদ্র থেকে

পৃথিবীতে অক্সিজেনের প্রধান উৎস কী? বেশির ভাগ মানুষ মনে করেন, পৃথিবীর বেশির ভাগ অক্সিজেন আসে বন-জঙ্গল থেকে। কথাটা পুরোপুর সঠিক নয়। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশেনিক সার্ভিসের মতে, পৃথিবীতে অক্সিজেন উৎপাদনের প্রায় অর্ধেক আসে সমুদ্র থেকে। ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন নামে ক্ষুদ্র সামুদ্রিক উদ্ভিদ, সামুদ্রিক শৈবাল এবং প্রোক্লোরোকক্কাসের মতো সালোকসংশ্লেষী ব্যাকটেরিয়া পৃথিবীর প্রায় ৫০ শতাংশ অক্সিজেনের যোগান দেয়।

আরও পড়ুন

২. পৃথিবীর পানির বয়স প্রায় ৪০০ কোটি বছর

জিরকন ক্রিস্টাল
ছবি: নাসা

বিজ্ঞানীরা জানতে পেরেছেন, পৃথিবীর পানির বয়স প্রায় ৪০০ কোটি বছর। পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার জ্যাক হিলস থেকে ৪০০ কোটি বছরের পুরাতন জিরকন ক্রিস্টাল বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা এই তথ্য জানতে পেরেছেন। জিরকন একধরনের খনিজ, পৃথিবীর প্রাচীনতম শিলাগুলোতে পাওয়া যায়। সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবির খলিফা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-রসায়নবিদ হামেদ গামালেল্ডিয়েন ও তাঁর সহকর্মীরা ২০২৪ সালের ৩ জুন নেচার জিওসায়েন্স জার্নালে এই আবিষ্কারের কথা প্রকাশ করেন। গবেষকেরা জিরকন ক্রিস্টালের মধ্যকার অক্সিজেন অণু বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, সেখানে অক্সিজেনের ভারী ও হালকা আইসোটোপের যে অনুপাত ছিল, তা শুধু মিঠা পানিতেই দেখা যায়। এ থেকে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হয়েছেন, ৪০০ কোটি বছর আগে পৃথিবীতে যথেষ্ট মিঠা পানি ছিল।

আরও পড়ুন

৩. পৃথিবীতে কতটা পানি আছে

পৃথিবী
ছবি: এএফপি

পৃথিবীকে বলা হয় নীল গ্রহ। মহাকাশ থেকে পৃথিবীটা আসলে নীল দেখায়। কারণটা তো সবাই জানেন—পৃথিবীর তিন ভাগ জল, এক ভাগ স্থল। অর্থাৎ আমাদের এ গ্রহ মহাসাগর ও পানিতে ভরপুর। সৌরজগতের অন্যান্য গ্রহ, এমনকি বেশির ভাগ এক্সোপ্ল্যানেটের তুলনায় পৃথিবীতে বেশি পানি রয়েছে। অন্তত এখন পর্যন্ত আমরা তাই জানি। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার (USGS) তথ্য অনুসারে, পৃথিবীর মোট পানির পরিমাণ ১৩৩.২ কোটি ঘন কিলোমিটার। এ কারণেই ভূপৃষ্ঠের প্রায় ৭১ শতাংশ জুড়ে আছে পানি। এই মোট পানির ৯৬.৫ শতাংশ পাওয়া যায় মহাসাগরে। ভূপৃষ্ঠ ছাড়াও মেঘেও থাকে পানি।

আরও পড়ুন

৪. নদীর পানি মিষ্টি হলেও সমুদ্রের পানি লবণাক্ত কেন

প্রশ্নটির উত্তর আছে সাগরতলে। সাগরের তলদেশে রয়েছে খনিজ পদার্থসমৃদ্ধ পাথর। কিন্তু এগুলো যে আপনাতেই সমুদ্রের পানিতে এসে মেশে, বিষয়টা তা নয়।

বায়ুমণ্ডল তথা বাতাসের বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড বৃষ্টির পানির সঙ্গে বিক্রিয়া করে তৈরি করে কার্বনিক অ্যাসিড। এই কার্বনিক অ্যাসিডসমৃদ্ধ জলীয় কণা বৃষ্টি হয়ে নেমে আসে পৃথিবীতে। এই বৃষ্টির পানি ভাসিয়ে দেয় পুকুর, খাল-বিল, নদী-নালা, সমুদ্র। তবে বৃষ্টির পানিতে কার্বনিক অ্যাসিডের পরিমাণ সামান্য, বেশি থাকে বিশুদ্ধ পানি। এই বৃষ্টির পানি থেকেই আমরা মূলত বিশুদ্ধ পানি পাই। এ জন্য নদ-নদীর পানি মিষ্টি, লবণাক্ত নয়।

সমুদ্রেও এরকম অ্যাসিড বৃষ্টি হয়। ফলে পানি অ্যাসিডিক হয়ে যায়। ওদিকে সাগরের তলদেশে রয়েছে খনিজ তথা ক্ষারীয় মাটি ও পাথর। এগুলো অ্যাসিডের সংস্পর্শে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। এ ছাড়াও সমুদ্রের তলদেশে আগ্নেয়গিরি থেকে ম্যাগমা নির্গত হয় এবং সেখানে বিশাল সব খাদ রয়েছে। সাগরের তলদেশের পানি যখন এসব খাদ, গিরিখাত ও গর্তে ঢুকে পড়ে, তখন ম্যাগমার তাপে উত্তপ্ত হয়। এই উত্তপ্ত পানিও সাগরতলের পাথর ক্ষয় করে। ফলে ক্ষারীয় খনিজ এসে মেশে সমুদ্রের পানিতে। ঘটে অ্যাসিড-ক্ষারের বিক্রিয়া। আমরা জানি, অ্যাসিড ও ক্ষার বিক্রিয়া করে তৈরি হয় লবণ ও পানি। এভাবে সাগরের পানি লবণাক্ত হয়ে ওঠে।

আরও পড়ুন

৫. পৃথিবীর ৭০ ভাগ মিঠা পানি হিমায়িত

ভূপৃষ্ঠের প্রায় ৭১ শতাংশ পানি দিয়ে ঢাকা। এর বেশির ভাগ জুড়েই আছে মহাসাগর, নদী ও হ্রদ। তবে কিছু অংশ পৃথিবীর দুটি মেরুতে হিমবাহ হিসেবে জমাট বেঁধে আছে। গ্রিনল্যান্ড ও অ্যান্টার্কটিকা জুড়ে থাকা এই বরফের স্তূপগুলোতে রয়েছে বিশ্বের মোট পানি সরবরাহের মাত্র ২ শতাংশ। কিন্তু পৃথিবীর মিঠা পানির প্রায় ৭০ শতাংশই এর মধ্যে আটকা পড়ে আছে। এই গ্রহের মোট মিঠাপানির ৫০ শতাংশ জমা আছে ব্রাজিল, রাশিয়া, কানাডা, ইন্দোনেশিয়া, চীন ও কলম্বিয়াতে।

বিজ্ঞানীরা অনুমান করেছেন, অ্যান্টার্কটিকার বরফের পাহাড় গলে গেলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা প্রায় ৬০ মিটার বা ২০০ ফুট বেড়ে যাবে। শুধু তা-ই নয়, এটি আবহাওয়াকেও প্রভাবিত করতে পারে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, উত্তর মেরুতে হিমবাহ কমে গেলে পশ্চিম ইউরোপে বর্ষাকালে বৃষ্টিপাতের হার বাড়বে। অন্য এক গবেষণায় দেখা গেছে, এটি যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য স্থানে আরও তীব্র তাপপ্রবাহ সৃষ্টি করছে এবং ভবিষ্যতে এটি আরও বাড়তে পারে।

সূত্র: নোয়া ডটগভ, সায়েন্স নিউজ, লাইভ সায়েন্স, ডিসকভারি এবং বিজ্ঞানচিন্তা

লেখক: শিক্ষার্থী, ঢাকা কলেজ

আরও পড়ুন